সলিলসমাধি :দায় কাহারও কম নহে
প্রকাশ : ২০ মে ২০১৪, ২২:২১
কত রূপেই না মৃত্যু হানা দেয় এই জনপদে! বড়ো দুঃখেই বাঙালি কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য একদা লিখিয়াছিলেন, ‘এখানে মৃত্যু হানা দেয় বারবার/লোকচক্ষুর আড়ালে এখানে জমেছে অন্ধকার’। কিশোর কবি সুকান্ত তেতাল্লিশের মন্বন্তরে মৃত্যুর যে ভয়াবহ রূপটি প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন, কয়েক দশকের ব্যবধানে তাহা আমূল বদলাইয়া গিয়াছে বলিলে অত্যুক্তি হইবে বলিয়া মনে হয় না। এখন অনাহারে মৃত্যু নাই বলিলেই চলে। কিন্তু যেই ধরনের মৃত্যুর কথা তিনি হয়তো কল্পনাও করেন নাই, এখন অহরহই তেমনি সব মর্মস্পর্শী মৃত্যুর ঘটনা ঘটিতেছে। এমন মূল্যবান যেই জীবন কারণে-অকারণে তাহা ঝরিয়া পড়িতেছে। চারিপাশে ইহার উদাহরণ এতো বেশি যে, তথ্যপ্রমাণ হাজির করিবার প্রয়োজন পড়ে না। ইহা কি ভাবা যায় যে, যেই দেশটির চতুর্দিকেই পানি—হাওর-বাঁওড়, খালবিল, পুকুর-দীঘি, নদ-নদী ও সমুদ্রবেষ্টিত যেই জনপদে বংশানুক্রমিকভাবে আমাদের বসবাস—সেই দেশের সেই জনপদের মানুষ প্রায়শ পানিতে ডুবিয়া মারা যাইবে? না, একজন-দুইজন নয়—শত শত মৃত্যু ঘটিতেছে এইভাবে। তন্মধ্যে আবার শিশু-কিশোর-তরুণের সংখ্যাই অধিক। একদা বিদেশিরা রসিকতা করিয়া বলিত যে, এই দেশের শিশুরা হাঁটিতে শিখিবার আগেই সাঁতার শিখিয়া ফেলে। সেই দেশে এমন করুণ মৃত্যু কেন প্রত্যক্ষ করিতে হইবে আমাদের? কেনই-বা দেশের স্বনামধন্য সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে অধ্যয়নরত মা-বাবার একমাত্র মেধাবী সন্তানটিকে অকালে মৃত্যুবরণ করিতে হইবে? এই ক্ষতি শুধু কি পরিবারের?
ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা লঞ্চ ডুবিয়া প্রতিনিয়ত যেইসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটিতেছে তাহাও সলিলসমাধি বৈকি। সেই পরিসংখ্যান যোগ করিলে উদ্বেগের মাত্রা নিশ্চিতভাবে বহুগুণ বৃদ্ধি পাইবে। তবে সেইটি ভিন্ন প্রসঙ্গ। আমাদের উদ্বেগ অন্যত্র। মাত্র কিছুদিন আগে সেন্ট মার্টিনে বেড়াইতে গিয়া রাজধানীর একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রের মর্মান্তিক মৃত্যু হইয়াছে। সেই ক্ষত শুকাইবার আগেই গত রবিবার বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে নানার বাড়ি বেড়াইতে আসিয়া বাঙ্গালী নদীতে ডুবিয়া প্রাণ হারাইয়াছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও ঢাকা কলেজের দুইজন ছাত্র। দেশের নানা স্থানে এমন ঘটনা হরহামেশাই ঘটিতেছে। লক্ষ্য করিলে দেখা যাইবে যে, বেশির ভাগ দুর্ঘটনার চরিত্রও প্রায় অভিন্ন। রাজধানী ঢাকা কিংবা অন্যান্য বড়ো শহরে বাড়িয়া উঠা শিশু-কিশোর-তরুণেরা ছুটিতে বেড়াইতে গিয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হইতেছে। ইহার মূল কারণ যে সাঁতার না জানা তাহা লইয়া দ্বিমত নাই। তবে অন্য কারণটিও কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নহে। তাহা হইল—অসচেতনতা। অপ্রিয় হইলেও সত্য যে, ইহার দায় সরকার, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অভিভাবক—কেহই এড়াইতে পারিবেন না। কারণ ইহা সুবিদিত যে, রাজধানীসহ অধিকাংশ শহর-নগরেই সাঁতার শিক্ষার যেইটুকু সুযোগ-সুবিধা রহিয়াছে—তাহা প্রয়োজনের তুলনায় অতি অপ্রতুল শুধু নহে, অত্যন্ত ব্যয়বহুলও বটে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় সাঁতার শেখাটা যে সকলের জন্যই অপরিহার্য—তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু সেই ব্যবস্থা তো আর কবুতরের খোপের মতো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ফ্ল্যাটবন্দী নগরবাসীর পক্ষে করা সম্ভব নহে। সেই সামর্থ্যও অধিকাংশেরই নাই। সঙ্গত কারণেই দায়িত্বটি বর্তায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের উপর। কিন্তু সেই দায়িত্ববোধ খুব একটা দৃশ্যমান নহে। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্যটি হইল—সাঁতার-না-জানা চঞ্চলস্বভাবের শিশু-কিশোর-তরুণদের প্রতি নজর রাখা এবং সতর্ক ও সচেতন করা—যেন ভ্রমণকালে তাহারা পুকুরে, নদীতে বা সমুদ্রে না নামে। এই দায়িত্বটি প্রধানত পরিবারের হইলেও এই ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরও কিছু দায়িত্ব রহিয়াছে বৈকি। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে জাতীয়ভিত্তিক প্রচারণাও এই ধরনের অকাল ও দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু রোধে যে কার্যকর ভূমিকা রাখিতে পারে—তাহাও নিঃসন্দেহে বলা যায়। আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট সকলেই এই ব্যাপারে মনোযোগী হইবেন।