কেন এই আত্মঘাতী খেলা

ছেলেটি আমার ছাত্র। ওর বাবা জন্মান্ধ। তিনি নিজের চেষ্টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন এবং শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত আছেন। এছাড়াও এই শিক্ষকের সমাজ-সংসারের সমস্যা সমাধানের একটি বৈজ্ঞানিক ধারণা আছে। তাঁর আস্থায় আছে ব্যক্তিমালিকানার পরিবর্তে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমাদের মতো জনবহুল একটি পশ্চাত্পদ দেশের পুঞ্জীভূত সমস্যা সমাধান করা সম্ভব—এই ধারণাই ঐ ছেলেটিকে বেশি বেশি কাছের মনে করতে সাহায্য করেছে। ছেলেটি এ বছর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছে। পরীক্ষার খবরাখবর জানানোর জন্য মুখোমুখি না হলেও সব পরীক্ষার খবর ফোনে জানাতে ভুল করে না এবং বলে—‘স্যার পরীক্ষা ভালো হয়েছে।’ আমি বেশ স্বস্তি অনুভব করি। কোনো ফোন না করে ৫-৫-১৪ তারিখ সকালবেলা বাসায় হাজির— ‘স্যার আগামী দিন তো হিসাববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা, আমি কিছু ব্যবহারিক সমস্যার সমাধান করে নিয়ে এসেছি একটু দেখে দেবেন?’ বেশ আগ্রহ নিয়ে ব্যবহারিক সমস্যাগুলোর সমাধান দেখলাম এবং কিছু কিছু সমাধানের সংশোধনীও সংযোজন করে দিলাম। ছেলেটি চলে গেলো। এরপর দু-একটি করে ফোন আসতে শুরু করলো এবং এটা কেমন হয় বা ওটা কেমন হয় ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন চলছেই। তখন থেকে কেমন যেন সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করল। এরপর সন্ধ্যা থেকে রাত সাড়ে নয়টা অব্দি বেশ কিছু পরীক্ষার্থীকে রাস্তায় ঘোরাঘুরি করতে দেখে সন্দেহ বেশ শক্ত হলো। ৬-৫-১৪ তারিখে কক্ষ পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করতে ঢুকলাম এবং সব প্রস্তুতি শেষ করে যখন প্রশ্ন বণ্টন করার প্রস্তুতি নিলাম—তখন দেখলাম সেই ছেলেটিসহ যারাই আমাকে বিভিন্ন সময় প্রশ্নের উত্তর বা সমাধান কৌশল জানতে চেয়েছিল তার সবগুলোই প্রশ্নপত্রে আছে। এর আগেও অনেক পরীক্ষার প্রশ্ন নিয়েও এরকম কথা শুনেছি কিন্তু আমার বিষয়ের প্রশ্নটি দেখে আমি শতভাগ নিশ্চিত হয়েছি যে এরকম প্রশ্নগুলোই পরীক্ষার দু-একদিন আগেই ফাঁস হয়েছে এবং বেশ নির্দিষ্ট চ্যানেলে বেশিরভাগ ছাত্রের হাতে চলে গিয়েছে। আর সেই প্রশ্নপত্রের ওপরই প্রস্তুতি নিয়েই ভালো পরীক্ষা দিয়েছে। এরকম পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সম্মতি ও একান্ত ইচ্ছে ছাড়া সম্ভব নয়। একটি দেশের যুবশক্তিকে নষ্ট বা বিভ্রান্ত করার জন্য এরকম ইচ্ছাকৃত প্রশ্ন ফাঁস করার লুকোচুরি খেলা আর দেশকে পঙ্গু করার অশুভ পাঁয়তারা সমার্থক। এইসব আচরণ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী। একটি দেশের যুব মানস গঠনের জন্য অবশ্যই শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়া অনুসরণ অতীব জরুরি যার বিচ্যুতি আমাদের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করবে এবং সার্টিফিকেটধারী অথর্ব যুবগোষ্ঠী তৈরি হবে। যার ফলে নুর হোসেনরা হিরোতে পরিণত হবে যা ইতোমধ্যে অনেকাংশে সম্পন্ন হয়েছে। যাঁরা এই প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনার প্রতিবাদ করতে চাইলেও করতে পারেননি তাঁরা গণমানুষের শুভবুদ্ধি জাগরণের জন্য একটু হলেও সময় দিন এবং নিজেকে প্রশ্ন করুন—কেন এই আত্মঘাতী খেলা? বরিশাল