গ্যাস সিলিন্ডার রিটেস্টিং নিশ্চিত করা বাঞ্ছনীয়
প্রকাশ : ১৮ মে ২০১৪, ২১:৫১
সমপ্রতিকালে দেশে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা বাড়িয়া গিয়াছে। ইহাতে আগুনে পুড়িয়া মূল্যবান সম্পদ নষ্টের পাশাপাশি ঘটিতেছে প্রাণহানিও। কয়েকদিন আগে মিরপুরে গৃহস্থালি কাজে ব্যবহূত গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণে একই পরিবারের তিনজন গুরুতর আহত হন। এইরূপ দুর্ঘটনায় গত মাসে রাজধানী ঢাকার চানখারপুলে পথচারীসহ ২৫ জন আহত হন। মাস দেড়েক আগে নারায়ণগঞ্জে মারা যায় দুইজন শ্রমিক। এই বত্সরের ৩০ মার্চ কামরাঙ্গিরচরে নিহত হয় তিনজন। তাহার আগে ২২ মার্চ চট্টগ্রামে মাইক্রোবাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হইলে শিশুসহ চারজন মারা যায়। ইহাছাড়া আর কত দুর্ঘটনা ঘটিতেছে যাহার ইয়ত্তা নাই। যাহার খবর আমরা শেষপর্যন্ত পাই না।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের প্রধান কারণ পুরাতন, মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার। নূতন সিলিন্ডার ক্রয়ের অর্থ বাঁচাইতে অনেকে মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার ব্যবহার করেন। সরাসরি বিস্ফোরণ ছাড়াও এইসব সিলিন্ডারের দুর্বল ভাল্বের লিকেজ দিয়া ছড়াইয়া পড়া গ্যাসে অনেক সময় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সিলিন্ডার যত পুরাতন হইতে থাকে, তাহার গুরুত্বপূর্ণ অনুষজ্ঞ ভাল্বও দুর্বল হইয়া পড়ে এবং সঠিকভাবে কাজ করিতে পারে না। আর তখনই দেখা দেয় বিপত্তি। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এলপি গ্যাস ওজনে বাতাসের চাইতে ভারি। লিকেজের মাধ্যমে এই গ্যাস ছড়াইয়া পড়িলে তাহা সবচাইতে নিচু স্থানে আসিয়া জমা হয়। আর সেইখানে কোনভাবে আগুনের স্পর্শ লাগিলে বা বৈদ্যুতিক সুইচের স্পার্ক হইতেও অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হইতে পারে। তাহাছাড়া ইহার ক্ষতিকারক কার্বন শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করিয়া ঘাতক ব্যাধিরও সৃষ্টি করে। এইসব সিলিন্ডার অনেকটা সুপ্ত মাইনের মত কাজ করে এবং আমাদের জানমালের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই এই ব্যাপারে আমাদের সজাগ ও সচেতন হওয়া বাঞ্ছনীয়।
গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ প্রতিরোধে আমাদের দেশে নির্দিষ্ট আইনও আছে। কিন্তু যাহা নাই তাহা হইল আইনের সঠিক প্রয়োগ ও সচেতনতা। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির দুর্ভাগ্য হইল, যথাসময়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আইন-কানুন প্রণয়ন করা হইলেও সেই আইনের প্রতি বহুলাংশে আমাদের শ্রদ্ধা বা আস্থা নাই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমাদের ডোন্টকেয়ার মনোভাব। আইনের শাসন এইখানে যেন সুদূরপরাহত। গ্যাস সিলিন্ডার আইন ১৯৯১-এ সিলিন্ডারের মান যাচাইয়ের জন্য প্রতি পাঁচ বত্সর অন্তর সিলিন্ডার রিটেস্টিং বা পুনঃপরীক্ষা করিবার কথা বলা হইয়াছে। আবার আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থার (আইএসও) স্টান্ডার্ড অনুযায়ীও ইহা বাধ্যতামূলক। কিন্তু তাহাই অমান্য করা হইতেছে পদে পদে। অনেকে ২৫ বত্সরেরও বেশি পুরাতন সিলিল্ডার ব্যবহার করিতেছেন, যাহা খুবই বিপজ্জনক। অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ও সচেতনতা সৃষ্টি হওয়া ছাড়া ইহা হইতে আমাদের পুরাপুরি পরিত্রাণ নাই বলিলেই চলে। যেইসব কোম্পানি গ্যাস সিলিন্ডার তৈরি করে তাহারা নিরাপত্তার বিষয়টিকে বরাবরই অগ্রাধিকার দিয়া থাকেন। ইহার ডিজাইন, কাঠামো, পদ্ধতি ইত্যাদি সবকিছুই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্বারা অনুমোদিত। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ ও রিটেস্টিংয়ে অবহেলার কারণে দুর্ঘটনা বাড়িতেছে। ইহার সিকিউরিটি ক্যাপ খোলার নিয়মসহ বিভিন্ন সতর্কবিধি আছে। এসব বিধি ও নিয়ম মানিয়া চলিবার ক্ষেত্রে সিলিন্ডার সরবরাহকারী কোম্পানিগুলি সহযোগিতাও করে। ভাড়ায় আনা গ্যাস সিলিন্ডার নিয়মিত পরিদর্শন ও টেস্টিংয়ের দায়িত্ব নেয় অনেক সরবারহকারী প্রতিষ্ঠান। তাহার পরও দুর্ঘটনা ঘটে যাহা দুঃখজনক। তাই অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে, পুরাতন ও লক্কর-ঝক্কড় মার্কা গাড়ির বিরুদ্ধে অভিযান প্রেরণের ন্যায় পুরাতন গ্যাস সিলিন্ডারের বিরুদ্ধেও অভিযান যেন জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।