নাইজেরিয়ায় রুখিয়া দাঁড়ানো গ্রামবাসী

নাইজেরিয়ার তিনটি গ্রামের বাসিন্দারা গত মঙ্গলবার দেশটির বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন বোকো হারামের ২০০ জঙ্গিকে হত্যা করিয়াছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার মাধ্যমে জানা গিয়াছে, দেশটির বোর্নো অঙ্গরাজ্যের কালা বালগে গ্রাম ও পার্শ্ববর্তী দুটি গ্রামে জঙ্গিরা হামলা চালাইলে গ্রামবাসী পাল্টা প্রতিরোধ গড়িয়া তোলে। এই সময় উভয় পক্ষে ব্যাপক সংঘর্ষে নিহত হয় প্রায় ২০০ জঙ্গি। প্রতিরোধের মুখে আরও অনেক জঙ্গি আহত ও আটক হইয়াছে দেশটির উত্তরাঞ্চলে। তাহাতে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়িতে পারে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জঙ্গি হামলা মোকাবিলায় বোর্নোর বেশ কিছু গ্রামে স্থানীয়রা স্বেচ্ছাসেবী পাহারাদার দল গঠন করিয়াছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার বোকো হারামের পক্ষ হইতে হুমকি দেওয়ার পর কালা বালগে গ্রামের বাসিন্দারা এই প্রতিরোধ গড়িয়া তোলে। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে এইরূপ প্রতিরোধ গড়িয়া তোলার জন্য নাইজেরিয়ার গ্রামবাসীদের কতটা মরিয়া হইয়া উঠিতে হইয়াছে, তাহার চিত্র পাওয়া যাইবে দেশটিতে জঙ্গিদের ব্যাপক তত্পরতা ও সরকারের ব্যর্থতার ভেতরে। এই তো মাত্র গত সপ্তাহেই বিচ্ছিন্নতাবাদী বোকো হারাম বড় ধরনের গণহত্যা চালায়। উত্তর-পূর্ব নাইজেরিয়ায় সীমান্ত সংলগ্ন একটি ছোট শহরে দেশটির বোকো হারামের তাণ্ডবে অন্ততপক্ষে ৩০০ জন নিহত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান হইতে যেই তাণ্ডবের কথা জানা গিয়াছে, তাহা যেন গ্রাসবাসীর পৃষ্ঠদেশ দেয়ালে আটকাইয়া যাইবার মতো। হাড় হিম করা বর্ণনায় জানা যায়, হামলাকারীরা গ্রামবাসীদরে ধরিয়া নিয়া জবাই করিয়া হত্যা করে। তত্সঙ্গে জঙ্গিরা বাজারে অত্রাঞ্চলের যানবাহন, গাড়ি, গরু ও শস্য বোঝাই ১৭টি ট্রাক পুড়াইয়া দেয়। ইহার পূর্বে গত মাসে নাইজেরিয়ার উত্তর-পূর্েবর এই এলাকা হইতেই প্রায় দুই শত স্কুল ছাত্রীকে অপহরণ করিয়াছিল বোকো হারামের জঙ্গিরা। ওই ছাত্রীদের উদ্ধার দূর অস্ত, গত মঙ্গলবার আরও আট ছাত্রীকে অপহরণ করে গোষ্ঠীটি। স্বভাবতই এইসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় জনগণ চরম ক্ষুব্ধ হইয়া ছিল। ২০০৯ সাল হইতেই নাইজেরিয়াতে ক্রমশ বোকো হারেমের জঙ্গি তত্পরতা বৃদ্ধি পাইতেছে। তাহা ফি বত্সর এইরূপ চিত্র ধারণ করিতেছে যে, নাইজেরিয়ার সরকার বোকো হারামের তত্পরতা দমাইতে বত্সরখানেক পূর্বে বর্নিও এবং প্রতিবেশী আদামাওয়া ও ইয়োবে রাজ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করিতে বাধ্য হয়। গত বত্সরও জঙ্গিদের একের পর এক তা্লব ও সরকারের জঙ্গিদমন চেষ্টার খবর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার খবরের শিরোনাম হইয়াছে বার বার। বোকো হারামের উগ্র জঙ্গিরা শুধু চলতি বত্সরই এই পর্যন্ত অন্তত ৫০০ মানুষকে হত্যা করিয়াছে। পশ্চিমা শিক্ষার বিরোধী এই জঙ্গিরা এই পর্যন্ত রাতের অন্ধকারে অনেক ছাত্রাবাসে হামলা চালিয়ে শত শত নিরপরাধ স্কুলছাত্রকে হত্যা করিয়াছে। কোনো ব্যাপারে মানুষ অন্ধ হইয়া গেলে তাহার মধ্যে আর অন্য আদর্শ বলিয়া কিছু বোধকরি অবশিষ্ট থাকে না। তাহা না হইলেও কি করিয়া নিরপরাধ ও নিষ্পাপ ছাত্রীদের অপহরণ ও সাধারণ মানুষের ওপর বারংবার এইরূপ হামলা চালানোর নৃশংস মানসিকতায় উদ্বুদ্ধ হওয়া সম্ভব? কিন্তু যাহারা দিন দিন পড়িয়া পড়িয়া শুধু মার খাইতেছে, তাহারা সরকারের বা বাহিরের সাহায্যের অপেক্ষায় চিরকাল নিশ্চেষ্ট হইয়া বসিয়া থাকিতে পারে না। এই বিশ্বের যেইখানে যখনই এই রূপ অরাজকতা, অবিচার ও অন্যায় কার্য চলিতে চলিতে চরমরূপ অর্জন করিয়াছে, তখনই একটি পর্যায়ে আসিয়া সর্বশক্তি দিয়া রুখিয়া দাঁড়াইতে বাধ্য হয় সাধারণ মার খাওয়া মানুষেরা। গত মঙ্গলবার নাইজেরিয়ার তিনটি গ্রামের বাসিন্দারা সেই চিরায়ত রুখিয়া দাঁড়াইবার নিশানাই ঊর্ধ্বে তুলিয়া ধরিয়াছে।