স্মরণ
ওডারল্যান্ড :চিরশুভ্র সমুজ্জ্বল বন্ধু আমাদের
প্রকাশ : ১৯ মে ২০১৪, ২২:৫৮
এ লেখাটি যখন লিখছি আমার স্মৃতি জুড়ে ভীড় করে আছেন এক সংগ্রামী নায়ক। তাকে মহানায়ক বলতে পারলেই খুশি হতাম। কিন্তু রাজনীতি তা মানে না। এই মানুষটি আমাদের বিজয়ের জন্য আত্মত্যাগের মত কঠিন সংগ্রামে নামতেও দ্বিধা করেননি। আমরা তার কেউ নই। না তার আত্মীয় না বান্ধব না পরিজন। তিনি তখন ঢাকায় বাটার উচ্চপদে আসীন এক বিদেশি ভদ্রলোক। একাত্তরের ঘনঘটা মাথায় নিয়ে আমরা যখন যুদ্ধে যাচ্ছি আমাদের মাথার ওপর শকুনের পাল হাওয়ায় বারুদ আর মৃত্যুর পরোয়ানা এই ভদ্রলোক তখন বিবেক ও চেতনাবোধে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন. তার নিজের রক্তেই ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মত ভয়াবহ যুদ্ধ ও যুদ্ধকালীন অসহায়ত্বের স্মৃতি। ভোলেননি নিজদেশে পরবাসী হবার যন্ত্রণা. ডাচ-অষ্ট্রেলিয়ান ওডারল্যান্ড ঢাকার মাটিকে বাঙ্গালি বিরান করার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। নিজের জীবন বাজী রেখে গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণের পাশাপাশি তিনি মুক্তিফৌজকে ট্রেনিং দিতেও কসুর করেননিণ তার ব্যক্তিগত পিস্তলটিও দিয়ে দিয়েছিলেন। এ কে এম জয়নূল আবেদিন বীরপ্রতীক কে দেয়া সে পিস্তলের কাহিনী জানি না আমরা। পাকিস্তানী সেনাদের সাথে সখ্যতার কারণে তিনি যেসব তথ্য পেতেন তার সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও সশস্ত্র সংগ্রামকে বেগবান করেছিলেন এই মানুষটি।
আমাদের দায় বা বিবেক তাকে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় ৭৮ নাম্বারে স্থান দিয়েই খালাস। স্বাধীনতার পর এই বীরপ্রতীক কোথায় আছেন কেমন আছেন বা তাকে কিভাবে সম্মান দেয়া যায় তা নিয়ে সরকারি পর্যায়ে খুব একটা মাথা ব্যথা ছিল না। বঙ্গবন্ধুর অকাল মৃত্যু চার নেতার তিরোধানের পর ইতিহাস বিকৃতির ঠেলায় তিনিও চলে গেলেন বিস্মৃতির অন্তরালে। জিয়ার আমলে একবার দাওয়াত পেলেও তিনি যাননি। এরপর এরশাদের আমলে তিনি নিজেকে সবচেয়ে বড় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রমাণের ব্যস্ততায় এদের কথা মনে রাখারও ফুরসত পাননি। আমার সিডনি তথা অষ্ট্রেলিয়া বাসের গোড়ার দিকে অবগত হয়ে ফোন নাম্বার পাবার পর আমি তার সাথে কথা বলি। তখন তিনি গুরুতর অসুস্থ। তার স্ত্রী ফোন দিতে নারাজ। তার একটাই আপত্তি বাংলাদেশের কথা শুনলেই ভয়ানক উত্তেজিত আর ইমোশনাল হয়ে পড়েন বলেই ফোন দেয়া যাবে না। এই উত্তেজনার কারণ ও কিন্তু চমত্কার। বাংলাদেশ যখন ইতিহাস বিকৃতি আর রাজ উজীরের পালা বদলে মুক্তিযুদ্ধের বারোটা বাজাতে ব্যস্ত বিদেশি এই মুক্তিযোদ্ধা তখন আমাদের ইতিহাস ও অতীত নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমিও ছিলাম নাছোড়বান্দা। আমার মাথায় তখন এক চিন্তা কিভাবে তার সাথে কথা বলা যায়। মারিয়াকে বার বার ফোন করায় তার মন গলে একসময়। খুব জোর পাঁচ মিনিট। অসুস্থ ওডারল্যান্ডের কণ্ঠস্বরই বলে দিচ্ছিল তিনি ক্লান্ত। চোখেও ভালো দেখতে পেতেন না সে সময়। ভয়ানক জোরালো আর উঁচু স্বরে কথা বলছিলেন তিনি। ফাঁকে ফাঁকে এক প্রশ্ন তোমার মুজিবকে কেন মেরেছো? বলাবাহুল্য, এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার সাহস বা যোগ্যতা কোনটাই আমার নেই। আমার মত ভীরু বাঙ্গালিকে এ প্রশ্নের জবাব খুঁজেই জীবন পাড়ি দিতে হবে। বলেছিলেন সে ঘৃণায় তিনি আর কোনদিন যাবার চিন্তাও করেননি। একই আবেগ আর ক্রোধ পেয়েছিলাম বিলেতে শায়িত সাংবাদিক ব্রুস উইলসনের কণ্ঠস্বরেও। সে কথা পরে বলা যাবে। ওডারল্যান্ড বলেছিলেন তার ত্যাগ আর ভালোবাসার এই পরিণাম হবে জানলে তিনি তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতেন। এ ছিল তার রাগের কথা। আর্শীবাদ করেছিলেন এই বলে বাংলাদেশ যেন মুক্তিযুদ্ধের আদর্শচ্যুত না হয়। এক পর্যায়ে তার স্ত্রী ফোন কেড়ে নিয়েছিল বলে কথা আর এগোয়নি। এর কিছুদিন পর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র বিদেশি বীরপ্রতীক ওডারল্যান্ড সময়ের বরপুত্র। বিশ্বযুদ্ধ তাকে তৈরি করেছিল আর মুক্তিযুদ্ধ তাকে দিয়েছিল পূর্ণতা। বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে শায়িত এই বীরের ছায়া দীর্ঘ হয়ে ছড়িয়ে আছে আমাদের দেশে। যে দেশের মুক্তির জন্য তিনি প্রাণ বিসর্জন দেয়ার ঝুঁকি নিতেও দ্বিধা করেননি। আমরা কি এই ইতিহাসটুকুও পরবর্তী প্রজন্মকে জানিয়ে যাব না?
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন “মরণ সাগর পাড়ে তোমরা অমর”, প্রশান্ত সাগর পাড়ে শায়িত বীরপ্রতীক ওডারল্যান্ড তুমিও অমর। আমরা তোমাকে ভুলব না। গতকাল ছিল তার মৃত্যুদিন। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে তাকে আমরা স্মরণ করব। করতেই হবে। এটা দায় দায়িত্ব এবং ভালোবাসাও বটে।
সিডনি