নদীভাঙ্গন :বিপর্যয় ও বাস্তবতা

বাংলাদেশে নদীভাঙ্গন নতুন কোন বিষয় নহে। এই অঞ্চলের ইতিহাসের সহিত নদীভাঙ্গন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বর্ষাকাল যখন ঘনাইয়া আসে, নদ-নদীর পানি যখন বাড়িতে শুরু করে তখন দেশের বিভিন্ন জেলায় নদীসংলগ্ন এলাকাগুলির বিশাল অংশ নদীগর্ভে বিলীন হইয়া যায় প্রতিবছরই। হিসেব মতে, এদেশের মোট আয়তনের ৩২ ভাগ এহেন ঝুঁকির মধ্যে রহিয়াছে। নদী ভাঙ্গনের সময় গৃহস্থালি সম্পদ নষ্ট, ঘর-বাড়ি, ফসলী জমি নদীতে বিলীন হইবার ঘটনা ঘটে। ভাঙনের ছোবলে বাস্তুহারা হয় নদী পাড়ের বসবাসকারী হাজারো পরিবার। আপন ভূমি রক্ষা করিবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চলে নদীকূলের মানুষের। কিন্তু নদীর দানবীয় আচরণ তাহাদের সকল প্রতিরোধকে কোনরূপ সমীহ না করিয়াই কাড়িয়া লয় সবকিছু। এক সময়ের সচ্ছল পরিবারগুলি সহায়-সম্বলহীন হইয়া ঘুরিতে থাকে দ্বারে দ্বারে। সন্তান, সন্ততি লইয়া অপরের সাহায্য প্রার্থী হয়। উন্মূল হইয়া অনেক পরিবার রাস্তার পাশে, বাঁধের ওপর রেললাইনের ধারে আশ্রয়গ্রহণ করে। দেশের নিম্ন আয়ের মানুষের মোট সংখ্যারও বড় অংশ এই নদী সিকস্তি জনগোষ্ঠী। গবেষণায় দেখা গিয়াছে, নদীভাঙ্গনের ফলে বত্সরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি টাকা। প্রতি বছর গড়ে ২৫০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা নদীতে বিলীন হইয়া গেলেও বিপরীত পাড়ে চর জাগিয়া উঠিবার হার ইহার মাত্র ১০-১২ শতাংশ। সামপ্রতিক সময়ে ইহা আরও কমিয়া যাইতেছে উদ্বেগজনক হারে। নদী সিকস্তিদের কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুনর্বাসন করা গেলেও তাহাদের অর্থনৈতিক কার্যাবলী আর আগের অবস্থায় ফিরিয়া আসিতেছে না কোনমতেই। যাহার প্রভাব জাতীয় অর্থনীতিতেও প্রকট। বাড়িয়া চলিয়াছে দারিদ্র্য। শহরাঞ্চলেও ইহার চাপ পড়িতেছে। ইহাছাড়া, নদীক্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর খাদ্য, চিকিত্সা, শিক্ষাসহ সকল মৌলিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পড়িয়া যাইতেছে হুমকির মুখে। নদীভাঙ্গন প্রধানত প্রাকৃতিক কারণে হইলেও ইহাতে রহিয়াছে জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপক প্রভাব। বাংলাদেশের নদী অববাহিকার মৃত্তিকা বেশিরভাগক্ষেত্রেই বেলে এবং দোআঁশ। ফলে স্রোতের আঘাতে সহজেই ভাঙ্গিয়া পড়ে। উপরন্তু আমাদের বিভিন্ন নদীতে দেখা যায় অনমনীয় বাঁক। ওইসব বাঁকে ভাঙ্গন দ্রুত হয়। ব্যাপক বৃষ্টিপাত হইলে নদীতে পানি বাড়ে এবং স্রোত তীব্র হয় এবং ইহা কোনো কারণে বাধাপ্রাপ্ত হইলে নদীর তীরবর্তী এলাকায় আছড়ে পড়ে সৃষ্টি হয় ভাঙ্গনের। বাংলাদেশ সরকার নদীভাঙ্গনের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করিয়া আসিতেছে প্রথম হইতেই, কেননা দেশটির প্রায় ২৮ শতাংশ মানুষের বাস নদী তীরবর্তী অঞ্চলসমূহে। বহুক্ষেত্রে বেড়িবাঁধ এবং নদীপাড় বাঁধিয়া দেওয়ার পরও নদীভাঙ্গন রোধ করা সম্ভব হইতেছে না। আবার একথাও অনস্বীকার্য যে, ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিটি স্থানে বাঁধ দেওয়ার সামর্থ্য এখনো গড়িয়া উঠে নাই বাংলাদেশের। তাহা ছাড়া রহিয়াছে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাব ও বাস্তবায়ন ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা। আবার নদীভাঙ্গন রোধে স্থায়ী সমাধানও প্রায় অসম্ভব। কিন্তু সামর্থ্যের মধ্যে যাহাই করার তাহাই করিতে হইবে নিয়মমাফিক এবং নিশ্চিত করিতে হইবে ক্ষুদ্র এই প্রচেষ্টাগুলি যেন কোনোরূপ অনিয়মের কারণে বাধাপ্রাপ্ত না হয়। অধিক গুরুত্ব দিতে হইবে দ্রুত পুনর্বাসনে এবং ভাঙ্গনপীড়িত জনগোষ্ঠী যাহাতে দ্রুতই অর্থনৈতিক কার্যাবলীর সহিত যুক্ত হইতে পারে সে লক্ষ্যে বাস্তবোচিত পরিকল্পনা গ্রহণের ব্যাপারে। বিপরীত পাড়ে জাগিয়া উঠা চর যাহাতে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে সুষমভাবে বণ্টিত হয় তাহার ব্যবস্থা করিতে হইবে কোনোরূপ আইনি জটিলতা ব্যতিরেকে। গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ঐতিহ্যবাহী জনপদগুলিকে নদীভাঙ্গন হইতে রক্ষা করিবার জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণ করা একান্ত বাঞ্ছনীয়।