স্মরণ
এক বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শুদ্ধাচারী শিক্ষকের কথা
প্রকাশ : ২২ মে ২০১৪, ২২:১৩
প্রতিথযশা শিক্ষাবিদ, অমিততেজ মুক্তিযোদ্ধা এম,এ মামুন তাঁর জীবদ্দশাতেই কিংবদন্তির নায়ক হয়ে পড়েন। একই ব্যক্তির মধ্যে এতোগুলো বিরল গুণের সমাহার তাঁকে সমসাময়িক কালের একজন প্রডিজি (Prodigy) বা দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করার মতো ব্যক্তিত্ব করে তোলে। তাঁর দেশকালোচিত নীতি অগণিত অমনোযোগী ও বখাটে ছাত্রকে জীবনে প্রতিষ্ঠা এনে দেয়। চট্টগ্রামের মছজিদ্দা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে এম,এ, মামুনের উদ্ভাবিত শিক্ষা প্রদান প্রক্রিয়া উল্লেখিত ধরনের শিক্ষার্থীদের চারিত্রিক অস্বাভাবিকায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে প্যানাসীয়া (Panacea) বা সর্বরোগ নিয়ামকের ওষুধ হিসেবে কাজ করে। এটা একটা বিস্ময়কর সাফল্য।
চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ২৩ কিলোমিটার উত্তরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পশ্চিম পাশে মছজিদ্দা উচ্চ বিদ্যালয়ের অবস্থান। এই গ্রামটির একদিকে ঊর্মিমুখর সাগর, অপরদিকে প্রাণকাড়া সবুজে ঘেরা সুউচ্চ পাহাড়। বেশ কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল আগে থেকে। কিন্তু শিক্ষা লাভের তেমন কোন সুযোগ ছিলো না। বিশেষ করে শিক্ষা ক্ষেত্রে অনগ্রসর ওখানকার মছজিদ্দা নামক স্থানে একজন মেধাবী ও করিতকর্মা শিক্ষকের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে মছজিদ্দা আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়। উক্ত নন্দিত ও বিরল বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হচ্ছেন ঘোড়ামরা গ্রামের বাসিন্দা আলহাজ্ব আবদুল্লাহ্ হিল মামুন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত এই স্কুলের প্রতি দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় সারা দেশের। এই স্কুলটিকে কেন্দ্র করে কিংবদন্তী হয়ে ওঠেন একজন হার্ড-বিটন (Hard bitten) শিক্ষক। তিনি এম এ মামুন। ১৯৫৭ সাল থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত সে স্কুলের প্রধান শিক্ষক।
একজন অসামান্য প্রতিভাবান ব্যক্তি, দক্ষ শিক্ষা সংগঠক ও গুণী শিক্ষক হিসেবে উক্ত সময়কালে এম,এ, মামুন প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, স্কুলের নামের আগে উচ্চারিত হতে থাকে এম এ মামুনের নাম। অন্যভাবে বলা যায়, মছজিদ্দা স্কুল ও প্রধান শিক্ষক এম,এ, মামুন সমার্থক হয়ে ওঠেন।
প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে কোনো ছাত্র বিপথগামী হওয়ার সুযোগ পেতো না। এম এ মামুনের সংশোধনমূলক পদ্ধতি চালু করার কারণে অনেক বখে যাওয়া ছেলে পরীক্ষায় ভালো ফল করে এবং কেউ কেউ জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।
এম এ মামুন শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন আলোকিত মানুষ তৈরির প্রত্যাশায়। তিনি নিজে আলোকিত মানুষ বলে পেশা ও নেশাকে সিমেট্রিক্যাল বা সুসামঞ্জস্য করা সম্ভব হয়। নইলে ইচ্ছে করলে পেশা পরিবর্তন করে আর্থিক দিক দিয়ে সচ্ছল জীবনে পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ তিনি বেশ কয়েকবার পান। কিন্তু মানুষ গড়ার নেশায় আচ্ছন্ন এম,এ, মামুন নিজের ভাগ্যোন্নয়নের পথে কখনো পা বাড়াননি। সে যাই হোক, এম,এ, মামুন ও মছজিদ্দা স্কুলের সুনাম সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তাতে করে অনেক দূরবর্তী এলাকা থেকে পিতা-মাতা তাদের দুর্বিনীত ছেলেদের মছজিদ্দা স্কুলে এনে তাঁর হাতে তুলে দিতে শুরু করেন।
বাহ্যতঃ কঠিন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লোক হলেও এম এ মামুন ভেতরে ভেতরে ছিলেন একজন গরিবদরদী মানুষ। নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে তিনি অনেক হতদরিদ্র ছাত্রের পড়ার খরচ যুগিয়েছেন। নিজের ঘরে তাদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। এ ধরনের অনেক উদাহরণ আমাদের জানা আছে। তাঁর সর্বাত্মক সহযোগিতা না পেলে আমার মতো অনেকেরই সমাজে সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছানো কোনভাবেই সম্ভবপর ছিল না। ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত ধর্মনিষ্ঠ হলেও তিনি কখনো ধর্মান্ধ বা সামপ্রদায়িক মন মানসিকতার লোক ছিলেন না। মুক্তিযুদ্ধের সময় হরিণা ক্যাম্পে অবস্থানকালে প্রাক্তন মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন তাঁর নামাজ পড়ার সমুদয় ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। এজন্য তিনি ছিলেন তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। আমরা যাতে তাঁর নামাজে জানাজায় ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে তাঁর কতৃজ্ঞতার কথা জানিয়ে দিই, এটা ছিলো আলোকিত মানুষ এম এ মামুনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। এম এ মামুনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মান অর্থাত্ অ্যাকাডেমিক ক্যারিয়ার খুবই দীপ্তিমান বা ব্রিলিয়্যান্ট। তিনি বিটি পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। দেশ ও জাতির বৃহত্তর কল্যাণে রাজনীতির সাথে জড়িত হয়ে পড়লেও শিক্ষকতা ও রাজনীতিকে তিনি কখনো গুলিয়ে ফেলেননি। খুব কম লোকের পক্ষেই এমনটা করা সম্ভব হয়ে থাকে। রাজনীতিক এম এ মামুন, শিক্ষক এম এ মামুনকে একটি মুহূর্তের জন্যও পেছনে ফেলতে পারেননি।
৩রা মে, ২০১৩ মহান শিক্ষক এম,এ, মামুনের তিরোধান আমাদের কাছে এক অপূরণীয় ক্ষতি। মছজিদ্দা হাইস্কুলের সামনে দিয়ে চলাচলের সময় পরিচিত যে কোনো লোকের মনের আয়নায় প্রতিবিম্বিত হতে থাকবে শিক্ষাক্ষেত্রে এক কিংবদন্তীর মুখাবয়ব। তিনি এম,এ, মামুন। একজন শুদ্ধাচারী শিক্ষাগুরু যিনি আমৃত্যু তাঁর আদর্শের প্রতি আন্তরিক ও আপসহীন ছিলেন। মহানপ্রভু আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসী করুন।
লেখক :হূদরোগ বিশেষজ্ঞ, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
ইমেইল: dr.rezaul2009@gmail.com