থাইল্যান্ডে সামরিক শাসন

সামরিক আইন জারির দুইদিন পর গতকাল বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ডের সেনাপ্রধান প্রায়ুথ চান ওচা এই মর্মে ঘোষণা দিয়াছেন যে, সেনাবাহিনী সরকারের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করিয়াছে। গত মঙ্গলবার সেনাবাহিনী রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণহানি রোধ এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দেশে মার্শাল ল জারি করিলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কী গতি হইবে, সেই সম্পর্কে কোনো উচ্চবাচ্য করে নাই। পক্ষান্তরে অন্তবর্তীকালীন সরকারের পক্ষ হইতে বলা হইয়াছিল যে, তাহারা যদিও সামরিক আইন জারির বিষয়ে কিছুই জানেন না, তাহা সত্ত্বেও সিদ্বান্তটি সঠিক হইয়াছে বলিয়াই সরকার মনে করে। অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী এমনও আশাবাদ ব্যক্ত করিয়াছিলেন যে, সেনাবাহিনী যাহা কিছুই করুক না কেন, সংবিধানের মধ্যে থাকিয়াই করিবে। কিন্তু সে আশা নিরাশায় পরিণত হইতে সময় লাগে নাই। সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করিয়া নিয়াছে। থাইল্যান্ডের মানুষের নিকট সামরিক শাসন কোনো নূতন অভিজ্ঞতা না হইলেও ইহা যে কোনো সাংবিধানিক ব্যবস্থা নহে তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। থাইল্যান্ড এমন একটি দেশ যেখানে রহিয়াছে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র। দেশটি কখনই কোনো বিদেশী শক্তির উপনিবেশ ছিল না, যদিও এশিয়ার বেশিরভাগ দেশেই ঔপনিবেশিক শাসন জারি ছিল। এইখানে সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক স্বয়ং রাজা। ১৯৩২ সাল হইতে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত দেশটিতে সামরিক শাসন বহাল ছিল। নানান চড়াই-উত্রাইয়ের মধ্য দিয়া ১৯৯৭ সালে থাইল্যান্ডে একটি গণতন্ত্রসম্মত শাসনতন্ত্র প্রণীত হয়। সেই সংবিধানের অধীনে ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে থাকসিন সিনাওয়াত্রার নেতৃত্বাধীন পার্টি বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। পরবর্তী মেয়াদেও এই পার্টির জয়ের ধারা অব্যাহত থাকে। ২০০৬ সালে থাকসিন সরকারকে উত্খাত করিয়া ব্যাংককে প্রতিষ্ঠিত হয় সেনা সমর্থিত বেসামরিক সরকার। টেলি কমিউনিকেশন দুর্নীতির অভিযোগ আনিয়া ক্ষমতাচ্যুত থাকসিনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয় এবং দণ্ড প্রদান করা হয়। তাহার আগে সিনাওয়াত্রা দেশ ত্যাগ করেন। ২০১০ সালে গণ-আন্দোলনের মুখে পতন ঘটে সেনা সমর্থিত সরকারের। পরের বত্সর সাধারণ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় লাভ করে থাকসিন সিনাওয়াত্রার বোন ইংলাকের নেতৃত্বাধীন পুয়ে থাই পার্টি। ইংলাক বৃত হন প্রধানমন্ত্রী পদে। গত বত্সর অক্টোবরে পার্লামেন্টে দায়মুক্তি বিল পাস করায় ইংলাক সরকারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে বিরোধীরা। সেই সময়ে পার্লামেন্টে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করা হইলে ক্ষমতাসীন পুয়ে থাই পার্টি (পিটিপি) জিতিয়া যায়। অতঃপর থাইল্যান্ডের উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যুক্ত হয় নূতন মাত্রা। পার্লামেন্টের নিন্মকক্ষে শতাধিক ভোটের ব্যবধানে ইংলাক সরকারের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাব নাকচ হইয়া যায়। তাহা সত্ত্বেও নির্বাচিত সরকারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধী ডেমোক্র্যাটিক পার্টি আন্দোলন অব্যাহত রাখে। এই পরিস্থিতিতে ইংলাক সরকার গত ফেব্রুয়ারিতে মধ্যবর্তী নির্বাচন দেয় এবং পুনরায় সরকার গঠন করে। আন্দোলনও থাকে অব্যাহত। গত ৭ মে সাংবিধানিক আদালতের রায়ে ইংলাক সিনাওয়াত্রা প্রধানমন্ত্রী পদ হইতে অপসারিত হন। পরে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সেনা বাহিনী ক্ষমতা গ্রহণ করায় সেই সরকারেরও অবসান ঘটিল। এখন দেখিবার বিষয় থাইল্যান্ডের সামরিক সরকার কত শীঘ্র নূতন কোনো নির্বাচিত সরকারের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সেনাপ্রধান ইতিপূর্বে আভাস দিয়াছিলেন যে, আগামী আগস্টে সাধারণ নির্বাচন দেওয়া হইবে। বিশ্ব সমাজও আশা করে, গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনে থাই সেনা বাহিনী বিলম্ব করিবে না।