[ আ ন্ত র্জা তি ক ]

ইতিহাসের নরেন্দ্র যমুনার কোলে কে এই দামোদর?

নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিত্ব তার উত্তরণ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান সীমিত। ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার পর আচমকা তাঁকে ঘিরে কৌতূহল বেড়ে যায়, কিন্তু তার হয়ে ওঠার প্রকৃত, অতিরঞ্জনহীন বৃত্তান্ত, পারিবারিক অবস্থান, ছাত্র জমানার রাজনীতি—এ রকম আরো অনেক তথ্যকে ঢেকে দেয় অজস্র বিতর্ক, নিন্দা-অনিন্দার উচ্চবাচ্য। এবার এই মোদিই যখন ভারতীয় গণতন্ত্রের ভিন্নতর ইতিহাসের নির্মাতা হয়ে উঠছেন, তখন সম্ভবত তার প্রস্বস্তিতে ক্রমাগত ভারি হতে থাকবে অজস্র উচ্চারণ। বেড়ে উঠবে প্রশ্নহীনতার পরিধি। রাজনীতি যেহেতু প্রধানত ক্ষমতাকেন্দ্রিক, যেহেতু এই অসুখ থেকে লোকতন্ত্রেরও রেহাই নেই, যেহেতু বৃহত্তর সমাজ রাজার অনুগত প্রজার মত ক্ষমতাবানের দরবারের দিকে, বারান্দার দিকে ছুটতে থাকে, সে কারণেই জিজ্ঞাসা নয়, সত্যের সন্ধান নয় প্রাধান্য অর্জন করে ব্যক্তিপূজার অশোভনীয় লক্ষণ। নীরবে, ইতিহাস আর সামাজিক দর্শন অবশ্য অন্যপথে চলে। ব্যক্তিকে তার নিজের পরিসরে, তার উত্তরণের প্রেক্ষাপটে হিত অহিতের নিরিখে খুঁজতে থাকে। জন্ম থেকে এ পর্যন্ত, তেষট্টি ঊর্ধ্বের নরেন্দ্র ভাই মোদিকে আমরা সমাজবিজ্ঞানের নির্মোহ নিরপেক্ষ দৃষ্টিতেই খতিয়ে দেখার চেষ্টা করছি। প্রসঙ্গত কয়েকটি প্রশ্নও তুলছি। নিম্নবর্গের সন্তান পুরো নাম নরেন্দ্র ভাই দামোদরদাস মোদি। উত্তর গুজরাটের মেহসানা জেলার প্রান্তিক শহর ভদনগরের সন্তান। জন্ম ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৫০। বাবা দামোদরদাস মুলকচন্দ মোদি। মা হীরাবেন। চার সন্তান সোমা, প্রহ্লাদ, পঙ্কজ আর নরেন্দ্রকে নিয়ে মোদি দম্পতির নিম্নবিত্ত, ভূমিহীন পরিবার। চার ছেলেই স্কুলের পড়ুয়া। ভদনগর স্টেশনে ছোট্ট চায়ের দোকানের আয়ে মুলকচন্দের সংসার চলতো। উপার্জনের দ্বিতীয় কোনো সংস্থান নেই। স্কুল থেকে এসে, কখনো কাকভোরে প্রহ্লাদের সঙ্গে নরেন্দ্রকেও দূর-দূরান্তের রেলযাত্রীদের দরবারের চায়ের কেটলি আর ভাঁড় হাতে ছুটতে হতো। ১৯৬২। বয়স ১২। ভারত-চীন যুদ্ধ লাগল। দেশ জুড়ে দেশপ্রেমের জোর হাওয়া। নরেন্দ্র উত্তেজিত উদ্বুদ্ধ। ফৌজিরা ট্রেনে পূর্বদিকে ছুটছে, বালকের আবেগও ছুটতে থাকে তাদের সঙ্গে। ১৯৬৫, পাক-ভারত লড়াই শুরু। নরেন্দ্র’র বয়স তখন ১৫। গুজরাটের আকাশ ফাটিয়ে যুদ্ধবিমান উড়ছে। ভদনগর স্টেশন দিয়ে দলে দলে সেনা সীমান্তের দিকে এগোচ্ছে। কখনো স্টেশনে ট্রেন থেমে গেলে নরেন্দ্র ছুটে যায়, আহত ফৌজিদের সেবায় স্বেচ্ছায় জড়িয়ে পড়ে। ১৯৬৭ গুজরাট সর্বনাশা বন্যায় ভাসছে। বন্যার্তের সেবায়ও সে এগিয়ে ছুটছে গ্রাম থেকে গ্রামে। আত্মনিষ্ঠ বালকের সাহস, দুঃসাহস, আত্মত্যাগের দৃঢ়তা আরএসএস-এর চোখে পড়ল। তার সাংঠনিক ক্ষমতায় তারা খুঁজে পেলেন গুজরাটী জাতি চিন্তার, সাম্প্রদায়িক হিতাকাঙ্ক্ষার সুপ্ত প্রতিভা। ভাবলেন, বালককে সংগঠনে আনতে হবে। চাই তার কর্মক্ষমতার শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রশিক্ষণ। অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ তখন ধীরে-ধীরে বাড়ছে। ভারত-চীন আর ভারত-পাক যুদ্ধ তাদের সামাজিক ভিতকে ইতিমধ্যে অনেকটাই রসদ যুগিয়ে দিয়েছে। রাজ্যের কংগ্রেস শাসন সাম্প্রদায়িকতার বিস্তারকে রুখতে ব্যর্থ। বরং জাতপাতের ভেদাভেদ আর অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে সাম্প্রদায়িক উস্কানিকে পরোক্ষ ইন্ধন জোগায়। প্রায়ই আহমেদাবাদ ও অন্যান্য শহরে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। কখনো আয়ত্তের বাইরে চলে যায়। পরিস্থিতির সুযোগ নেয় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ। আড়ালে, প্রকাশ্যে তাদের বাহুবিস্তার ঘটতে থাকে। এরকম পরিস্থিতিতেই কলেজ ছাত্র নরেন্দ্র বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিবিপি) প্রথম সারির ছাত্রনেতা হয়ে উঠলেন। কলেজ থেকে বেরিয়ে তিনি গুজরাট বিশ্ববিদ্যালয়ের রাস্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র। এখানেও তার সাংগঠনিক দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত হলো সনাতন ভারতের রাষ্ট্রচিন্তার ভাবাবেগ। পড়াশুনা আর প্রশিক্ষণ, সমাজকর্মে বাড়তে থাকল অভিজ্ঞতা। এমন সময় ছাত্রনেতার সরাসরি সেবক সংঘের যুবনেতা হয়ে ওঠার প্রস্তুতি শুরু। এখানেও তিনি উত্তীর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ, ব্যস্ততায় বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন, হূদয়ে আত্মত্যাগের উত্তাপ-মস্তিষ্কে কর্মযজ্ঞের দীক্ষা। এখন আর নিছক যুবনেতা নন, সর্বার্থে সেবক সংঘের হোলাটাইমার। প্রথমে প্রচারক, পরে দক্ষ সংগঠক-জীবনযাপনে প্রায় সন্ন্যাসী, রাজ্যের নানা প্রান্তে নতুন সদস্য সংগ্রহে ছুটতে হয়। বিশ্রামহীন পরিক্রমা। ওই সময়ই তার ভিন্নতর বোধোদয় ঘটে, আমাকে আরা দৃঢ়চেতা আরো শৃঙ্খলাবদ্ধ হতে হবে-এবং যা ভাববো, সঙ্গে সঙ্গে তার রূপায়ণ চাই, ভাববাদী হওয়া চলবে না, হতে হবে নির্মোহ, সংকল্পবদ্ধ কর্মযোগী। নিজেই তার প্রতিদ্বন্দ্বী সময় আর পরিস্থিতির যথাযথ ব্যবহারে নরেন্দ্র নিজেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী। ১৯৭৪ গুজরাট জুড়ে দুর্নীতিবিরোধী নব নির্মাণ বিক্ষোভ শুরু হলো। সেবক সংঘের নির্দেশে এ আন্দোলনে সরাসরি জড়িয়ে পড়লেন নরেন্দ্র। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭। ভারতে জরুরি অবস্থা চলছে। চারদিকে ব্যাপক ধরপাকড়। রাজনৈতিক, সামাজিক সব কাজেই স্বৈরতন্ত্রের নিষেধাজ্ঞা। সেবক সংঘের তরুণ তুর্কি আত্মগোপনে চলে গেলেও তার সরকার বিরোধী প্রচারে বিরতি নেই। জরুরি অবস্থার প্রত্যাহার, ভোটে ইন্দিরার বিপর্যয়, জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলনের সহযোগী, জনতা দলের নির্মাণ ও উত্থান-সবপর্বেই সক্রিয় তার অংশগ্রহণ। সেবক সংঘ নিশ্চিত, এই তরুণই গুজরাটে, অদূর ভবিষ্যতে তাদের প্রধান রাজনৈতিক মুখ হয়ে উঠবে। স্বয়ং মোদিও সম্ভবত এ ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী, কেননা লক্ষ্যে তিনি অবিচল, যাত্রাপথে গতিশীল। কিন্তু তখনো সরাসরি রাজনীতিতে তার অভিষেক হয়নি, প্রধানত সেবক সংঘের সংগঠক, দক্ষ প্রচারক হিসেবেই পরিচয় সীমাবদ্ধ। জনতা সরকারের জমানায়ও রাজ্যের বাইরে তার নাম প্রায় অচেনা। মিলিজুলি সরকার যখন ভেঙে গেল, রাষ্ট্রপরিচালনায় ফিরে এলেন ইন্দিরা, জনতা দল ছেড়ে বেরিয়ে সেবক সংঘের নেতারা ভারতীয় জনতা পার্টি গঠন করলেন, ঠিক তখনই রাজনীতির মূলস্রোতে নরেন্দ্রের প্রবেশ। ১৯৮৭ সংগঠনের ভরসা বাড়ছে, কিছু কিছু দায়িত্ব তাকে দেয়া হলো, দেখা গেলো-রাজনীতির পরীক্ষায়ও তিনি উত্তীর্ণ। এক বছরের মধ্যেই বিজেপির গুজরাট শাখার সম্পাদক পদে ঊর্ধ্বারোহণ ঘটে গেলো। রাজ্যের সব প্রান্তে বাড়ল দলের রাজনৈতিক প্রতিপত্তি। তার প্রতি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বেও আস্থা বাড়ল, লালকৃষ্ণ আদভানি তার আদর্শ, অটলবিহারী বাজপেয়ির তিনি পরম স্নেহধন্য। প্রশ্নহীন রাজনৈতিক কৌশল রচনার দক্ষতা, রামমন্দির আন্দোলনেরও জবরদস্ত প্রবক্তা তিনি। বিজ্ঞাপিত আত্মপরিচিতি ১৯৮৯, প্রধানত দুর্নীতির অভিযোগে কেন্দ্র থেকে সরতে হলো কংগ্রেসকে, গড়ে উঠলো কোয়ালিশন সরকার, এখানে এই সরকার গঠনের নেপথ্যে বিশেষ করে গুজরাটে দলের অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জনে তার ভূমিকা সবার নজরে পড়লো। প্রসঙ্গত, বলা দরকার, স্বাধীন ভারতের রাজনীতিতে ধর্মীয় ভাবাবেগের ব্যবহার আর নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক উত্থানের বয়স প্রায় সমান। ’৮০-র দশকে অযোধ্যায় রাম জানকরি যাত্রা, দশকের মাঝামাঝি সময়ে শাহাবানু মামলাকে নিয়ে সাম্প্রদায়িক আলোড়ন, বন্ধ বাবরি মসজিদের দরজা, উন্মোচন, উত্তরপ্রদেশে ভোটারের ধর্মীয় মেরুকরণ, বাবরি ধ্বংস-এরকম প্রতিটি ঘটনা ও ঘটনার বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে গুজরাটি জাতিসত্তা আর ধর্মীয় সত্তার মিশ্রণ নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক ঊর্ধ্বারোহণে একাকার হয়ে আছে। তার গুজরাটি বিরাদরি আর শিবসেনার বাল ঠাকরেরমারাঠি জাতিসত্তার উত্স প্রশ্নহীন ভাবেই এক এবং অভিন্ন। এক্ষেত্রে দুজনেরই আদর্শ শিবাজি। আর্য সভ্যতা নিয়ে গৌরবরোধ উভয়েরই অবলম্বন। উনিশ শতকের বাংলার ধর্মীয় পুনরুত্থানের চিন্তা যেভাবে বাঙালির শহুরে নেতৃত্বকে বিভ্রান্ত করে জাতিসত্তার স্বাধীন বিকাশের প্রবল বাধা হয়ে ওঠে, ঠিক তেমনি গুজরাটি ও মারমাঠি জাতিচিন্তাকে তার নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে দূরে সরিয়ে রাখে ওই সনাতনপ্রথা। নরেন্দ্র মোদি অথবা বাল ঠাকরের চিন্তায় ভারতীয় চেতনা যতোটা দুর্বল, ততোটাই প্রখর ধর্মীয় ভাবপ্রবাহ। এখানে মিশ্র সংস্কৃতির জায়গা নেই। আসন নেই বহুত্ববাদী ঐতিহ্যের। ধর্ম নিয়ে গৌরব আর এর সঙ্গে গুজরাটি জাতিসত্তার একমুখী স্রোত মোদির ভাবাবেগকে ব্যবহারিক রাজনীতিকে সব সময় খোরাক জুগিয়েছে। তার ধারাবাহিক, পতনহীন, উত্তরণের এটাই সবচেয়ে জোরদার আশ্রয়। সম্ভবত এজন্যই তিনি অপকটে বলতে পারেন-আমি একজন জাতীয়বাদী দেশপ্রেমিক। আজন্ম হিন্দু, আমি হিন্দু জাতীয়বাদী, তার মানে, জাতীয়তাবাদের চেয়ে হিন্দুত্বকেই অগ্রাধিকার দিতে চান তিনি? উন্নয়ন, প্রগতিশীলতা, কর্মনেশার সঙ্গে এই চিন্তার বিরোধ নেই-এই অকপট স্বীকারোক্তির অভিমুখ কী? এর অর্থ কি এই দাঁড়ায়। যিনি জন্মসূত্রে হিন্দু নন, হিন্দু জাতীয়বাদী নন, তিনি তার উন্নয়নের, উন্নয়নমুখী মানচিত্রের বাইরে থেকে যাবেন? ভারতীয় মুসলিম, খ্রিস্টান, শিখ ও অন্যান্য সম্প্রদায়কে নিয়ে তার রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান জানার সুযোগ হয়নি। গুজরাটের ভোটে, বিশেষ করে ২০০২ সালের পর, তার প্রচারে, ভাষণে বিষয়টি পরীক্ষিত হয়নি, তিনি জানারও অবকাশ দেননি। বরং গুজরাট দাঙ্গায় তার নীরব কৌশলী ভূমিকা এখনো বিতর্কের বিষয়। দাঙ্গায় যারা আহত-উদ্বাস্তু হয়েছেন, তাদের ক্ষয়ক্ষতির শূনতা কি আদৌ পূর্ণ হয়েছে। মাসকয়েক আগে, একদল সমাজবিজ্ঞানী বরোদা ও আহমেদাবাদ সফর শেষে কলকাতায় এসে বলে গেছেন, দাঙ্গার উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন এখনো অসম্পূর্ণ। তাদের অভিজ্ঞতা কতটা নির্ভরযোগ্য, বলা মুশকিল। আমি অন্ধ মোদী বিরোধী নই। আবার স্তাবকতাকেও বিলকুল প্রশ্রয় দিই না। দেশভাগের পর পশ্চিম-পূর্ব এশিয়ায় অজস্র দাঙ্গা হয়েছে। কোথাও এ পর্যন্ত নির্ভুল ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন সম্ভব হয়েছে, এ তথ্য হাতে আসেনি। ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির প্রায় নিশ্চিত দাবিদার কংগ্রেসও এক্ষেত্রে কলঙ্কমুক্ত নয়। মুসলিম লিগ তো নয়ই। কারণ তারা দেশভাগের জন্য ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’-এর ডাক দিয়ে দাঙ্গা চেয়েছিল। কলকাতার বীভত্স গণহত্যার কোনো এক নিস্পৃহ নায়ক পুলিশকে নিষ্ক্রিয় রাখার অভিযোগ থেকে আজও রেহাই পাননি। ইতিহাস অজস্র তথ্য খুঁড়েও তাকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারেনি। ৮৩ সালের চাপিয়ে দেয়া নির্বাচনে আসামে হাজার হাজার মানুষ খুন হয়েছেন। হিতেশ্বর শইকিয়া তখন মুখ্যমন্ত্রী। নেলী হত্যাকাণ্ডে কী ছিল তার ভূমিকা? পরিস্থিতি রুখতে ফৌজ কেন ডাকেননি? এই উপমহাদেশে ক’টি গণহত্যার বিচার হয়েছে? হয়নি। ইন্দিরা হত্যার পর দেশজুড়ে শিখ নিধনের ঘটনা ঘটল। বিচারের বাণীর কান্না কি থেমে গেছে? একইভাবে, গোধরার অযোধ্যা যাত্রীদের ট্রেনে অগ্নিসংযোগের ঘটনাকে ঘিরে কয়েকদিন জুড়ে আহমেদাবাদ, বরোদা ও অন্যান্য শহরে মানুষের সঙ্গে মানুষের সংঘর্ষে, নিরীহ, অসহায়, অবরুদ্ধদের ওপর যে তাণ্ডব ঘটে গেছে, অভিযোগ, রাষ্ট্রের প্রশ্রয়ে- তারও বিচার হয়নি। উন্মত্ত জনতা যখন ঝাঁপিয়ে পড়ে, অগ্নিসংযোগ ও হত্যা শুরু করে- তখন স্বরহীন বৃক্ষেরও রেহাই মেলে না। ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর বিচারদণ্ড খুঁজে পায় না অপরাধীকে। ভারতের গণমাধ্যম, বিশেষ করে টিভি চ্যানেলের দৌলতে দেশ-বিদেশ ওই হত্যাকাণ্ড আর অগ্নিসংযোগের সাক্ষী হয়ে রইল। নরেন্দ্র মোদীর সৌভাগ্য, ধর্মমিশ্রিত গুজরাটি জাতিসত্তা তাকে দায়ী করতে আগ্রহ দেখায়নি। বরং পাশে দাঁড়িয়েছে। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ, পরের নির্বাচনে তার বিপুল জয়। এবং নির্বাচনোত্তর গত এক দশকে মোদীর রাজ্যে একটিও দাঙ্গা হয়নি। কিন্তু চাঁদের গায়ে যে কলঙ্ক লেগে আছে, তা মুছে ফেলা কি সহজ? দুর্নীতিগ্রস্ত বিরুদ্ধ শক্তিও তাকে ‘মৃত্যুর সওদাগর’ বলতে থাকবে। দাঙ্গার ভয় দেখিয়ে দুঃস্বপ্নের পরিত্যক্ত ছবিতে প্রাণ আনার চেষ্টা করবে। মোদী এবং তার দলের নেতারা অবশ্য, অতি অবশ্যই অতীতের কলঙ্ক ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করবেন। তাদের একমুখ সগৌরবে বলতে থাকবে- নরেন্দ্র উন্নয়নের অবতার। মোদী নিজেও বলবেন, ৬৫ কোটি বেকার তরুণের, কর্মহীনের হতাশার অবসান তার সরকারের একমাত্র লক্ষ্য। এর দৃষ্টান্ত কী? গুজরাটের উন্নয়ন। কান্ডারী কে- এককালে ভদনগর স্টেশনের চা বিক্রেতা দামোদরদাসের নির্মাণ ও আত্মনির্মাণের কাহিনী। অথবা পুনর্নির্মাণের মরিয়া চেষ্টা। মোদীর উচ্চকিত ভাষা, তর্জনির উচ্চারণ, বাজপেয়ির অটল ভঙ্গির অনুকরণ এবং ভোটের পরের উচ্ছ্বাস আর পূর্বাভাষ বার বার জানিয়ে দিচ্ছে, ভারতের তখ্ত থেকে তার দূরত্ব মাত্র কয়েক ঘণ্টার। পাঠক খেয়াল করবেন, তার কোনো নির্বাচনী ভাষণেই বিজেপি’র প্রতিশ্রুত রাম মন্দির নির্মাণের প্রসঙ্গ আসেনি, উঠে আসেনি গুজরাটে সাম্প্রদায়িক সম্পর্কের ভাঙনের প্রতিচিত্র, ঠিক তেমনি গড়হাজির ২০০২ সালের দাঙ্গা নিয়ে অনুতপ্ত হূদয়ের দীর্ঘশ্বাস। তিনি কংগ্রেসের ‘খুনি পাঞ্জা’ দেখছেন, কিন্তু নিজ ভূমিতে শুকিয়ে যাওয়া রক্তচিহ্ন, অগ্নিদগ্ধ বস্তি, বাড়ির ভস্ম বা বেকারিতে জ্যান্ত পুড়িয়ে ফেলা লাশ বেমালুম ভুলে সংঘবদ্ধ ভারত নির্মাণের স্বপ্ন দেখিয়ে, ঝড় তুলে বিধ্বস্ত করে দিলেন শতবর্ষের বটবৃক্ষকে। তার মানে সাম্প্রতিক অতীতকে তার চেতন ও অবচেতন থেকে সম্পূর্ণ মুছে দিতে চাইছেন? এটা কতটা বা আদৌ কি সম্ভব, লিখবে ইতিহাস। বলবে ভবিষ্যত্। হ্যাঁ সম্ভব হতে পারে, যদি মোদীর স্বভাব ফিরে যেতে পারে তার অকৃত্রিম, সরলমতি শৈশবের চিত্তে। যেখানে তিনি নিছক একজন চা বিক্রেতা, স্কুল পড়ুয়া এবং যুদ্ধে আহত ফৌজিদের নির্মোহ সেবক বা প্রাণিত দেশপ্রেমিক। তার ভাবমূর্তি তৈরির নেপথ্য শক্তিসংঘ পরিবার কি তাকে এই সুযোগ দেবে? যা দিতে আপত্তি নেই ভারতীয় লোকশক্তি আর নিরপেক্ষ ঐতিহ্যের। লেখক : ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক আরম্ভ পত্রিকা