স্বচ্ছ কর ব্যবস্থা এবং করের আওতা

বিলাসবহুল একটি বাসের টিকেট কিনে লক্ষ করলাম কোনো সিরিয়াল নম্বর নেই। এই বাসগুলোতে দিনে কতজন যাত্রী ভ্রমণ করেন, তাঁদের কাছ থেকে কত টাকা ভাড়া আদায় করা হয়, টিকেট ছাড়া তার সঠিক হিসেব রাখা সম্ভব নয়। তাহলে মালিকদের কর হিসেব করা হয় কীভাবে! যদি যাত্রী প্রতি কর না থাকে তাহলে কি এটি থোক বা নির্ধারিত পরিমাণ ধরা হয়? যদি তাই হয় সে ক্ষেত্রে বাস মালিক বা সরকার উভয়ই লোকসানের ঝুঁকি বহন করে। প্রত্যেক যাত্রীর টিকেট যদি বাধ্যতামূলক করা হয় তাহলে কর ফাঁকি দেওয়া বা বেশি দেবার কোনো ঝুঁকি থাকবে না। বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের ব্যক্তিগত যানবাহন মোটর সাইকেল। কিন্তু ২০% মোটর সাইকেল নিবন্ধন আছে বলে আমার মনে হয় না। এর কারণ গ্রামের এক কৃষক যত সহজে একটি মোটর সাইকেল কিনতে পারেন অফিসিয়াল জটিলতায় তত সহজে নিবন্ধন করতে পারেন না। আর পুলিশ ধরলে সহজেই কিছু টাকা দিয়ে পার পাওয়া যায়। কিন্তু এই নিবন্ধন ফি কমিয়ে যদি বিক্রি মূল্যের সঙ্গে যোগ করা হয় এবং বিক্রেতাকে বাধ্যতামূলক নিবন্ধন করে নম্বর প্লেট সরবরাহ করার দায়িত্ব দিয়ে নিয়ম তৈরি করা হয়, তাহলে একটি মোটর সাইকেল বা মোটর গাড়িও নিবন্ধনবিহীন থাকবে না। এই খাত থেকেই সরকারের এক বিশাল রাজস্ব আয় হবে। সেইসঙ্গে মোটর সাইকেলটিও বৈধতা পাবে। শহরের খুব কম দোকানেই বিক্রির রশিদ ব্যবহার করা হয়। রশিদ থাকলেও সিরিয়াল নম্বরসহ অনুমোদিত রশিদ আছে এমন দোকান খুঁজে পাওয়া কঠিন। আবার রশিদ ঠিক থাকলেও ব্যবহার নেই। ক্রেতাদেরও রশিদের ব্যাপারে মাথাব্যথা নেই। রশিদ অনুমোদনের ব্যবস্থা না থাকায় বা জটিলতায় অধিকাংশ ব্যবসায়ী খুব সহজেই কর ফাঁকি দিতে পারেন। সকল শ্রেণির স্থায়ী ব্যবসায়ীকে ব্যবসা নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করতে হবে। সেই নিবন্ধিত ব্যবসার রশিদ হতে হবে আয়কর অফিস থেকে অনুমোদিত। ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে ক্রেতাকে রশিদ গ্রহণের ব্যাপারে সচেতন করে তুলতে হবে। বর্তমানে একটি নির্দিষ্ট আয়সীমার কর্মচারী-কর্মকর্তাকেই শুধু আয়কর দিতে হয়। কিন্তু আমার মতে, স্থায়ী বেতন কাঠামোতে নিয়োগ পাওয়া সবাইকেই করের আওতায় আনা উচিত। সেটার সর্বনিম্ন পরিমাণ এক টাকাও হতে পারে। তবে করের পরিমাণ অবশ্যই সহনীয় মাত্রায় হতে হবে। আদায়ে স্বচ্ছতা থাকতে হবে। এ জাতীয় কর মাসিক বেতন থেকে বাধ্যতামূলক কেটে রেখে সংশ্লিষ্ট অফিসকেই কর জমা দিতে হবে। ব্যাংকে মাসিক সঞ্চয়ী আমানত/ হিসাবকে করমুক্ত রেখে, একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ দীর্ঘমেয়াদি মুনাফা জামানতকে নামমাত্র করের আওতায় রেখে সাধারণ আয়ের জনগণকে সঞ্চয়ী মানসিকতায় পুঁজি গড়ার সুযোগ দিতে হবে। বিদ্যুত্ ও পানির মতো গ্যাসেরও মিটার চালু করে তা বাধ্যতামূলক করতে হবে। গ্যাসের মূল্য পুনঃনির্ধারণ করতে হবে। গ্যাসের সিলিন্ডার ব্যবহারকারী এবং পাইপলাইনে গ্যাস ব্যবহারকারীদের মধ্যে গ্যাসের জন্য খরচের পার্থক্য কমিয়ে আনতে হবে। সর্বোপরি কর আদায়ের ব্যবস্থা হতে হবে অত্যন্ত সহজ। আদায়কারীদের হতে হবে আধুনিক স্মার্ট এবং মিষ্টভাষী। করের অর্থ ব্যবহারের ব্যাপারে সরকারের জবাবদিহিতা থাকতে হবে শতভাগ। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাতেও করের আয় ব্যয় স্পষ্টভাবে জনগণকে জানাতে হবে। কর যে রাষ্ট্রের চালিকা শক্তি এবং জনগণ যে সকল রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে তার সিংহভাগের ব্যয়ভার বহন করা হয়ে থাকে কর থেকে, নাগরিকের কর সঠিকভাবে প্রদান এবং এই করের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমেই যে দেশের উন্নয়ন সম্ভব সেটা প্রতিটি নাগরিককে ছোটবেলা থেকে শেখানোর জন্য পাঠ্যবিষয়ে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ফিলিপাইন