ন্যায়ের দণ্ড যদি সমুন্নত না হয়

আজ দেশ জুড়ে যে তাণ্ডবতা চলছে তাকে সুশাসন বলা চলে কি? চলে না। লোভাতুর মনোবৃত্তি এতটাই বিস্তার লাভ করেছে যে খুন-গুম-লুটপাট-ধর্ষণ কোনো কিছুই আজ আর অন্যায় বলে মনে হচ্ছে না দুর্বৃত্তদের কাছে। আর এসবই সম্ভব হচ্ছে ন্যায়দণ্ডটি সঠিক সময় সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে না বলেই। প্রতিটি মানুষেরই অন্তরলোকে ষড়রিপুর লোভাতুর হাতছানি ঘাপটি মেরে থাকে, থাকে সুযোগের অপেক্ষায়, থাকে স্বীয় আধারকে আলোড়িত করার কু-প্রচেষ্টায়। এরা প্রখর সূর্যালোক সহ্য করতে পারে না, মেনে নিতেও পারে না, ঝলসে যায়, চুপসে যায়। কিন্তু যখন দেখে প্রতিকারহীন শক্তির অপরাধে, বিচারের বাণী নিরবে নিভৃতে কাঁদে, তখনই ওরা বিকৃত উল্লাসে, ফেটে পড়ে, নির্বিঘ্নে কুকর্ম চালাতে উদ্বুদ্ধ করে কুকর্মের হোতাদের। আবার যখনই কোনো দেশ, জাতি, গোষ্ঠী বা পরিবারে ন্যায়ের ধ্বজাটি সমুন্নত হয়ে ওঠে, ষড়রিপু পালাবার পথ পায় না, হাঁসফাঁস করতে থাকে, শেষমেষ বিলুপ্তিই হয় তাদের বিধিলিপি। যেন বিষধর সাপের মাথায় পড়ে একমুঠো ধুলো। তবে এজন্য সত্য ও ন্যায়ের সমন্বিত ঐক্য অপরিহার্য, লোভ-লালসা, ব্যক্তিস্বার্থ বিসর্জন দিয়ে আত্মশুদ্ধি করা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। একজন নিঃস্বার্থ ব্যক্তির পক্ষেই জননেতা হওয়া সম্ভব, সম্ভব একজন দক্ষ প্রশাসক হওয়াও। জনগণ তাদেরই সমীহ করে, আবার অন্তর দিয়ে ভালও বাসে। সৌভাগ্য বাঙালি জাতির, তারা এমন নেতাই পেয়েছিল একান্ত আপন করে, যখন পশ্চিম পাকিস্তানিদের অপশাসনে নিরীহ, নিরপরাধ বাঙালি পদে পদে হচ্ছিল প্রতারিত, নিগৃহীত ও নির্যাতিত, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আপামর বাঙালির প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসাই তাকে তাদের মনের মণিকোঠায় চিরস্থায়ী আসনে বসিয়েছিল। তিনি প্রতারিত করেননি তাদের, পশ্চিমা অপশাসনের জুলুম-অত্যাচার-নির্যাতন, নিঃসঙ্গ কারাবাস সব সহ্য করেছেন শুধুমাত্র একটিই লক্ষ্যে, আর তা হল বাঙালির স্বতন্ত্র ও স্বাধীন আবাসন, যেখানে অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনাবিল সুখস্রোত থাকবে চির বহমান। তার উদাত্ত আহবানে সর্বস্তরের বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ৭১-এর সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে, ছিনিয়ে এনেছিল প্রাণপ্রিয় স্বাধীনতা, এমনি এমনি আসেনি সেই কাঙ্ক্ষিত মুক্তি, এজন্য ঝরাতে হয়েছে অনেক রক্ত, বিসর্জন দিতে হয়েছে অনেক মা-বোনের পবিত্র সম্ভ্রম। তাই কষ্টে পাওয়া সেই স্বাধীনতা মহামূল্যবান ছিল বাঙালির জীবনে। ৭১-এর আগে বা পরে যেসব দেশ স্বাধীন হয়েছিল, যেমন মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, তারা আজ কেউ-ই পিছিয়ে পড়ে নেই, অর্থনৈতিক, সামাজিক এমনকি রাজনৈতিক দিক দিয়েও তারা দিন দিন সমৃদ্ধ হয়ে এগিয়ে যাচ্ছে কেবলমাত্র সুশাসনের অনুশীলন দ্বারা। সততা ও ন্যায়-নিষ্ঠার অটল ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ মহাথেরো আধুনিক মালয়েশিয়ার সফল রূপকার। আমরাও গর্বিত ছিলাম, আশান্বিতও হয়েছিলাম তেমনই কারিশমা দেখবো বলে, কিন্তু কতিপয় উচ্চাভিলাষী লোভাতুর মানুষের চক্রান্তে তিনি দেশ স্বাধীন হবার মাত্র সাড়ে তিন বছরেই সপরিবারে নৃশংসভাবে নিহত হলেন, সাথে সাথে স্বাধীনতার লক্ষ্যও দিকভ্রষ্ট হল। গুপ্ত ঘাতকের মত লুকিয়ে থাকা সামপ্রদায়িক অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠল, সুকৌশলে ধর্মভীরু বাঙালিদের মগজ ধোলাই শুরু করল, যার ভয়াবহতা এখন আমরা সর্বত্র দেখতে পাচ্ছি, হাতে হাত, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে যে জাতি, আজ তারা একে অপরকে চোখের বালি ভেবে তাড়াতে চাচ্ছে দেশ থেকে, এমনকি পৃথিবী থেকেও। এর চেয়ে নষ্টামি, ভণ্ডামী আর কি হতে পারে? তাই আজ সংখ্যালঘু সমপ্রদায় কোণঠাসা হয়ে পড়ছে, থাকছে সদা-সর্বদা আতংকে কম্পমান, পশ্চিমা হানাদারদের কুশ্রী অপচ্ছায়া দেখছে কখনও কখনও বাঙালিদেরই অবয়বে! বর্তমানে দেশে দু-ধরনের সহিংসতা বেগবান, এক- সামপ্রদায়িক অত্যাচার, প্রকাশ্যে অথবা আড়ালে, দুই- স্ব স্ব অবস্থানে থেকে বিকারহীনভাবে সম্পদ আত্মসাতের তীব্র প্রতিযোগিতা। এ ঘোর তমসা থেকে মুক্ত হতে না পারলে সোনার বাংলা স্বপ্নেই থেকে যাবে অধরা। দেশময় বিকৃত উল্লাসে নৃত্য করবে তারাই, যারা ন্যায়ের দণ্ডের ভগ্নদশার সুযোগের সুবিধা ভোগ করছে ষোলআনা। লেখক :প্রভাষক, প্রাণিবিদ্যা, বাউফল কলেজ, বাউফল,পটুয়াখালী shikha231960@yahoo.com