চাটার দলের দুষ্কর্মের দায় কে বহন করিবে

নারায়ণগঞ্জের এক নূর হোসেনকে লইয়া সারা দেশ তোলপাড় হইতেছে, কিন্তু দেশের আনাচেকানাচে যে এই রকম আরও শত শত নূর হোসেন অপকর্মের অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সাম্রাজ্য গড়িয়া তুলিয়াছে তাহার খোঁজ কে রাখে? স্থানীয় রাজাদের মতো এই নব্য রাজারাও কোনো আইনকানুন, নিয়মনীতির তোয়াক্কা করেন না। খাল-বিল, নদী-নালা দখল, চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায় হইতে শুরু করিয়া গুম-খুন-অপহরণ সবই তাহারা করেন। তবে ততোধিক গুরুতর যে বিষয়টি সাধারণ মানুষের অজানাই থাকিয়াই যায় তাহা হইল, স্থানীয় উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত জাতীয় বাজেটের এক-তৃতীয়াংশ অর্থও সরাসরি চলিয়া যায় তাহাদের উদরে। বাকি এক-তৃতীয়াংশ নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করিয়া লয় সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ। দরিদ্র জনগণের জন্য কেবল পরিকল্পনার খোলসটাই পড়িয়া থাকে। প্রশাসন সবই জানেন। জানেন উর্ধ্বতন মহলও। কিন্তু রাজনীতির নামে যাহারা এই জঘন্য লুটপাট চালাইয়া আসিতেছে দিনের পর দিন— কেহই তাহাদের কেশাগ্র স্পর্শ করেন না। কেবল রানা প্লাজা ধসের মতো তাহাদের পর্বতপ্রমাণ অপকর্মের ভারে গোটা দেশ যখন কাঁপিয়া ওঠে, তখনই অকস্মাত্ প্যান্ডোরার বাক্স খুলিয়া যায়। তাহার ভিতর হইতে একের পর এক বাহির হইতে থাকে তাহাদের পিলে চমকানো সব কুকীর্তির খবর। অথচ কে না জানেন যে, নূর হোসেনদের উত্থান একদিনে হয় না। হওয়া সম্ভব নহে। আবার কেহ ইচ্ছা করিলেই নূর হোসেন হইতে পারেন না। ইহার জন্য ক্ষমতার আনুকূল্য লাগে। অপ্রিয় হইলেও সত্য যে, পঁচাত্তরপরবর্তীকালে যতো সরকার ক্ষমতায় আসিয়াছে সকলেই কমবেশি এই আনুকূল্যের প্রসাদ বিতরণ করিয়াছেন মুক্তহস্তে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে গণতন্ত্রের অনুকূল হাওয়ায় তাহা আরও লাগামহীন হইয়া উঠিয়াছে বলিয়া প্রতীয়মান হয়। ফলে সরকার বদল হইলেও নূর হোসেনদের মতো স্থানীয় স্বঘোষিত রাজাদের দাপট কমিবার কোনো লক্ষণ দেখা যাইতেছে না। শুধু ব্যক্তি বদল হইতেছে মাত্র। অবশ্য ইহা বলা যাইবে না যে, অতীতে অবস্থা একেবারেই ভিন্নরকম ছিল। বলা অপ্রাসঙ্গিক হইবে না যে, সদ্য স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধু মাত্র সাড়ে তিন বত্সর দেশ পরিচালনার সুযোগ পাইয়াছিলেন। এই অতি অল্প সময়ে বঙ্গবন্ধুর মতো মহত্ হূদয় মানুষেরও ধৈর্যচ্যুতি ঘটাইয়াছিল স্থানীয় পর্যায়ের এই উদীয়মান লুটেরার দল। গভীর হতাশা ও আক্ষেপের সহিত তিনি বলিয়াছিলেন যে, পাকিস্তানীরা সবই লুটিয়া নিয়াছে। শুধু চোরগুলি ছাড়া। সেই ‘চাটার দল’ এখন সবকিছুই গ্রাস করিয়া ফেলিতেছে। স্বাধীনতার সেই আকাশচুম্বী আবেগও যখন এইসব মানুষের চিত্তে কোনো প্রভাব ফেলিতে পারে নাই— তখন আমাদের গোড়ার এই গলদ আমরা অস্বীকার করিব কীভাবে? প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে, সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র বা উন্নয়নশীল দেশগুলির বাস্তবতাও খুব একটা ভিন্ন বলা যাইবে না। তবে উদ্বেগের বিষয় হইল, এই দুঃসহ অবস্থা হইতে জনগণকে রক্ষা করা এবং তাহাদিগকে উত্তরোত্তর উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে পরিচালিত করা যাহাদের দায়িত্ব, তাহারা হয় সেই দায়িত্ব পালনে উদাসীন অথবা অপারগ। শুধু তাহাই নহে, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, রক্ষকেরাই অবতীর্ণ হইয়াছে ভক্ষকের ভূমিকায়। ফলে শুধু যে দরিদ্র জনগণের সম্পদ লুণ্ঠিত হইতেছে তাহাই নহে, সেই সাথে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হইতেছে উন্নয়নের ধারা। বিঘ্নিত হইতেছে জননিরাপত্তা। এই অবস্থা চলিতে থাকিলে তাহার পরিণতি কী হয় বা হইতে পারে— চারিপাশে এমন উদাহরণের কোনো অভাব নাই। মনে রাখিতে হইবে যে বঙ্গবন্ধুর মতো বিশাল এবং ত্যাগী মানুষও চাটার দলের অপকর্মের দায় সম্পূর্ণ এড়াইতে পারেন নাই। সংগত কারণেই প্রশ্ন হইল, চাটার দলের দুষ্কর্মের দায় জনগণ ও সরকার কেন বহন করিবে?