লিভার বিশেষজ্ঞ
প্রকাশ : ১৮ মে ২০১৪, ১৯:৪৭
লিভার হচ্ছে শরীরের সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ অঙ্গ, যা খাদ্য হজমে সহায়তা করে এবং রাসায়নিক ফিল্টারপ্রক্রিয়া হিসেবে কাজ করে। তাই লিভারের যেকোনো সমস্যাতে আমরা শরণাপন্ন হই লিভার বিশেষজ্ঞের। প্রজন্মের কাছে বরাবরই পছন্দের প্রথম পেশা হিসেবে স্বীকৃত চিকিত্সা সেবা। আর এই পেশার একটি উল্লেখ্যযোগ্য বিভাগ হচ্ছে লিভার বিশেষজ্ঞ। মানব সেবার এই অনন্য পেশার প্রতি বরাবরই থাকে সকলের আগ্রহ। তাই এ প্রজন্মের কয়েকজন মেধাবী লিভার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন। গ্রন্থনা ও সম্পাদনা করেছেন
রিয়াদ খন্দকার, সাজেদুল ইসলাম শুভ্র ও ছবি তুলেছেন আহসান রনি
অধ্যাপক ডা. স্বপন চন্দ্র ধর
বিভাগীয় প্রধান, গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলোজি বিভাগ
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল
ছোট্ট এক ছেলে, প্রায়ই পেটের পীড়া দেখা দেয়। মা ঝোপঝাড় খুঁজে ভেষজ চিকিত্সা করেন, তাতেও পুরো সেরে ওঠে না। খবর পাওয়া গেল পাশের শহরে অভিরাম মণ্ডল নামে এক চিকিত্সক এসেছেন, এলএমএফ পাস। তিনি নিজেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন, নিজেই ওষুধ দেন। বাবা ছেলেকে নিয়ে গেলেন, গিয়ে দেখেন সে কি ভিড়! সেদিনই বাবা ছেলেকে বলেছিলেন, ‘পারবি এমন বড় ডাক্তার হতে?’ বাবার স্বপ্ন পূরণ করেছেন সেইদিনের ছোট্ট স্বপন। শুধুই ডাক্তার হননি, এই ক্ষেত্রে শিক্ষক হয়ে অবদান রেখে চলেছেন আগামী দিনের ডাক্তার তৈরিতে। বলছি স্বপন চন্দ্র ধরের কথা, এই সময়ের লিভার বিশেষজ্ঞদের কাতারে তার নাম আসে সর্বাগ্রে, অসম্ভব বিনয়ী এই মানুষটা কথা বলছেন চিকিত্সা পেশার নানা দিক নিয়েও। খুব ভালো রেজাল্ট নিয়ে এসএসসি পাস করে যখন তিনি ঢাকায় কলেজে আসতে চেয়েছেন, বাবার পক্ষে তাতে সায় দেওয়া সম্ভব হয়নি। নিজেই গৃহশিক্ষক হিসেবে থেকেছেন নারায়ণগঞ্জে, তুলারামপুর কলেজে ভর্তি হলেন। শহুরে ছেলেমেয়েদের ভিড়ে অনেকটা একঘরে হয়েই থাকতেন, পরে অবশ্য স্বমেধার পরিচয় দিয়েই নজর আসেন বন্ধু ও শিক্ষকদের। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ায় এই ছন্দে গতিপতন। শেষটায় কাপাসিয়া থেকেই এইচএসসি দেন তিনি। এত বাধাও তাকে আটকাতে পারেনি লক্ষ্যে যেতে। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন তিনি। তারপর অবশ্য সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকাতে সেবা দিয়েছেন সেই সময়ে। আর যখন বিশেষজ্ঞের তালিকায় যুক্ত হলেন, চাইলেন নতুন কোনো বিষয়ে করার। এতে সেবা দেওয়ার নতুন মাত্রা যুক্ত হলো। আর তাই গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলোজিতেই নিজের উচ্চশিক্ষা নেন। এর আগে মেডিসিনে এফসিপিএস করেন।
অধ্যাপক ডা. স্বপন চন্দ্র ধর মনে করেন, কেউ ভালো ডাক্তার হতে পারেন, কেউ ভালো প্রকৌশলী হতে পারেন, কিন্তু নিজের মনুষ্যত্বটাকে জাগাতে হবে। তা না হলে কখনোই ভালো করা সম্ভব নয়। কয়েক বছর আগে রোগী দেখতে দেখতেই খানিকটা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ডা. স্বপন, সুস্থ হয়ে ফিরে এসে তিনি দেখেন সেদিনের রোগীরাও তার সাথে দেখা করতে এসেছেন। ক্ষণিক জীবনে এই ভালোবাসাটাই তার জন্য অনেক বড় বলে মনে করেন তিনি। পথিকৃত্ এই চিকিত্সকের ছেলেবেলা কেটেছে গাজীপুরের কাপাসিয়াতে। বাবা-মায়ের অবদান তার এই জীবনে অনেক বেশি। তার সহধর্মিণী একজন গৃহিণী, যিনি আগলে রেখেছেন এই পরিবারকে। দুই ছেলেমেয়ে তন্ময় আর স্নিগ্ধাকেও ডাক্তার হওয়ার রথে তুলে দিয়ে বাকি জীবনটা চিকিত্সা সেবাতেই মনোনিবেশ করে যেতে চান তিনি। আজন্ম সংগ্রাম করে সফলতার দ্বারে আসা এই চিকিত্সকের জন্য শুভাশীষ।
অধ্যাপক ডা. স্বপন চন্দ্র ধর
ডাকনাম :স্বপন
মায়ের নাম :অবলা বালা ধর।
বাবার নাম :নিহার কান্তি ধর
প্রথম স্কুল :বরাইত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
প্রিয় মানুষ :আমার বাবা-মা
প্রিয় উক্তি :শুদ্ধতম মানুষ হও।
প্রিয় পোশাক :শার্ট-প্যান্ট
অবসর কাটে যেভাবে :পরিবারকে সময় দিয়ে
সাফল্যের সংজ্ঞা :নিজের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো।
===
ডা. এ কে এম শামসুল কবীর
সহযোগী অধ্যাপক, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের বিস্তৃত প্রান্তরে কেটেছে শৈশব-কৈশোরের উচ্ছল দিনগুলো। ছোট্টবেলা থেকেই বিতর্কের সাথে যুক্ত ছিলেন, কথাবার্তাতে সেই প্রাঞ্জলতা তার এখনও। বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন, বিডিএফ বাবু নামেই পরিচিতি পেয়ে গিয়েছিলেন একটা সময়। পড়ালেখা নিয়ে সবসময় সিরিয়াস ছিলেন তিনি, শুধুই পড়ালেখা নয়, যখন যেটা করেছেন, শতভাগ আন্তরিকতা দিয়ে তিনি চেষ্টা করেছেন সেখানে। এসএসসি ও এইচএসসিতে রাজশাহী বোর্ডে মেধাতালিকায় স্থান করে নেওয়া এই চিকিত্সক সুযোগ করে নেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। বলছি এ কে এম শামসুল কবীরের কথা, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন তিনি। ডা. এ কে এম শামসুল কবীর শুধুই লিভার চিকিত্সা নয়, কাজ করছেন এর সচেতনতামূলক বিভিন্ন কাজ নিয়েও। নিয়মিত টেলিভিশনে স্বাস্থ্যবিষয়ক একাধিক অনুষ্ঠানে যোগ দেন। তিনি মনে করেন, রোগীদের রোগ যতটা না প্রকট, তার চেয়ে বড় বিষয় মানসিক সুস্থতা। এ ক্ষেত্রে একজন চিকিত্সকের দুটি কথাও তার জন্য শত ওষুধের চেয়ে বেশি উপাদেয়। এই বিষয়টা যারপরনাই উপলব্ধি করেন ডা. এ কে এম শামসুল কবীর। তিনি চেষ্টা করেন সময় নিয়ে রোগী দেখতে, যার যার মতো করে তাকে রোগটা সম্পর্কে ধারণা দিতে, যাতে তারা নিজেরাই সচেতন হতে পারেন রোগটা সম্পর্কে। কলেজজীবনে তার বন্ধুদের কাছে অসংখ্যবার হাসির পাত্র হয়েছেন এই ক্যালরি মেপে খাওয়ার সুবাদে। তাতেও তিনি কম যাননি, স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল, এই কথাটি মেনে চলেছেন তিনি। চিকিত্সক শামসুল আরেফীনের অনেক বড় শখ ছিল ছেলেও খ্যাতনামা চিকিত্সক হবেন। বাবার সেই স্বপ্ন পূরণ করেছেন ডা. এ কে এম শামসুল কবীর। স্ত্রী মেহেরা পারভীনও একজন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক। অবসরের সময়টা তিনি দেন পরিবারকে। একমাত্র সন্তান মাহির দাইয়ানকে নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন। শত ব্যস্ততার একটা সময় তিনি রেখে দেন সন্তানের লেখাপড়ার হাতেখড়ি দেওয়ার জন্য। সামনের দিনগুলোতে মেধাবী এই চিকিত্সক আমাদের দেশীয় চিকিত্সাব্যবস্থায় অনন্য অবদান রেখে যাবেন, এমনটাই প্রত্যাশা।
ডা. এ কে এম শামসুল কবীর
ডাকনাম :বাবু
মায়ের নাম :বেগম রোকেয়া আরেফীন
বাবার নাম :শামসুল আরেফীন
প্রথম স্কুল :বগুড়া প্রি ক্যাডেট স্কুল
প্রিয় উক্তি :
প্রিয় মানুষ :আমার বাবা-মা
প্রিয় পোশাক :শার্ট, প্যান্ট
সাফল্যের সংজ্ঞা :যেটা করতে চাই, সেটা ঠিকমতো করতে পারা।
===
ডা. মামুন-আল-মাহতাব (স্বপ্নীল)
সহযোগী অধ্যাপক (লিভার বিভাগ)
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
সময়টা আশির দশকের দিকে, ভালো ফলাফল মানেই বাবা-মা চাইতেন ছেলে ডাক্তার হবেন। এইচএসসিতে ভালো ফলাফল করার পর বাবা-মায়ের সেই ইচ্ছে আরও পোক্ত হয়। স্বপ্নীলও মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে সুযোগ পেয়ে গেলেন। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে ১৯৯৬ সালে এমবিবিএস শেষ করেন তিনি। তারপরেও জানার আগ্রহ আর আধুনিক চিকিত্সা শাস্ত্রের সাথে তাল মিলিয়ে চলতেই প্রাসঙ্গিক উচ্চশিক্ষা নেন। লিভার ও পরিপাকতন্ত্রের উপর বিশেষজ্ঞ এই চিকিত্সক ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একাধিক প্রকাশনা ও সেমিনারে নিজের দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। বর্তমানে ডা. মামুন-আল-মাহতাব (স্বপ্নীল) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। শুধু চিকিত্সা শাস্ত্রের ভারিক্কি বিষয় নয়, ডা. স্বপ্নীল কথা বলেছেন চিকিত্সকের আন্তরিকতা নিয়ে। আসলেই একজন চিকিত্সক কথা দিয়ে, মনোবল দিয়ে রোগীকে অনেকটা সুস্থ করে দিতে পারেন। এই চর্চাটা এখনকার চিকিত্সা ব্যবস্থায় অতটা হচ্ছে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে প্রজন্মের এই লিভার বিশেষজ্ঞের। প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়ে ডা. স্বপ্নীল বরাবরই দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন আগেই বলেছি। হেপাটাইটিস বি ও লিভার ক্যান্সার নিয়ে কাজ করে ডা. স্বপ্নীল ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দুই শ’র বেশি প্রকাশনা করেছেন। বিশের প্রায় সব ক’টি লিভার বিষয়ক সম্মেলনে তিনি নিবন্ধ উপস্থাপন করেছেন। তিনি ইউরো এশিয়ান জার্নাল ও হেপাটোগ্যাস্ট্রো-এন্টারোলোজির ডেপুটি এডিটর ইন চিফ। এর বাইরে তিনি লিভার বিষয়ক অসংখ্য প্রকাশনা ও গবেষণা সংস্থার সাথে জড়িত। তিনি বাংলাদেশের লিভার বিশেষজ্ঞদের জাতীয় সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন একাধিকবার। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক একাধিক সম্মাননা স্মারক ও পদক রয়েছেন মেধাবী এই চিকিত্সকের ঝুলিতে। ডা. স্বপ্নীলের ছেলেবেলা কেটেছে ঢাকাতেই। বাবা ছিলেন প্রকৌশলী আর মা গৃহিণী। তার স্ত্রী নূজহাত চৌধুরী বিশিষ্ট চক্ষু বিশেষজ্ঞ। তাদের মেয়ে সুকন্যা আর ছেলে সূর্য দুজনই পড়ছে স্কলাস্টিকাতে। শত ব্যস্ততার মাঝেও ডা. স্বপ্নীলের প্রতিনিয়ত চেষ্টা রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে যাওয়া।
ডা. মামুন-আল-মাহতাব (স্বপ্নীল)
ডাকনাম :স্বপ্নীল
জন্মতারিখ ও স্থান :২২ আগস্ট, কুমিল্লা
মায়ের নাম :আয়েশা মাহতাব
বাবার নাম :মাহতাব উদ্দিন আহমেদ
প্রথম স্কুল :টাইনি টর্স কিন্ডারগার্ডেন
প্রিয় পোশাক :প্যান্ট-শার্ট
প্রিয় উক্তি :পৃথিবীটা একটা প্রতিধ্বনি।
প্রিয় মানুষ :আমার বাবা-মা
অবসর কাটে কীভাবে :লিভারের উপর পড়াশোনা করে, পরিবারের সাথে।
সাফল্যের সংজ্ঞা :কাউকে যখন কোনো কিছুতে সন্তুষ্ট করা যায় সেটিই সফলতা।