বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান কোন্ পর্যায়ে

সরকারি হাসপাতালে চিকিত্সা সেবায় বেশির ভাগ চিকিত্সকদের অনিয়মিত কর্মস্থলে অবস্থান ও অব্যবস্থাপনার সুযোগ নিয়ে বেসরকারি ক্লিনিকগুলো তাদের রমরমা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ চিকিত্সার জন্য টাকা ঢালে অথচ ভাল মানের চিকিত্সা সেবা পায় না। লক্ষাধিক অবৈধ ক্লিনিক, হাসপাতালের বিপরীতে সরকারি হাসপাতাল রয়েছে কয়েকশ’? এসব হাসপাতাল বা ক্লিনিককে ঘিরে স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিত্সার কাজ চলে? সরকারি হাসপাতালের বেশিরভাগ চিকিত্সকদের রোগীর প্রতি অবহেলার খবর কে না জানে। দ্রুত গজিয়ে ওঠা বেসরকারি খাতে স্বাস্থ্যসেবার মানই বা কোন্ পর্যায়ে। অধিকাংশ বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতালগুলোতে নির্দিষ্ট চিকিত্সক থাকে না? গোঁজামিল দিয়ে চিকিত্সা কাজ চালিয়ে নেয় কর্তৃপক্ষ? কখনও নিজেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নেন? ডাক্তারের সঙ্গে ফোনে পরামর্শ করে নেন? সব ক্লিনিকে তেমন রোগী আসে না তাই তারা ডাক্তার রাখেন না, খরচ পোষায় না? তবে রোগী এলে প্রয়োজন মনে করলে ডাক্তারকে খবর দেন? অনেক ক্লিনিকে কোন ডাক্তার নেই, প্যাথলজিষ্ট নেই? কম্পিউটার অপারেটর নিজেই রক্তসহ সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন? আর চিকিত্সকের পূর্বের সই করা কাগজে পরীক্ষার ফল বসিয়ে দেন? বেশিরভাগ ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার কোনো অনুমোদন না নিয়ে চালু করা হয়? অনেকে বলেন, তারা অনুমোদনের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আবেদন করেছেন? আশা করছেন অনুমোদন পাবেন? এইসব ক্লিনিকের কোনো অনুমোদন না থাকলেও তারা ব্যবসা করছেন বছরের পর বছর। অনেক প্রতিষ্ঠানের কোনো বৈধ অনুমতি নেই? আর যাদের আছে তাদের অনেকেরই প্রয়োজনীয় চিকিত্সক, নার্স, চিকিত্সা উপকরণ নেই? কোনো কোনো এলাকায় সরকারি স্বাস্থ্যসেবা বলতে ২০-৫০ বেডের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স? অবস্থার যথেষ্ট উন্নতি হলেও সবখানে ঠিকমতো চিকিত্সা পাওয়া যায় না? তাই এলাকার বিপুল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার চাহিদার সুযোগ নেয় অসাধু ক্লিনিক ব্যবসায়ীরা? অনেক ক্লিনিকে ভুয়া ডাক্তার আছে? যাদের এমবিবিএস ডিগ্রি নেই অথচ প্রচারপত্রে লেখেন? আবার বৈধ ভেবেই এমবিবিএস ডাক্তাররা এফসিপিএস(ফার্স্ট পার্ট) আর পিজিটির মতো হরেক রকম শব্দের ব্যবহার যে হরহামেশা করছেন সাইনবোর্ড আর প্রেসক্রিপশান প্যাডে, যা সাদা চোখে দুর্নীতি বলে মনে হয় না। দেশ জুড়ে এই অবস্থা হঠাত্ করে হয়নি? কিছু অবৈধ ক্লিনিক এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নামে মাত্র নেয়া হয়? এই ধরনের ক্লিনিকে ভুয়া ডাক্তার দিয়ে জটিল অস্ত্রোপচারও করা হয় যা রোগীকে মৃত্যু ঝুঁকিতে ফেলে দেয়? শোনা যায় এ ধরনের ক্লিনিকে ভুল চিকিত্সা এবং ভুল রোগ নির্ণয় হয়? টেকনিশিয়ান যখন ডাক্তার হয়ে যান তখন কী ভয়ানক পরিণতি হয় সেটা আমরা পত্র-পত্রিকা থেকে অহরহ জানতে পাই। অবশ্য পত্র-পত্রিকা থেকে না জানলেও চলে। মানুষের নিজেদের জীবনের ভোগান্তির এ অভিজ্ঞতা তো কম নয়।পুরো স্বাস্থ্য সেবার মানকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে অসাধুরা। লাইসেন্স দেয়ার আগে যখন সংশ্লিষ্ট টিম পরিদর্শনে যায় তখন নাকি ভাড়া করে চিকিত্সক আনা হয়? এমনকি প্যাথলজিস্ট, টেকনিশিয়ান এবং যন্ত্রপাতিও আনা হয় ভাড়ায়? পরিদর্শন টিমের সদস্যরা অবৈধ ক্লিনিক মালিকদের প্রতারণার ধরন বুঝতে পারেন না? তবে কী ক্লিনিক মালিক লাইসেন্স পেতে সরকারের প্রচলিত ফি’র বাইরে বাড়তি মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করেন! বিনা লাইসেন্সেও অবৈধ ক্লিনিক ব্যবসা চলে এসব তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানেন না, একথা কেউ বিশ্বাস করবে না। দেশে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা বাড়লেও রোগীরা পায় না সঠিক স্বাস্থ্যসেবা। বেসরকারি খাতের অনুপম চিকিত্সা সেবার নামে চলে বাণিজ্য। আমরা জানতে পারি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের একশ্রেণির কর্মকর্তা, চিকিত্সক নেতা, বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক ও কর্পোরেট ব্যবসায়ী এসব চিকিত্সা প্রতিষ্ঠানের মালিক। এসকল প্রভাবশালীদের কারণে এসব হাসপাতালের তদারকি কোন্ পদ্ধতি বা কোন্ উপায়ে হয় সে সব নিয়েও নাকি এন্তার প্রশ্ন রয়েছে। প্রভাবশালীদের কারণে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা আইন আলোর মুখ দেখে না। এসব হাসপাতাল নিয়ম মেনে চলে কি-না তা তদারকিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোনো কর্মসূচি আছে কি নেই তা আমরা জানতে পারি না। আবাসিক বাড়িতে ঘর ভাড়া নিয়ে শুরু করা হয় ঘুপচি চিকিত্সা কেন্দ্রের কাজ। রকমারি সাইনবোর্ডে বিভিন্ন চিকিত্সকের নাম উল্লেখ থাকলেও এদের অধিকাংশ উপস্থিত থাকেন না। এদিকে অনেক সরকারি হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও চিকিত্সকেরা উপস্থিত থাকেন না। তারা সময় দিয়ে থাকেন স্থানীয় কোনো ক্লিনিকে। চিকিত্সকেরা নিজেদের স্বার্থে হাসপাতালের আধুনিক পরিবেশ ছেড়ে স্থানীয় এমন ক্লিনিকেও যান যেখানে হারিকেনের আলোয় অস্ত্রোপচার করা হয়। আবার সরকারি চাকুরে যে সকল স্বাস্থ্য সহকারী ক্লিনিক মালিক বনে গেছেন তারা তাদের সরকারি কর্মস্থলে প্রায়ই উপস্থিত থাকেন না। কর্মস্থলে এলেও এক থেকে দেড় ঘণ্টার বেশি সময় দেন না। তারা বিভিন্ন ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। কোনো আইন-কানুনের তোয়াক্কা তারা করেন না। বছরের পর বছর তারা আইনের প্রতি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলেন। লেখক : কলামিস্ট Email : hasibhaque69@yahoo.com