[ রা জ নী তি ]
রাজনীতিতে ত্রিশঙ্কু অবস্থা
প্রকাশ : ১৮ মে ২০১৪, ২১:৫২
দেদেশের রাজনীতি এখন একধরনের ত্রিশঙ্কু অবস্থার মাঝে পতিত হয়েছে। দুটি বড় বুর্জোয়া রাজনৈতিক দল-আওয়ামী লীগ ও বিএনপি— তাদের মধ্যে শক্তির প্রতিযোগিতায় অনেকটা সমান-সমান অবস্থানে রয়েছে। কেউ কাউকে রাজনীতির মঞ্চ থেকে হটিয়ে দিতে পারছে না। সাম্রাজ্যবাদ ও তার দোসর এদেশীয় লুটেরা ধনিক শ্রেণির শক্তির ওপর ভিত্তি করে উভয় দল পরিচালিত হচ্ছে। সেই লুটেরা শ্রেণির পরগাছা মূলক, লুম্পেন ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী চরিত্রের কারণে লুটপাটের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে লুটেরাদের মধ্যে চলছে নিরন্তর প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত। তারই প্রতিফলন ঘটে চলেছে দুই বুর্জোয়া ‘বড় দলের’ এরূপ সমান্তরাল ও একই সাথে সংঘাতময় পাশাপাশি অস্তিত্বের মধ্যে। একাধিক বুর্জোয়া দলের সমান্তরাল ও পাশাপাশি টিকে থাকার বাস্তবতা সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর লুটেরা ধনবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অনুসরণকারী অনেক দেশেই আছে। কিন্তু সেসব বেশিরভাগ দেশেই বুর্জোয়া দল গণতন্ত্রের নিয়ম-কানুন মেনে পাশাপাশি কাজ করে থাকে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও বিএনপি— একই আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও পরস্পরের রাজনৈতিক মঞ্চের সমান্তরাল অস্তিত্ব মেনে রাষ্ট্র ক্ষমতার প্রশ্নে গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি, বিধি-বিধান ও ব্যবস্থা অনুসরণ করে চলতে সম্মত নয়। তার বদলে তারা পরস্পরকে প্রান্তঃস্থিত, তথা কার্যত অস্তিত্বহীন করার অসম্ভব চেষ্টায় নানা ষড়যন্ত্রের কলা-কৌশল গ্রহণ করে চলেছে। অথচ তারা কোনোভাবেই কেউ কাউকে নিশ্চিহ্ন করতে পারছে না। অন্যদিকে আবার গণতান্ত্রিক চর্চার ধারায় তারা পরস্পর সহাবস্থান করার পথও গ্রহণ করছে না। দেশের চলতি রাজনৈতিক সংকটের একটি প্রধান উত্স হলো এখানে।
জোর-জবরদস্তি করে অথবা নানা ধরনের ছল-চাতুরী ও ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নিয়ে হয়তো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি কৃত্রিম বাতাবরণ সৃষ্টি করা যায়। কিন্তু সেই কৃত্রিম স্থিতিশীলতা স্থায়ী হয় না, হয় ক্ষণস্থায়ী ও ভঙ্গুর। যে কোনো মুহূর্তে সেই কৃত্রিম স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হওয়ার আশংকা থাকে। তাছাড়া, বাইরে থেকে একধরনের একটি বাহ্যিক স্থিতিশীল অবস্থা দৃষ্টিগোচর হলেও ভেতরে-ভেতরে সৃজিত হতে থাকে নৈরাজ্যের উপাদান। প্রশ্ন করা যেতে পারে, তাহলে স্থিতিশীলতার গ্যারান্টি কি? এ প্রশ্নের জবাবে বলতে হয় যে, শেষ বিচারে স্থায়ী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা প্রদান করতে পারে কেবলমাত্র জনগণ। জনগণের ইচ্ছাকে পাশ কাটিয়ে বা তার বিরুদ্ধে যেয়ে কোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপ সংগঠিত করা হলে তা শেষ পর্যন্ত স্থিতিশীল হয়ে টিকে থাকতে পারে না। আমাদের দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির ত্রিশঙ্কু অবস্থা ও বিরাজমান অস্থিতিশীলতার অপর একটি প্রধান উত্স হলো এক্ষেত্রেই।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি বিশেষ দিক হলো—দেশে স্থিতিশীল সরকার পরিচালনার জন্য যে পরিমাণ জনসমর্থন না থাকলেই নয়, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের (গৃহপালিত তাঁবেদার ‘সংসদীয়’ বিরোধী দলসহ) তা নেই। বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির অপর দিকটি হলো—এই সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার মতো (কিংবা আগাম নির্বাচন দিতে বাধ্য করার মতো) শক্তিশালী আন্দোলন পরিচালনা করতে যতোটা জনসমর্থন থাকা প্রয়োজন, বিএনপির (জামায়াতসহ তার জোট সঙ্গীদের নিয়েও) তা নেই। পর্যাপ্ত জনসমর্থনের অভাবের কারণে সরকার স্থিতিশীল শাসন চালাতে যেমন অপারগ হচ্ছে, তেমনই ‘রাজপথের’ (সংসদের নয়) প্রধান বিরোধী দলও তেমনি এই সরকারের টিকে থাকার ‘বাস্তবতাকে’ নেতিকরণ করতে অসমর্থ হচ্ছে। অন্যদিকে এই দুই শক্তির বাইরে কার্যকর কোনো বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি এখনো সুগঠিত ও দৃশ্যমান নেই। ফলে জনগণ বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির পেছনে সমবেত হওয়ার জন্যও সেভাবে দাঁড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে না। দেশ এখন এক ধরনের বড় রকম রাজনৈতিক শূন্যতার ফাঁদে আটকা পড়ে গেছে। এ থেকেই দেশের রাজনীতিতে ত্রিশঙ্কু অবস্থার উদ্ভব।
গতবছর দেশে ৫টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তার সবগুলোতে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগের অনেক নেতা এই পরাজয়ের কারণ সম্পর্কে সে সময় বলেছিলেন যে, স্থানীয়ভাবে প্রার্থীর জনপ্রিয়তা থাকলেও ভোটাররা ‘জাতীয় এজেন্ডার কারণে’ আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে ভোট দেয়নি। একথার অর্থ দাঁড়ায়, সে সময়ই তত্কালীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছিল। মানুষ আওয়ামী লীগ থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিতে শুরু করেছিল। জনমতের এরূপ পরিস্থিতির কোনো নাটকীয় পরিবর্তন এখনও ঘটেনি।
আওয়ামী লীগের পেছনে আম-জনতার সমর্থনের ক্ষেত্রে এধরনের গুরুতর ঘাটতি থাকা অবস্থার মধ্যেই এবছর ৫ জানুয়ারি ১০ম জাতীয় নির্বাচন হয়েছিল। বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিয়ে ‘সরকার উত্খাতের’ এজেণ্ডা নিয়ে আন্দোলনের নামে জামায়াত সহযোগে সহিংস তাণ্ডব চালানোর পথ গ্রহণ করেছিল। পর্যাপ্ত জনসমর্থন না থাকার কারণে সেই ‘আন্দোলন’ ফলপ্রসূ হয়নি। গত ৫ মাসে বিএনপি সে আন্দোলনকে পুনর্গঠিত করে আন্দোলনে সফলতা আনার মতো জনসমর্থন সংগঠিত করতে পারেনি। এর একটি কারণ হলো—জামায়াতের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা মানুষকে বিএনপির প্রকৃত এজেণ্ডা সম্পর্কে সন্দিহান করে রেখেছে। দ্বিতীয় কারণ হলো—বিএনপি-জামায়াতের জোট সরকারের আমলে দুষ্কর্ম ও দুঃশাসনের আবার যে পুনরাবৃত্তি হবে না, সে বিষয়ে জনগণের মন থেকে এখনো সন্দেহ দূর হয়নি। বিএনপি এখনো তার শাসনামলের দুষ্কর্মের জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চায়নি। তৃতীয় কারণ হলো— বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতাকেন্দ্রিক বিষয়ে যতোটা হৈ-চৈ করছে, জনগণের ভাত-কাপড়ের ইস্যুসহ জনজীবনের অন্যান্য ইস্যু নিয়ে সেই তুলনায় সে মোটেও সোচ্চার ও আন্দোলনমুখী নয়।
আওয়ামী লীগ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে একতরফাভাবে জিতে আসতে পেরেছে। ১৫৩টি আসনে কোনো ভোটই করতে হয়নি। অধিকাংশ ভোটারকে এভাবে ভোট দেয়ার প্রক্রিয়াতে আসতেই দেয়া হয়নি। অন্যান্য আসনেও ভোটার উপস্থিতি ছিল নগণ্য। তাই অধিকাংশ ভোটের সম্মতি আছে কি নেই— সে বিষয়টি অজানা রেখেই আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে ফেলেছে। সরকারের স্থায়ী স্থিতিশীলতার জন্য ভোট প্রদানের মাধ্যমে প্রকাশিত বেশিরভাগ মানুষের সক্রিয় সমর্থন অপরিহার্য। সেরূপ সমর্থন প্রকাশের ঘটনা এবার ঘটেনি। এই ঘাটতির কথা স্বীকার করে নিয়েই স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের কর্তাব্যক্তিরা সে সময়ই বলেছিলেন যে, এবার নির্বাচন করতে হচ্ছে স্রেফ সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার জন্য, শুধু নিয়ম রক্ষার জন্য। সরকার তখন সঠিক কথাই বলেছিল। যদি সরকারের সে কথা ও উপলব্ধিকে হিসেবে নেয়া হয় তাহলে সে ক্ষেত্রে সরকার গঠনের পর সরকারের জন্য প্রথম ও প্রধান কর্তব্য ছিল যতো দ্রুত সম্ভব তার পক্ষে জনমত ফিরিয়ে আনা। কারণ, এই শর্ত পূরণ ছাড়া স্থায়ীভাবে স্থিতিশীল সরকার চালানো সম্ভব নয়। কিন্তু সে ক্ষেত্রে সরকার শুধু অসফলই হয়নি, নানা ঘটনায় তার জনপ্রিয়তায় ধস এখনো অব্যাহতই আছে।
এদিকে দেশের অবস্থা নানাদিক থেকে আশংকাজনক হয়ে উঠেছে। বিপদ চতুর্দিকে। সংকট ও নৈরাজ্যের উপাদান সর্বত্র প্রসারিত হয়ে সমাজ দেহের অতি গভীরে বাসা বেঁধেছে। দেশের অবস্থান দাঁড়িয়েছে ‘সিরিয়ালবিহীন লাইনের বাসের’ মতো। যেখানে সব ধরনের নিয়ম-কানুন ভেঙ্গে পড়েছে। ‘অনিয়ম’ই হয়ে উঠেছে নিয়ম। নারায়ণগঞ্জ হয়ে উঠেছে এই ভয়ঙ্কর অবস্থার ঘনীভূত নিদর্শন। নারায়ণগঞ্জে সম্প্রতি ঘটে গেছে বীভত্স ও অচিন্তনীয় ‘সেভেন-মার্ডারে’র আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা। সাত-সাতজন মানুষকে দিন-দুপুরে ব্যস্ত রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে জোর করে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে নিয়ে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে লাশগুলোর পেট কেটে ও ইটের বস্তা গলায় বেঁধে নৌকায় বহন করে শীতলক্ষ্যা নদীতে ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে। সবকিছু করা হয়েছে নিপুণ দক্ষতা ও পূর্বপরিকল্পিত ছক ধরে। অপহরণ ও নিরুদ্দেশ হওয়া নিয়ে তোলপাড় হতে হতেই, ‘উধাও’ হয়ে যাওয়ার গুম-নাটকের পরিকল্পিত ছকের একটি বিষয়কে ঘটনাচক্রে অকার্যকর করে লাশগুলো একে-একে নদীতে ভেসে উঠেছে। ফলে ৬ কোটি টাকার নিখুঁত পরিকল্পনায় জট পাকিয়ে গেছে। গোমর ফাঁক হতে শুরু করেছে। ঘটনাবলিকে আরেকটি রহস্যাবৃত নিরুদ্দেশ হওয়ার অমীমাংসিত ঘটনারূপে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ঘটনাক্রমে লাশ ভেসে না উঠলে সবকিছুই হয়তো ধামাচাপা দিয়ে পার পাওয়া যেত। দেশের বিভিন্ন জায়গায় এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে। কোন ‘অপ্রত্যাশিত’ কারণে নদীতে লাশগুলো ভেসে ওঠায় নারায়ণগঞ্জের ‘সেভেন-মার্ডারের’ ঘটনা জানাজানি হয়ে গেছে। এই একটি ঘটনাকে ঘিরে গডফাদার, মাফিয়া চক্র, বেআইনী অস্ত্র, সন্ত্রাস, জবরদস্তি চাঁদাবাজি, জমি দখল, খাল-বিল-নদী দখল, অপহরণ, গুম, খুন, টর্চার চেম্বার, পুলিশ-র্যাবের যোগসাজোশ, মন্ত্রী পরিবারের সম্পৃক্ততা, শাসকদলের ছত্রচ্ছায়া, লুটপাটের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্ব, কোটি টাকার লেনদেন, ভাড়াটিয়া কিলিং-স্কোয়াডের ব্যবসা ইত্যাদি অনেক কিছু প্রকাশ হয়ে পড়েছে।
নারায়ণগঞ্জের এই আলোড়ন তোলা সেভেন-মার্ডারের ঘটনা মোটেও সারাদেশের সার্বিক অবস্থার (দুরবস্থার!) চিত্র থেকে আলাদা বা ব্যতিক্রমী কিছু নয়। জীবদেহের একটি কোষকে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে রেখে তাতে যেমন গোটা দেহের চরিত্রের প্রতিফলন দেখা যায়, নারায়ণগঞ্জের সেভেন-মার্ডারের ঘটনাটি তেমনি হয়ে উঠেছে সারাদেশের বাস্তব পরিস্থিতির একটি ‘ঘনীভূত অভিপ্রকাশ’ মাত্র। দেশের অবস্থা ভয়ঙ্কর! পরিস্থিতির এরূপ ভয়ঙ্কর অধঃপতনের কারণ কি?
কয়েক দশক ধরে চলতে থাকা অশুভ অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থার কারণে দেশের অবস্থার এধরনের বিপজ্জনক পরিণতি ঘটেছে। দেশ চলছে সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর লুটেরা ধনবাদী ব্যবস্থায়। এই ব্যবস্থার ইঞ্জিন চলে ‘লোভ’ ও ‘ভয়’— এই দুই প্রণোদনায়। রাতারাতি বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হতে পারাটাই মুষ্টিমেয় লুটেরা শোষকদের একমাত্র ‘মোটিভেশন’ করে তোলা হয়েছে। ‘আরো বেশি-বেশি সম্পদ বানাও’— এটিকেই করে তোলা হয়েছে সমাজ-অর্থনীতির চালিকাশক্তি ও মূল প্রণোদনা। যেনতেন উপায়ে ধন-সম্পদ হস্তগত করাটা খারাপ কিছু নয়, বরঞ্চ তা দেশের জন্য একটি ভাল কাজ বলে তত্ত্ব হাজির করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে সব মানুষের হাতে সম্পদ ছড়িয়ে থাকলে বিনিয়োগ হবে না। এমনকি, সব মানুষের কাছে সম্পদ ছড়িয়ে দিয়ে, সেই সম্পদের একাংশ রাষ্ট্রের মাধ্যমে সঞ্চিত করা দ্বারাও কাজ হবে না। কারণ সেক্ষেত্রে বিনিয়োগের চেয়ে ঘুষ-দুর্নীতি বেশি হবে। তার চেয়ে দস্যুবৃত্তি ও লুটপাটের মাধ্যমে কিছু মানুষের হাতে ধন-সম্পদ জমা করার সুযোগ করে দিলে একসময় তা ‘চুঁইয়ে পড়তে পড়তে’ নিচতলার কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছাবে। উপরতলায় ধন-সম্পদ কুক্ষিগত করার এই লালসা, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত সমাজের মধ্যেও ‘লোভের’ সামাজিক মনস্তত্ত্ব ছড়িয়ে দিয়েছে। সমাজকে করে তোলা হয়েছে ‘আত্মস্বার্থ’ সিদ্ধি করার তাড়নায় উম্মাদ হয়ে ওঠা এক ‘বাটপারের সমাজ’।
অন্যদিকে, কোনো একজন লুটেরা অন্য আরেক লুটেরা ধনীককে টপকে যেয়ে আবার সর্বেসর্বা হয়ে ওঠে কিনা, সে ‘ভয়’ তাদেরকে সদা তাড়িত করে চলছে। চলছে লুটপাট নিয়ে গলাকাটা প্রতিযোগিতা। এদিকে আম-জনতার মনে অনিশ্চয়তাজনিত ‘ভয়’ সদাক্রিয়াশীল রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। চাকরি চলে যাবে না তো, কাল কাজ পাবো তো, ফসলের দাম দিয়ে আবাদের খরচ উঠে আসবে তো, পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারবো তো, শিক্ষা শেষে চাকরি পাবো তো...? —অনিশ্চয়তা ও নৈরাজ্য সর্বত্র। তা থেকেই ‘ভয়’। এই ‘ভয়’-ই তাদেরকে চোখ বুঁজে শোষকদের লুটপাটের ব্যবস্থার যোগানদাতা রূপে কাজ করতে তাড়িত করে চলেছে।
পুঁজিবাদী নয়া-উদারনৈতিক অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থার পরিণতিতে যে লুটপাটতন্ত্র এদেশে জেঁকে বসেছে তার অবশ্যম্ভাবী ফলাফল হলো রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা ও নৈরাজ্য, গণতন্ত্রহীনতা ও অধিকারহীনতা, বাণিজ্যিকীকরণ ও দুর্বৃত্তায়ন। আমাদের দেশে এই অবস্থা চলছে কয়েক দশক ধরে। রাজনীতি এখন লুটেরা ধনীক শ্রেণির নিয়ন্ত্রণে। ফলে তা এখন চরম রুগ্ন রূপ ধারণ করেছে। তথাকথিত ‘মূল ধারার’ বুর্জোয়া রাজনীতিতে নীতি-আদর্শ নির্বাসিত হয়ে তার জায়গা দখল করে নিয়েছে যেনতেন উপায়ে ক্ষমতায় যাওয়া ও ক্ষমতায় যেয়ে তার অপব্যবহার করে রাতারাতি বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া। নীতি-আদর্শ বর্জিত স্রেফ ‘ক্ষমতা-চিন্তাভিত্তিক’ অপ-রাজনীতির স্বাভাবিক ফসল হলো রাজনীতিতে সন্ত্রাস ও টাকার খেলার প্রাধান্য। একটি দেশ যখন মৌলিকভাবে এরূপ অধঃপতনের পথে চলতে থাকে তখন প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচার ব্যবস্থা, রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্যান্য সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, মিডিয়া, সংস্কৃতি, সামাজিক মনস্তত্ত্ব ইত্যাদি সবকিছুকে সে তার আওতায় সংশ্লেষিত করে নিতে সক্ষম হয়। ক্যান্সারের মতো ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। এখন অবস্থা সেরূপই হয়ে উঠেছে।
লুটপাটের অর্থনীতির ধারায় পরিচালিত রাষ্ট্র ও সমাজ কখনোই স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারে না। অনিশ্চয়তা ও নৈরাজ্য হয়ে থাকে তার ‘নিশ্চিত-বৈশিষ্ট্য’। এই অবস্থারই প্রকাশ ঘটেছে রাজনীতির বর্তমান ত্রিশঙ্কু অবস্থার মধ্যে। রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক একটি আমূল রূপান্তর ব্যতীত এই ত্রিশঙ্কু অবস্থা থেকে উদ্ধার পাওয়ার কোনো উপায় নেই।
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
E-mail : selimcpb@yahoo.com