হঠাত্ করে বুলবুল!
প্রকাশ : ১৩ মে ২০১৪, ২১:৪৮
দেশি কোচ নিয়োগের পক্ষে সাবেক অধিনায়ক
যাকে বলে, একেবারে নাটকীয়ভাবে মঞ্চে প্রবেশ! মাথার ওপর গনগনে সূর্যের ছড়াতে থাকা উত্তাপে তখন মাঠে তিষ্টানো দায়। দু’ দলের খেলোয়াড়রা অধৈর্য হয়ে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের জন্য অপেক্ষা করছেন। মাঠে চলছে অস্থায়ী মঞ্চ তৈরির পালা। ক্যামেরাগুলো সব ঠিকঠাক করে নেয়া হচ্ছে। ঠিক এই সময় টানেল থেকে একগাল হাসিমুখে মাঠে বেরিয়ে এলেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল।
প্রথমতটা সবাই একটু বিস্ময়ে চুপ করে থাকলেও সম্বিত ফিরে পেয়ে ‘আরে, বুলবুল ভাই’ বলে সবাই ছুটলেন হাত মেলাতে। কেউ কেউ এক সেকেন্ডও অপেক্ষা না করে প্রশ্ন করার জন্য মুখ খুলে ফেলেছিলেন প্রায়। বুলবুল হাসিটা আরো চওড়া করে হাত উঁচু করে বললেন, ‘ভাই, এশিয়া কাপের কিছু হিসাব-নিকাশ বাকী ছিল। সেটা শেষ করতে এসেছি। এর বাইরে কিচ্ছু ভাববেন না প্লিজ।’
বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক, এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের উন্নয়ন কর্মকর্তা ও কোচিং বিশেষজ্ঞ আমিনুল ইসলাম যতই নিষেধ করুন, তার এই হঠাত্ আগমনে অনুমানের সাগরে যে জোয়ার আসবে, তাতে সন্দেহ নেই। বিশেষ করে জাতীয় দলের কোচ এবং আরো কিছু পদের জন্য যোগ্য প্রার্থী খুঁজে পেতে বিসিবি যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন অনেকেই বুলবুলকে দেখে দুয়ে দুয়ে ‘পাঁচ’ মেলানোর চেষ্টা করবেন; এটাই স্বাভাবিক। তবে বুলবুল পরে আনুষ্ঠানিক মত বিনিময়ে পরিষ্কার করে দিলেন, বিসিবি থেকে কোনো পদের জন্যই তিনি কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাননি; পেলে বিবেচনা করবেন। সেই সঙ্গে জাতীয় দলের প্রধান কোচ পদে দেশি কাউকে নিয়োগ দেয়াটা এখন সময়ের দাবি বলেও পরিষ্কার বলে দিলেন আইসিসির সহযোগী দেশগুলোকে নিয়ে কাজ করা এই সাবেক টেস্ট ক্রিকেটার।
শেন জার্গেনসেনের বিদায়ের পরই আলোচনায় এক দফা এসেছিল লেভেল থ্রি সম্পন্ন করা এবং বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের সফল এই কোচের নাম। কিন্তু পরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা এ দফাতেও স্থানীয় কাউকে নিয়োগ দেবে না প্রধান কোচ হিসেবে। তারা বরং বিদেশিই খুঁজতে থাকে। কিন্তু ঝামেলাটা হল, বিসিবির রাডারে বিশেষভাবে থাকা দুই বিদেশি চন্দিকা হাতুরুসিংহা ও মাইকেল বেভানের সঙ্গে কিছুতেই জমছে না। হাতুরুসিংহা ইতিমধ্যে ‘না’ বলে দিয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে এবং বেভাগ কঠিন সব শর্ত জুড়ে দিচ্ছেন।
ফলে বুলবুল ভেতরে ভেতরে আবার আলোচনায় চলে আসাটা অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু বুলবুল বললেন, ‘আমি এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের একটা কাজে এসেছি। বাংলাদেশ টিমের কোচিংয়ের ব্যাপারে বিসিবির কাছ থেকে কোন প্রস্তাব পাইনি। যদি প্রস্তাব পাই তখন চিন্তা করে দেখবো।’
মঞ্চে বুলবুল প্রবেশ করার আগেই অবশ্য তাকে নিয়ে গত পরশু থেকে একটা গুঞ্জন ছিল হালকা করে। বুলবুলকে ‘উপদেষ্টা কোচ’ হিসেবে নিয়োগ দিয়ে একটু ভিন্ন ফর্মেশনের জাতীয় দল কোচিং স্ট্যাফ দাঁড় করানোর একটা চিন্তা নাকি কাজ করছে। যেখানে মাইকেল বেভাগ শুধু সিরিজ বাই সিরিজ আসবেন এবং বিশ্বকাপের আগে টানা কাজ করবেন। সঙ্গে আরো কয়েকজন বিশেষজ্ঞ কোট স্বল্প মেয়াদে দলের সঙ্গে যোগ দিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে বুলবুলই কার্যত কোচিং দলের প্রধান হয়ে উঠতে পারেন।
বুলবুলকে নিয়ে আরেকটি গুঞ্জন বেশ জোরালো—তিনি ক্রিকেট অ্যাকাডেমি, ডেভলপমেন্ট ও কোচিংয়ের প্রধান হিসেবে যোগ দিতে পারেন। রিচার্ড ম্যাকিন্সের বিদায়ের রে জেনিংসে আনার চেষ্টা করেছিল বিসিবি এই পদের জন্য। তিনিও ‘না’ বলায় এই বিকল্পটা ভাবছে বিসিবি। এর কোনোটাতেই বুলবুল প্রকাশ্যে অবশ্য অনাগ্রহ দেখালেন না। বরং আগ্রহের জায়গাটা ব্যাখ্যা করলেন, ‘আমি একজন পেশাদার কোচ। আমি একটা জায়গায় চাকুরি করি। পেশাদারি কোচের ব্যাপারে প্রস্তাব আসলে অবশ্যই তা ভেবে দেখবো।’
বুলবুল এ নিয়ে আর বেশি কিছু বলতে না চাইলেও তার একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র অবশ্য বললো, প্রধান কোচ ছাড়া অন্য কোনো পদে রাজী নন তিনি। অন্যদিকে সেই সূত্রের খবর, অস্ট্রেলিয়ার বাসিন্দা বুলবুল সম্প্রতি ক্রিকেট ভিক্টোরিয়ার সহকারী কোচ হওয়ার প্রস্তাবও পেয়েছেন। এসব বিষয়ে বুলবুল কথা বলতে চাইলেন না। বাংলাদেশ দলে আসবেন কি না, তাও অস্পষ্ট। তবে এটুকু বললেন যে, বাংলাদেশের জন্য কেমন কোচ পছন্দ করেন তিনি, ‘আসলে কোচ তো একজন শিক্ষক, একজন পিতা এবং কোচ একজন ম্যানেজার, কোচ একজন পাবলিক রিলেশন অফিসার। এই জায়গাটা একজন কোচের বিভিন্ন রোল থাকে। একজন সফল কোচের এ বিষয়গুলো সফলকাম হওয়া উচিত। এবং তার এমন একটা পরিবেশ তৈরি করা উচিত, যাতে তিনি সকলের সম্মানিত হবেন, সকলের শ্রদ্ধা অর্জন করবেন।’
এসব গুণাবলীর পাশাপাশি বুলবুল খুব শক্তভাবেই বললেন যে, বাংলাদেশ দলে এখন প্রধান কোচ পদে অবশ্যই বাংলাদেশের কাউকে নিয়োগ দেয়া উচিত। কারণ সমেত ব্যাখ্যাই দিলেন বুলবুল, ‘আমাদের দেশের আট-দশজন লেভেল থ্রি সম্পূর্ণ করে বসে আছেন। তাদের যোগ্যতা নিয়েও সংশয় নেই। আমার মনে হয় দেশিয় কোচদের সুযোগ দেয়া উচিত। আমরা যদি তাদেরকে সুযোগ না দেই তাহলে কিভাবে বলবো তারা যোগ্য কিনা।’ দেশি কোচ নিয়োগে একটা প্রশ্ন সবসময় সামনে চলে আসে যে, দেশি কেউ ড্রেসিংরুমকে ‘শাসনে’ রাখতে পারবেন কি না। প্রশ্নটা শুনে হাসলেন বুলবুল। হেসে নিজের কোচিং দর্শনটাই বলে দিলেন, ‘আসলে ড্রেসিংরুমের পরিবেশটা তৈরি করে নিতে হয়। আমার খুব মনে পরে কার্স্টেন প্রথম যখন ভারতীয় ক্রিকেট দলের কোচ হয়ে আসলেন তখন তিনি বলেছিলেন—ছোট ছোট সমস্যা আমরা দেখবো না, বড় বড় সমস্যা আমরা সমাধান করবো। এই একটা দর্শনই ড্রেসিংরুম স্বাভাবিক রাখতে পারে।’