আলোকপাত

শুধু পাস নয়, মানও নিশ্চিত করতে হবে

এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বিগত কয়েক বছরে একই সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে আমাদের পাবলিক পরীক্ষার ফল নিয়ে। প্রতিবছরই বাড়ছে পাসের হার এবং জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা। এটি নিতান্তই আনন্দের সংবাদ। গত ছয় বছরে পাসের হার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে ২০০৯ সালে পাসের হার ছিল ৭০.৮৯, ২০১০ সালে ৭৯.৯৮, ২০১১ সালের ৮২.৩১, ২০১২ সালে ৮৬.৩৭, ২০১৩ সালে ৮৯.০৩ এবং এবার এই হার ৯১.৩৪ শতাংশ। গতবার জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৯০ হাজার আর এবার পেয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার। বিশ্ব এগিয়ে চলেছে, আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্ম এভাবে এগিয়ে যাবে, এটিই তো স্বাভাবিক, এটিইতো সবার কাম্য। কিন্তু কিছু বিষয় আমাদেরকে তারপরেও ভাবিয়ে তোলে। তারমধ্যে একটি হচ্ছে পাসের হার আর জিপিএ-৫ পাওয়াই যেন আমাদের সকলের মুখ্য উদ্দেশ্য। শিক্ষাদান, মূল্যায়ন এবং প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, অভিভাবক সবাই যেন ব্যস্ত পাসের হার বৃদ্ধি আর জিপিএ-৫ প্রাপ্তি নিয়ে। শিক্ষার মানদণ্ড যেন এ দুটো বিষয়ই। গণিত, ইংরেজি, পদার্থ ও রসায়নে পাসের হার বেড়ে যাওয়ায় সার্বিক পাসের হার বেড়েছে বলে কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন। আমার কাছে মনে হয়, পাসের হার বাড়ানোর জন্য এটি একটি কৌশল মাত্র। আমরা জানি যে, একমাত্র শহরের ভাল ভাল বিদ্যালয়গুলো ছাড়া গ্রামের অধিকাংশ বিদ্যালয়েই বিজ্ঞানের উপযুক্ত শিক্ষক নেই। তাহলে এই বিষয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা এতো ভাল করলো কিভাবে? তা হলে কোচিং সেন্টার থেকে দেয়া নোট বা যা শুধু পরীক্ষায় আসবে তাই গিলিয়ে দিয়ে কিংবা খাতায় যা কিছু লিখলেই নম্বর দেয়া এই বিষয়গুলোই কাজ করেনি কঠিন বিষয়গুলোতে পাসের হার বেড়ে যাওয়ার পেছনে? এবার ইংরেজিতে ঢাকা বোর্ডে প্রায় ৯৯ ভাগ, রাজশাহীতে ৯৯.৪৩ ভাগ, কুমিল্লায় ৯৮.৩১ ভাগ, যশোরে ৯৯.২৪ ভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে। ইংরেজি একটি কঠিন বিষয়। এই বিষয়টি আমরা শিখি বাণিজ্যিক কারণে যাতে দেশে কিংবা বিদেশে ভাল চাকরির ব্যবস্থা হয়। যারা উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করবে তাদের জন্যও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের। এই ভাষায় আমরা যাতে সহজে ‘কমিউনিকেশন’ করতে পারি সেজন্যই এই ভাষা বাধ্যতামূলকভাবে শেখানে হয়। আমরা ৪০ ভাগ কমিউনিকেশন করে থাকি শ্রবণের মাধ্যমে, ৩৫ ভাগ কথা বলার মাধ্যমে, ১৬ ভাগ পড়ার মাধ্যমে আর মাত্র ৯ ভাগ লেখার মাধ্যমে। যে কোন ভাষার ক্ষেত্রে এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। আমরা ইংরেজি ভাষা শিক্ষার্থীদের শেখাই যেখানে লিসেনিং ৪০ ভাগ আর স্পিকিং ৩৫ ভাগ টাচও করি না, শিখাইও না, এর ্উপরে কোন প্রীক্ষাও নেই না। শুধুমাত্র ১৬ ভাগ রিডিং স্কীল ও ৯ ভাগ রাইটিং স্কীল নিয়ে আমাদের পুরো ইংরেজি শিক্ষা ব্যবস্থা। সেখানে রিডিং স্কীল পরীক্ষার জন্য যদি একটি প্যাসেজ বইয়ের বাইরে থেকে দেয়া হয় যা শিক্ষার্থীরা ক্লাসে করেনি তাহলে দেখা যাবে কতজন পরীক্ষার্থী পাস করে, জিপিএ-৫ পাওয়া তো দূরের কথা। আর গত্বাঁধা লেখা ছাড়া নিজ থেকে যদি কিছু লিখতে দেয়া হয় তাহলে যে তারা কি লিখবে তা অন্তত আমরা যারা শিক্ষার সাথে জড়িয়ে আছি তারাই জানি। ভাষার শতভাগ দক্ষতার মধ্যে মাত্র ২৫ শতাংশ ( রিডিং ১৬ এবং রাইটিং ৯ শতাংশ) নিয়ে আমরা ইংরেজি পড়াই, শেখাই আর মূল্যায়ন করি। ৭৫ ভাগ কমিউনিকেশনের দক্ষতা পুরোপুরি বাদ দিয়ে শুধুমাত্র ২৫ ভাগ নিয়ে পুরো বিষয়ের ওপর আমরা তাদের সার্টিফিকেট দিচ্ছি ্এই বলে যে, ইংরেজিতে তোমরা ৮০ নম্বর বা তারও বেশি পেয়েছে অর্থাত্ ইংরেজিতে তুমি উত্কৃষ্টমানের দক্ষতা অর্জন করেছো। এর চেয়ে ‘ফানি’ বা কৌতুকের আর কি হতে পারে আমরা কেউ কি তা ভেবে দেখেছি? একইভাবে সব বোর্ড মিলে পদার্থ বিজ্ঞান ও গণিতে ৯৮ ভাগেরও বেশি ও রসায়নে প্রায় ৯৮ ভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে। বিজ্ঞান শিক্ষার যে কি হাল তা ইংরেজি উদাহরণ থেকেই বুঝা যায়। শিক্ষকরা এখন ক্লাসে পড়ানোর চেয়ে প্রাইভেট কোচিং-এ পড়াতে ও বোঝাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এই রীতিটা শহর থেকে সেই অজপাড়াগাঁয়ের বিদ্যালয়েও সংক্রমিত হয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে প্রচুর আলোচনা হচ্ছে কিন্তু অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। আর এটি প্রতিবছরই ঘটছে তারও কোন পরিবর্তন হয়নি। ৮টি শিক্ষাবোর্ডে ১৬০টি বিদ্যালয়কে সেরা বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে গ্রামের বিদ্যালয়ের সংখ্যা মাত্র ২৬টি। অথচ মোট ২৮ হাজার মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুল ও মাদ্রাসার মধ্যে শহরে রয়েছে হাতেগোনা কয়েক হাজার। অন্যদিকে যে ১ লাখ ৪২ হাজার ২৭৬ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে তাদের বেশিরভাগই শহরের শিক্ষার্থী। উপজেলা পর্যায়ের বিদ্যালয়গুলো থেকেও খুব একটা জিপিএ-৫ পায়নি, প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুলগুলোর কথা তো বলাইবাহুল্য। যে ২৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে একজনও পাস করেনি তার সবগুলোই গ্রামাঞ্চলের। অন্যদিকে শতভাগ পাস করানো ৬ সহস্রাধিক প্রতিষ্ঠানের সবই শহরাঞ্চলের। এই বিষয়গুলোতে কোন পরিবর্তন আনতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শুধু ‘তেলে মাথায় তেল দিতে’ দেখা যাচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে। পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীদের হাতে প্রশ্নপত্র চলে যাওয়া, পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীকে প্রশ্নোত্তর বলে দেয়া বা দেখাদেখির সুযোগ করে দেয়া এমনকি উত্তরপত্র নিখুঁত করে দেয়ার প্রবণতা এবং উত্তরপত্র উদারভাগে মূল্যায়নের নির্দেশনা দেয়ার অভিযোগ প্রায় বছরই শোনা যাচ্ছে। এ অবস্থাগুলোরও তেমন পরিবর্তন হয়নি। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া নিয়ে কর্তৃপক্ষসহ কারুর কোন মাথাব্যথা ছিল না। এ নিয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. জাফর ইকবাল দুটো প্রবন্ধ লিখেছিলেন:‘ আমাকে কেউ কি বলবেন’ এবং ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস করা কি অপরাধ নয়’? তিনি লিখেছিলেন- একটি জাতিকে ধ্বংসের জন্য এই কারণটি যথেষ্ট অথচ কোথাও গুরুত্ব পায়নি ব্যাপারটি, কোন সংবাদ মাধ্যমেও নয়। মনে হয় ব্যাপারটিতে সবাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে। যদি তাই হয় তা হলে এর চেয়ে খারাপ সময় বোধহয় জাতি আর কখনও দেখেনি। সরকার প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীদের শাস্তি দেয়া তো দূরের কথা, ব্যাপারটি স্বীকারই করছে না। লেখক:প্রোগ্রাম ম্যানেজার: ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি এবং ভাইস-প্রেসিডেন্ট: বাংলাদেশ ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ টিচার্স এসোসিয়েশন (বেল্টা)