অ্যানিমেশনের যত জাদু
প্রকাশ : ১৬ মে ২০১৪, ১৯:৩৮
অ্যানিমেশন সিনেমা দেখেনি এমন সিনেমাপ্রেমী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ‘কুংফু পান্ডা’, ‘টাইলং’, ‘মিকি’ কিংবা ‘ডোনাল্ড’, ‘কারস’, ‘শ্রেক’, ‘সিনডারেলা’, ‘ফাইনাল ফ্যান্টাসি’ সিনেমাগুলো দেখেননি কিংবা এগুলোর কথা জানেন না এমন কেউ নেই। আর আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা এসব অ্যানিমেশন সিরিজের মহাভক্ত। এই চরিত্রগুলো আমাদের এতটাই পছন্দনীয় যে, তারা কিন্তু টিভি বা কম্পিউটারের পর্দা ছেড়ে ঢুকে পড়েছে পেনসিল, ইরেজার কিংবা টি-শার্টেও। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সিনেমাগুলো দেখে থাকলেও আমরা অনেকেই অ্যানিমেশনের এই জগতটি সম্পর্কে তেমন কিছু জানি না। মজার এ জগত্ নিয়ে আমাদের আয়োজনটি লিখেছেন প্রাঞ্জল সেলিম
অ্যানিমেশন কী?
সহজ কথায় বলতে গেলে কল্পনার আশ্রয়ে যেকোনো বিষয়কে চিত্রের মাধ্যমে গতিশীল, জীবন্ত করে তোলাকেই বলে অ্যানিমেশন। এই রুক্ষ বিষয়টিকে আরও সোজাসাপ্টা করে বলতে গেলে এভাবে বলতে হয়, কয়েকটি ছবি বা ইমেজকে পরপর এমনভাবে চোখের সামনে তুলে ধরা হয়, যার থেকে একরকম দৃষ্টি বিভ্রম বা ইলিউশন তৈরি হয়, যা দেখে ছবির বিষয়টিকে মনে হয় গতিশীল। এই ইমেজ কিন্তু আঁকা ছবি, আলোকচিত্র বা ফটো দুই-ই হতে পারে। এটিই হলো দৃষ্টি বিভ্রম বা ইলিউশন। চলচ্চিত্র বলতে প্রচলিত অর্থে সিনেমা বা ভিডিওকে জানি। আবার অ্যানিমেশনের মাধ্যমে বানানো এই চলমান চিত্রকেও আমরা চলচ্চিত্রই বলি। তবে এই দুটোর মধ্যে পার্থক্য নেই বললেই চলে। মুভি ক্যামেরার সাহায্যে কিছু কিছু স্থির ইমেজ, যাদের এক একটাকে আমরা ‘ফ্রেম’ বলি, সেরকম ১৫ থেকে ২০টি ফ্রেমকে যখন প্রতি সেকেন্ডে দেখানো হয়, স্বাভাবিকভাবেই আমাদের চোখের সামনে তখন স্থির ইমেজগুলো চলমান মনে হয়। এটিই হচ্ছে অ্যানিমেশনের কাজ। তফাত হলো এতে কল্পনার প্রভাব থাকে অনেক বেশি। অ্যানিমেশন প্রধানত দুই ধরনের। ট্র্যাডিশনাল অ্যানিমেশন বা প্রচলিত অ্যানিমেশন। অপরটি হলো কম্পিউটারনির্ভর অ্যানিমেশন। ট্র্যাডিশনাল অ্যানিমেশন বা প্রচলিত অ্যানিমেশন হলো সবচেয়ে পুরোনো, শ্রমসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ অ্যানিমেশনের পদ্ধতি। এর আরেক নাম ‘সেল অ্যানিমেশন’। এই ধরনের অ্যানিমেশনে নিযুক্ত থাকেন একদল আর্টিস্ট, যারা সেল নামে এক ধরনের স্বচ্ছ পাতলা কাগজের উপর চরিত্রটিকে আঁকেন। এভাবে অ্যানিমেট করতে গিয়ে, প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত চরিত্রটির যা যা সম্ভাব্য ভঙ্গিমা হতে পারে সেগুলো পরপর সেলে এঁকে ফেলা হয়। এবার সেলগুলো পর্যায়ক্রমে সাজিয়ে ক্যামেরার সাহায্যে ফ্রেমে বন্দী করা হয়। প্রতি সেকেন্ডে এ রকম ১৫ থেকে ২০টি ফ্রেমকে দেখানো হয় এবং তাতে মনে হয় চরিত্রটি সত্যিই ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে।
কম্পিউটারে তৈরি অ্যানিমেশন
কম্পিউটার অ্যানিমেশন জিনিসটি অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর। এক্ষেত্রে বিভিন্ন সফটওয়্যারের সাহায্যে অ্যানিমেশন তৈরি করা হয়। কম পরিশ্রমে, কম সময়ের মধ্যে এমন সব অভিনব জিনিস তৈরি করা যায়, যা ট্র্যাডিশনাল অ্যানিমেশনে অনেক গুণ সময় তো লাগতই, ক্ষেত্র বিশেষে অসম্ভবও। এই কম্পিউটার অ্যানিমেশন আবার দুই ধরনের হয়।
টুডি অ্যানিমেশন
দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ আছে এমন কোনো বস্তুকে যখন অ্যানিমেট করা হয় তখন তাকে টু ডি অ্যানিমেশন বলে। এটি হাতে আঁকা ছবিও হতে পারে বা ফটোগ্রাফিও হতে পারে। ‘টম অ্যান্ড জেরি’ এমনই একটি অ্যানিমেশন সিরিজ।
থ্রিডি অ্যানিমেশন
দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং ভেদ আছে এমন কোনো বস্তুকে যখন অ্যানিমেট করা হয়, তখন তাকে থ্রি ডি অ্যানিমেশন বলে। এক্ষেত্রে চরিত্রটিকে বিভিন্ন সফটওয়্যারের সাহায্যে মডেলিং করে তৈরি করা হয়। নানা ধরনের স্পেশাল ইফেক্টসের সাহায্যে এতটাই বাস্তবসম্মত করে তোলা হয় যে, দেখে বোঝার উপায় থাকে না সেটি আসল নাকি নকল। ‘জুরাসিক পার্ক’, ‘কিং কং’ বা ‘গডজিলা’—সবই থ্রি ডি অ্যানিমেশনের কারসাজি। ‘শ্রেক’, ‘কুংফু পান্ডা’, ‘ওয়াল ই’ প্রতিটি ছবিই থ্রি ডি অ্যানিমেশনের সাহায্যে তৈরি।
অ্যানিমেশনের জাদুর জগতটি
অ্যানিমেশন দুনিয়া আর শুধু ছোটদের বিনোদনের মধ্যেই বসে নেই। অনেক পরিবর্তনের ধাপ পেরিয়ে অ্যানিমেশন এখন সম্পূর্ণ পারিবারিক বিনোদনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। অ্যানিমেশন নিয়ে রয়েছে নানা ক্যারিয়ার অপশন। কম্পিউটার গেমিং ইন্ডাস্ট্রিগুলোতেও বাড়ছে এমন কাজের কদর। বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞাপনী সংস্থা, টিভি চ্যানেল ইত্যাদি জায়গায় রয়েছে অ্যানিমেশন ডিজাইনারদের কাজের সুযোগ। আর্কিটেক্ট বা ইঞ্জিনিয়াররা গাড়ি-বাড়ি ইত্যাদির নকশা বানাতে ব্যবহার করছেন থ্রি ডি অ্যানিমেটেড মডেল। বলা যেতে পারে, এই পেশায় অভিজ্ঞতা থাকলে নিজের অবস্থানটি অনেক ভালো করা সম্ভব।