গাটম্যানের অভিশাপ
প্রকাশ : ১৫ মে ২০১৪, ২২:২৩
কেভিন গামেরিওর শটটা জালে জড়িয়ে গেল। উল্লাসে ফেটে পড়লো সেভিয়ার সমর্থকরা। আর তুরিনের রাত যেন অন্ধকার থেকে অন্ধকারতর হয়ে উঠলো বেনফিকার সমর্থকদের জন্য। আরও একবার নির্দিষ্ট করে বললে, অষ্টমবারের মতো কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরলো পর্তুগীজ ক্লাবটির সমর্থকরা। শুধু কী কান্না? এই কান্নার ভেতর কী আকুতি ছিল না? বেনফিকার সমর্থকরা কী রাতের অন্ধকার আকাশের দিকে চেয়ে কাতর মিনতি করছিলেন না—কোথায় আছো গাটম্যান, ফিরিয়ে নাও তোমার অভিশাপ!
হ্যা, গাটম্যানের অভিশাপ।
অন্তত বেনফিকার সমর্থকরা বিশ্বাস করেন বেলা গাটম্যানের অভিশাপের ফলেই ৫২ বছর ধরে ইউরোপ থেকে একের পর এক এই শেষ মুহূর্তের কান্না সঙ্গী করে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে তাদের। তারা বিশ্বাস করেন, গাটম্যানের দীর্ঘশ্বাসই বেনফিকাকে আটকে দিয়েছে শতবর্ষের এক কান্নার চক্রে।
কে এই বেলা গাটম্যান?
বলা হয় তিনি ফুটবলে ৪-২-৪ ফর্মেশনের প্রবর্তক। তিনি পর্তুগীজ কিংবদন্তি ইউসোবিওর শিক্ষক। তিনি ষাটের দশকের পৃথিবীর সবচেয়ে সফল কোচ। তিনি আজকের হোসে মরিনহোর দ্রোনাচার্য; না দেখা গুরু। কিন্তু এসব পরিচয়ের কোনোটাই বেলা গাটম্যানকে অমর করে ফেলেনি। তিনি অমর হয়ে গেছেন বেনফিকাকে ওই এক অবিশ্বাস্য অভিশাপ দিয়ে।
অভিশাপের গল্পটা জানতে গেলে আরেকটু পিছিয়ে যেতে হবে।
আক্ষরিক অর্থেই সেকালের হোসে মরিনহো ছিলেন এই হাঙ্গেরিয়ান কোচ। ১৪ বছরের খেলোয়াড়ী জীবনে হাঙ্গেরি থেকে যুক্তরাষ্ট্র; বিভিন্ন দেশে আটটি ক্লাব বদলেছেন। হাঙ্গেরি জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন ৪টি ম্যাচ। খেলা ছেড়ে কোচিং শুরু করার পর যেন আরও অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। ৪০ বছরের দীর্ঘ কোচিং ক্যারিয়ারে ২৫ বার দল বদল করেছেন! কোথাও তার শেকড় গড়াতো না।
শেকড় গজাক আর নাই গজাক, সাফল্য সবসময়ই সঙ্গী ছিল তার। বিশেষ করে আলোচনায় এলেন নানা জায়গা ঘুরতে ঘুরতে মরিনহোরই ক্লাব সেই পোর্তোতে এসে। দায়িত্ব নিয়েই ১৯৫৮-৫৯ মৌসুমে পোর্তোকে জেতালেন পর্তুগীজ লিগ। শিরোপা হাতে নিয়ে দল বদলালেন। কোথায় গেলেন। পোর্তোর চিরশত্রু, পর্তুগালেরই বেনফিকাতে।
আর এখানে তৈরি করে ফেললেন ইতিহাস। বলা হয়, এক রেস্তোরাঁয় ডিনার করতে করতে ইউসোবিওকে বেনফিকায় খেলতে রাজি করে ফেলেছিলেন। ইউসোবিওদের একঝাঁক তরুণকে দলে নেয়ার পাশাপাশি বেনফিকাতে এসেই ২০ জন সিনিয়র খেলোয়াড়কে বহিষ্কার করলেন। তাতে বেনফিকা সমর্থকরা রাগ করার সুযোগ পেলেন না। পরের মৌসুমে দলকে লিগ জেতালেন এবং ইউরোপ কাঁপিয়ে বার্সেলোনাকে ৩-১ গোলে হারিয়ে জিতে নিলেন ইউরোপিয়ান কাপ (পরে চ্যাম্পিয়নস লিগ) শিরোপা। এখানেই জাদুর শেষ নয়। পরের বছর আবার লিগ শিরোপা এবং সেই সুবাদে ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনাল। এবার প্রতিপক্ষ আরেক স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ। রিয়ালের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়েই গাটম্যানের বেনফিকা ৩-২ গোলে জিতলো শিরোপা। পরপরই পর্তুগীজ কাপ জেতালেন দলকে। আর এখানেই গল্পটা যেন সেই হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো হয়ে গেল। ইঁদুর তাড়ানো শেষ তো বাঁশিওয়ালার কাজও শেষ!
এই টানা সাফল্যের পর গাটম্যান বেনফিকার মালিকদের বলেছিলেন, কিছু বেতন বাড়িয়ে দিতে; তাহলে আর ক্লাব বদলাবেন না, বাকি জীবনটা এখানে কাটিয়ে দেবেন। হায় রে কর্মকর্তারা! তারা বললেন, বেতন বাড়ানোর কথা কল্পনাও করো না; ওর চেয়ে রাস্তা মাপো। কিংবদন্তি হল, গাটম্যান সেদিন কাঁদতে কাঁদতে রাস্তা মেপেছিলেন।
সবচেয়ে ভয়ানক কথা হল, ক্লাব ভবনের বাইরে এসে বুক চেরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নাকি বলেছিলেন, ‘আমি চলে যাচ্ছি। আগামী একশ’ বছরেও তোমরা আর ইউরোপিয়ান ফুটবলে কোনো শিরোপা জিততে পারবে না।’
ঈশ্বর সম্ভবত সঙ্গে সঙ্গে অনুমোদন করে ফেলেছিলেন এই অভিশাপ!
তারপর দুনিয়ার মানচিত্রই বদলে গেছে। গাটম্যানও আরও অনেক দেশ ঘুরেফিরে ১৯৭৩ সালে পোর্তোতেই ক্যারিয়ার শেষ করেছেন। এর মধ্যে আরও একবার বেনফিকাতেও এসেছিলেন। ১৯৮১ সালে ভিয়েনাতে পরলোকেও পাড়ি দিয়েছেন সেই গাটম্যান। কিন্তু বেনফিকার সেই অভিশাপমুক্তি ঘটেনি।
গত ৫২ বছরে আট আটবার ইউরোপিয়ান শিরোপার নিঃশ্বাস ফেলা দূরত্ব থেকে ফিরে গেছে বেনফিকা। এর মধ্যে তিনবার ইউরোপিয়ান কাপ বা চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে পাঁচবার উয়েফা কাপ বা ইউরোপা লিগ ফাইনালে হেরেছে তারা। ফাইনালে এগিয়ে গিয়েও হেরেছে, পেনাল্টিতে হেরেছে; হার চলছেই।
সেইসঙ্গে চলছে সমর্থকদের কান্না। এমনও বলা হয়, খোদ ইউসোবিও একবার গাটম্যানের কবরে গিয়ে অভিশাপমুক্তির জন্য প্রার্থনা করে এসেছেন। কাজের কাজ কিছু যে হয়নি তা তো এবারের ফাইনালেও বোঝা গেল।
তাহলে এই অভিশাপ আর কতোদিন চলবে? শত বছর পার হতে আর কতো দেরি, মিস্টার গাটম্যান!