ভারতে গণতন্ত্রের জয়
প্রকাশ : ১৮ মে ২০১৪, ২১:৫৭
নির্বাচনের পূর্বে জনমত যা বলছিল তার চেয়ে আরো অনেক বেশি জনসমর্থন নিয়ে দিল্লীর মসনদে বসতে যাচ্ছেন নরেন্দ্র মোদী। নির্বাচনের শুরু থেকে ১৬ তারিখ ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত জনবহুল এ দেশটির ষোড়শ সাধারণ নির্বাচনের নিরাপত্তার দিকটি আবারো তাদের অর্জিত সামর্থ্যের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। দেড়শ কোটি মানুষের দেশে ৯ ধাপের এ নির্বাচনে দু’-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া তেমন কোন অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটেনি। যেখানে-সেখানে সেনাবাহিনীকে তলব করতে হয়নি। বিজেপির সাথে স্পষ্টতই কংগ্রেস সরকারের আদর্শিক ও নৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ক্ষমতাসীন সরকারে থাকা কংগ্রেস নির্বাচনের ক্ষেত্রে অন্তত এমন বিশ্বস্ততা অর্জন করেছে যে, বিজেপি তাদের অধীনে নির্বাচনে অস্বীকৃতি জানাননি। দীর্ঘ দুই মাসব্যাপী নির্বাচনে এমনটি শোনা যায়নি মনমোহন বা সোনিয়া গান্ধী বা কংগ্রেসের কর্মী বাহিনী নির্বাচনকে প্রভাবিত করছেন অথবা কমিশন স্বপ্রণোদিত হয়ে সরকারের পক্ষে নির্বাচনী হাওয়া ঘুরিয়ে দিচ্ছেন। বিভিন্ন তারিখে নির্বাচন হলেও ব্যালটবাক্স ছিনতাই বা ফলাফল বেরিয়ে যাওয়ার ন্যূনতম সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত শক্ত ও দক্ষ হাতে সুষ্ঠ নির্বাচনের স্বার্থে প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দেশনা প্রদান করছেন। ছয় কর্মকর্তাকে নির্বাচনকালীন বদলির জন্য মমতাকে বাধ্য করাসহ যে কোন আচরণ বিধি ভঙ্গের তাত্ক্ষণিক নির্দেশনা জারি করছে। অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে ফলাফল ঘোষণার মাধ্যমে নির্বাচনী উত্তেজনার সফল সমাপ্তির মাধ্যমে ভারত গণতন্ত্রের জয়যাত্রার আরো একধাপ এগিয়ে গেল। অন্যদিকে আমাদের দেশে নির্বাচনে কি হয়? নিরাপত্তা বাহিনী বা দলীয় কর্মী বাহিনীর দৃশ্যপট কেমন থাকে? মনে হলেই গা শিউরে ওঠে।
গুজরাটের সাধারণ পরিবারের সন্তান নরেন্দ্র দমোদর দাস মোদী দিল্লী কেন্দ্রীক রাজনীতির খোলস ভেঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আসন অলংকৃত করতে যাচ্ছেন। অভিনন্দন মোদী ও তার দল বিজেপিকে। বিজেপি ভারতের ডানপন্থী হিন্দুবাদী দল হিসেবে পরিচিতি পেলেও সময়ের প্রয়োজনে অনেক পরিবর্তন এনেছে। আধুনিক ভারতীয় যুব সমাজসহ সকল ভোটারদের মাঝে নিজেদের অসাম্প্রদায়িক হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছেন। অধিকাংশ মুসলিম প্রধান এলাকায়ও এবার বিজেপি প্রার্থী জয়ী হওয়াই এর প্রমাণ। কংগ্রেস ধর্মনিরপেক্ষতার লেবাসে নিজেদের দুর্নীতি স্বজনপ্রীতি বদনাম ঘুচিয়ে এবার নির্বাচনী বৈতরনী পার হতে পারবে না আগে থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। একটানা দশ বছর শাসন কার্য চালিয়ে কংগ্রেস দল হিসেবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল বলেই মনে হয়। ড. মনমোহন সিং-এর ব্যক্তিগত ইমেজ ভাল থাকলেও দলীয় কারণে অনেক অন্যায় ও দুর্নীতির সাথে তাকে আপোষ করতে হয়েছে। আন্না হাজারের দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনকে যারা গুরুত্ব না দেয়ার পরামর্শ কংগ্রেস নেতৃত্বকে দিয়েছিল তা যে সম্পূর্ণ ভুল ছিল এবার নির্বাচনে তা হারে হারে টের পেয়েছে কংগ্রেস। কেবল কংগ্রেস নয় উত্তর প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টি, তামিলনাড়ুর সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এম করুণানিধির দল, ডিএমকে জিতেনি একটি আসনও। শারদ পাওয়ারের ন্যাশনালিস্ট পার্টিও কোন আসন পায়নি। মোদীর বিরুদ্ধে গুজরাট দাঙ্গার অভিযোগ থাকলেও পরবর্তীতে আইনী লড়াইয়ে তিনি জিতে যান এবং গুজরাটের ব্যাপক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন তাকে গুজরাটের নেতা থেকে ভারতের জাতীয় নেতায় রূপান্তরিত করে। তার ব্যক্তিগত ইমেজের কাছে একে একে সকলেই ধরাশায়ী হন। নির্বাচনী বৈতরনী পার হওয়ার জন্য অনেক কিছু বললেও নির্বাচনে জেতার পর তিনি জাতীয় বীরের মতই বিবৃতি দিয়েছেন। বলেছেন, “এটা ভারতের গণতন্ত্রের বিজয়, বিজয় জনগণের এবং বিজেপির নিবেদিত কর্মীদের।” প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার পর আমরা যোগ্য ও জাতীয় নেতা হতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার সফল পদচারণা দেখতে পাব। হাজার মত, পথ ও জাতিভেদের ভারতকে যোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি এগিয়ে নেবেন এটাই প্রত্যাশা। এ প্রত্যাশা থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীসহ সকল রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজ নতুন নেতৃত্বকে স্বাগত জানিয়েছে।
তিনদিকে ভারত পরিবেষ্টিত বাংলাদেশ ‘কারো সাথে শত্রুতা নয়, সকলের সাথে বন্ধুত্বের নীতিতে বিশ্বাসী।’ ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক অনেক কারণেই বাংলাদেশ অনেক বিষয়ে ভারতের সাথে সংযুক্ত। ভারতের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। বাংলাদেশের সাথে অভিন্ন ৫৪টি নদীর অধিকাংশের পানির বেশিরভাগ ভারত ব্যবহার করছে।
বিশেষ করে তিস্তা আমাদের মরণফাঁদ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। তিস্তার পানি না পাওয়ার কারণে উত্তরাঞ্চলের কৃষকরা এক দিকে হাহাকার করছে অপরদিকে তিস্তা বিধৌত এলাকায় মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অধিকাংশ গাছপালা শুকিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়াও সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্যে অসমতা, সীমান্ত বাণিজ্য, শিক্ষা-সংস্কৃতির বিনিময়, বাংলাদেশি পণ্যের ভারতে শুল্কমুক্ত প্রবেশসহ আরো অনেক বিষয় রয়েছে যা ভারতের স্থিতিশীল ও আমাদের মত প্রতিবেশীর সাথে সহানুভূতিশীল সরকারের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান হতে পারে। বর্তমান সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র ও জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল নতুন মোদী সরকার সহনশীল ও বন্ধুসুলভ আচরণ করবেন— বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে আমরা তাই প্রত্যাশা করি।
লন্ডনের ল্যান্ডহ্যাল স্ট্রীটে ইন্ডিয়া হাউজের অবস্থান ছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী এ হাউজ থেকেই ভারতে তাদের নিবর্তনমূলক শাসন ও সাম্রাজ্যবাদী বাণিজ্য পরিচালনা করতো। বাণিজ্যের নামে ভারতীয় উপমহাদেশের সম্পদ কেনারী ওয়ারফ ডকের মাধ্যমে ইন্ডিয়া হাউজে গুদামজাত হতো। উপমহাদেশের হিন্দু-মুসলমানসহ সকল জাতিগোষ্ঠী সম্মিলিত প্রয়াসে সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ সরকার এদেশ থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে নেয়।
সাথে সাথে ইন্ডিয়া হাউজও ভেঙ্গে ফেলা হয়। বৃটিশরা লন্ডনে পরাজয়ের নিশানা রাখতে চায়নি। বর্তমান লন্ডনে ভারতীয় দূতাবাসে ইন্ডিয়া হাউজের কিছু ধ্বংসাবশেষ সংরক্ষিত আছে শুনে কৌতূহলবশে দেখতে গিয়েও সময়ের সাথে তাল মিলাতে না পারায় সম্ভব হয়নি। যে বৃটিশরা সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে আমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছিল, যে সাম্রাজ্যবাদকে উত্খাত করতে পারলেও ইন্ডিয়া হাউজ ধ্বংসের ন্যায় সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পকে সমূলে উত্খাত না করে বরং কয়েক দশকের ব্যবধানে এর উত্কর্ষতা ও বিকাশ আমাদের ব্যর্থতা আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। এ ব্যর্থতার ক্ষেত্র বিশেষ সাম্রাজ্যবাদের চেয়েও গ্লানিকর। এ ব্যর্থতার গ্লানি নতুন প্রজন্ম টানতে চাইবে না বলেই আমাদের বিশ্বাস। ভারতের নতুন নেতৃত্ব ভারতবর্ষসহ সমগ্র উপমহাদেশকে এ ক্ষত থেকে বের করে আনতে সাহায্য করবেন, আজকের দিনে এটাই হোক সকলের প্রত্যাশা।
[ লেখক: অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক]