মোদীর জয়ের ফানুস সত্য হবে, নাকি ফুটো হবে আজ

এই লেখাটি পাঠক যখন পড়ছেন তখন কাউন্টডাউন শেষে শুরু হয়ে গেছে ভারতের লোকসভা নির্বাচনের ভোট গণনা। প্রায় দুমাস ধরে চলা ৯টি ধাপের ভোটপ্রদান পর্ব শেষ হয়েছে ১২ মে। তার পরের দিনই ভারতের নানা পত্রপত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে ভোটের বুথফেরত সমীক্ষা। সেই সব সমীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতাও আজ যাচাই করে নেওয়ার দিন। ১৯৯৮ সাল থেকে ভারতে লোকসভা নির্বাচনের যে বুথফেরত সমীক্ষাগুলো হচ্ছে, তাতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিজেপি ও তার সহযোগী দলগুলোকে বুথফেরত সমীক্ষায় প্রতিবার অধিক আসন দেওয়া হয়েছে। অথচ বাস্তবে তারা তার থেকে কম সংখ্যক আসন পেয়েছে। উল্টো দিকে কংগ্রেস ও তার সহযোগী দলগুলোর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অনেক কম আসন পাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু, বাস্তবে দেখা গেছে যে কংগ্রেস ও তার সহযোগী দলগুলো অনুমানের থেকে বেশি আসন পেয়েছে। এজন্য বুথফেরত সমীক্ষা সম্পর্কে অনেকে মজা করে বলেন যে, বুথফেরত সমীক্ষা হল ‘ভারচুয়াল’ আর নির্বাচনী ফলাফল হল ‘একচুয়াল’। ভারতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তরফ থেকে প্রধান যে ছ’টি বড় বুথফেরত সমীক্ষার ফল বেরিয়েছে, তার তার মধ্যে ‘টাইমস্ নাউ’ সংস্থার ছাড়া বাকি সবার পূর্বাভাসে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট এককভাবে সরকার গড়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। যদি বুথফেরত সমীক্ষাগুলি সত্যি হয়, তা হলে বলতেই হবে আজ বিজেপি বিপুল আসনে জয়লাভ করবে হেসে খেলে। বিপরীতে, কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ, বাম, এবং অন্যান্য আঞ্চলিক দল—কোনো পক্ষেরই ভারতের সরকার গড়ার কাছাকাছি যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ভারতের অন্যতম বৃহত্ মিডিয়া ‘টাইমস নাও’ এবং ওআরজি-র সমীক্ষা অনুযায়ী এনডিএ জোট আজ পেতে পারে ২৪৯টি আসন। ইউপিএ পেতে পারে ১৪৮টি আসন। এর মধ্যে বিজেপি একাই পেতে পারে ২১০ থেকে ২২০টি আসন। কংগ্রেসের ঝুলিতে আসতে পারে ১০৫ থেকে ১২০টি আসন। এই জরিপেই বিজেপির থলে একটু হালকা। সিএনএন-আইবিএন ও লোকনীতির সমীক্ষা অনুযায়ী এনডিএ জোট পেতে পারে ২৭০ থেকে ২৮২টি আসন। এর মধ্যে বিজেপি একাই পেতে পারে ২৩০ থেকে ২৪২টি আসন। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট ৯২-১০২ টি আসন পেতে পারে। তবে এই সমীক্ষায় কংগ্রেসের দৌড় থামতে পারে ৭২ থেকে ৮২টি আসনে। এবিপি নিউজ-নিয়েলসন সমীক্ষায় ইউপিএ পেতে পারে মাত্র ৯৭টি আসন। এনডিএ জোট পেতে পারে ২৮১টি আসন। ইন্ডিয়া টিভি-সি ভোটারের সমীক্ষা এনডিএ জোটকে দিয়েছে ২৮৯টি আসন, ইউপিএ-কে ১০১টি। হেডলাইনস টুডে-ইন্ডিয়া টুডের সমীক্ষায় এনডিএ পেতে চলেছে ২৭২টির বেশি আসন এবং ইউপিএ-র ঝুলিতে আসতে পারে ১১৫টি আসন। এসব তথ্য অনেক উত্স্যুক পাঠক আগেই জানেন। যেটা ভেবে দেখার, তা হল—বিগত কমপক্ষে দুটি লোকসভা নির্বাচনের বুথফেরত জরিপের পূর্বাভাসের সঙ্গে বাস্তবচিত্রের ফারাক ছিল এতটাই বেশি যে এইসব জরিপের পরিসংখ্যান নিয়ে পুরনো চুটকি সামনে চলে আসে—মিথ্যা তিন ধরনের : মিথ্যা, ডাহা মিথ্যা এবং পরিসংখ্যান বা জরিপ। ইংল্যান্ডের মতো ভারতে সংসদীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোয় জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা মন্ত্রিসভা গঠন করে বিধায় ভারতে বুথফেরত সমীক্ষার ক্ষেত্রে ইংল্যান্ডের বুথফেরত সমীক্ষার মডেল অনুসরণ করা হয়। কিন্তু ভারতের মতো একটি জনবহুল দেশের বহু শ্রেণি, ভাষা, ধর্ম ও জাতির তারতম্যের কারণে বুথফেরত সমীক্ষার পূর্বাভাস অনেকটাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। প্রত্যেকটা লোকসভা কেন্দ্রে অন্তত চার হাজার মানুষের সাক্ষাত্কার নিলে তবেই নির্বাচনের ফলাফল অনেকটা সঠিক আন্দাজ করা যেতে পারে। কিন্তু, তা হলে ভারতের মতো বিপুল ভোটারের দেশে একুশ-বাইশ লক্ষের মতো মানুষের সাক্ষাত্কার নিতে হয়। এই বিপুল সংখ্যার মানুষের সাক্ষাত্কার অল্প সময়ের মধ্যে নিতে হলে প্রচুর লোকবল এবং অর্থবল দরকার। সেটা আজও পর্যন্ত কোনো বুথফেরত্ সমীক্ষাই করে উঠতে পারেনি। ভারতের বুথফেরত সমীক্ষাগুলিতে মোটামুটি পঁচিশ হাজার লোকের সঙ্গে কথা বলে প্রত্যেকটা দলের শতকরা ভোটের ভাগের একটা আন্দাজ করা হয়। তার পর বুথফেরত সমীক্ষা থেকে ভোটের শতকরা ভাগের যে হিসেব পাওয়া যায়, সেটার উপর ভিত্তি করে আসন সংখ্যার অনুমান করা হয়। কিন্তু, সেটা করা হয় একটি নির্দিষ্ট রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাস ও তার লোকসভা কেন্দ্রগুলোর আগের নির্বাচনের ফলাফলকে মাথায় রেখে। বলা যেতে পারে, এই ভোটের শতকরা হিসেবকে আসনসংখ্যায় রূপান্তরিত করাটাই যে কোনো বুথফেরত সমীক্ষার সব থেকে দুর্বল দিক। অঙ্কের হিসেবে কাগজে কলমে এখানে বড় ফাঁকিও রয়েছে। একটা দ্বিদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনো একটি দল ২৫.৫ শতাংশ ভোট পেয়ে ২৭২টা আসন পেতে পারে ৫৪৩টি আসনের মধ্যে। অথচ, আর একটি দল ৭৪.৫ শতাংশ ভোট পেয়ে কেবল ২৭১টি আসন পেতে পারে। কারণ, প্রথম দলটি ওই ২৭২টি -র প্রতিটি আসনে ৫০.০১ শতাংশ ভোট পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করতে পারে, আর দ্বিতীয় দলটি ২৭১টি আসনের প্রতিটিতে ১০০ শতাংশ ভোট পেয়ে জিততে পারে। এমনটি বাস্তবে প্রায় অসম্ভব হলেও অঙ্কের হিসেবে তা কিন্তু সম্ভব। আর জরিপ তো অঙ্কই বোঝে শুধু। ভারতে ২০০৯ সালের লোকসভা ও বিভিন্ন রাজ্যে এর পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচনগুলোর হিসেবের ভিত্তি করে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করা যায়, তা হলে বিজেপি-র আসন সংখ্যা অবশ্যই বাড়তে পারে, কিন্তু বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ এককভাবে সরকার গঠন করার মতো অবস্থায় থাকবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ অবকাশ রয়েছে যথেষ্ট। এদিকে বিজেপি ধরেই নিয়েছে তারা নিরঙ্কুশভাবে সরকার গড়তে যাচ্ছে। অন্যদিকে, কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ যেন ধরেই নিয়েছে যে পরাজয় এবার নিশ্চিত। সে কারণেই কি তারা বিজেপির আপত্তি উপেক্ষা করেই সরকার ও প্রশাসনে বিভিন্ন নিয়োগ আগে আগেই দিচ্ছে? গত মঙ্গলবার পরবর্তী সেনাপ্রধান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করা হয়েছে লেফটেন্যান্ট জেনারেল দলবীর সিং সুহাগের নাম। বর্তমান সেনাপ্রধান ক্ষমতা ছাড়ার মাসদু’য়েক আগে নিয়োগ সংক্রান্ত এই ঘোষণা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল বিজেপি। তবে বুথফেরত সমীক্ষার ফলাফল যতই বিজেপির জয়ের ইঙ্গিত দিক না কেন, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মোদীকে ঠেকাতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন সোনিয়া গান্ধী। মমতা ব্যানার্জী, মায়াবতী এবং মুলায়ম সিং যাদব—এই তিন আঞ্চলিক নেতার সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছেন সোনিয়া নিজে। কংগ্রেস সভানেত্রীর আশা, এই তিনটি দল মিলে ৭৫ বা তার থেকে বেশি সংখ্যক আসন পেতে পারে। কংগ্রেস ও এই তিন দলের আসনসংখ্যা যোগ করলে ২০০ পার হয়ে যেতে পারে। আর কোনো দল ২৭২টির ম্যাজিক ফিগার ছুঁতে না পারলে সরকার গঠনে ডাক দেওয়ার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবেন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী। এই পরিস্থিতিতে অন্য আঞ্চলিক দলগুলির সঙ্গে যোগাযোগ করছেন কংগ্রেস নেতারা। পাশাপাশি কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা শরদ পাওয়ার কথা বলতে শুরু করেছেন জয়ললিতা, নবীন পট্টনায়েক, জগনমোহন রেড্ডিদের সঙ্গে। এই তিনটি দলই এনডিএ-তে যোগ দেওয়ার প্রাথমিক ইঙ্গিত দিতে শুরু করেছে। কিন্তু ইউপিএ নেতৃত্বের আশা, শেষ মুহূর্তে বিজেপি বা এনডিএ-র আসন সংখ্যা প্রত্যাশার থেকে অনেকটাই কম হতে পারে। এবং তা যদি হয়, তবে বিকল্প সরকার গড়ার লক্ষ্যে ঝাঁপাবে ইউপিএ জোট। আজ সকল জল্পনা কল্পনা ছাপিয়ে স্পষ্ট হবে, বিজেপির জয়ের পূর্বাভাসের চিত্রটি কি গ্যাসভরা বেলুন মাত্র? সেই ফানুস কি ফুটো হওয়ার দিন আজ? নাকি সমীক্ষার চিত্র সত্যরূপে আবির্ভুত হবে? লেখক : কথাসাহিত্যিক aranya.ahmed@gmail.com