নানা রঙে রঙিন

তিনি যে খেলায় অংশগ্রহণ করেন সেই খেলায় তাকে হারানো খুবই কঠিন। ফলে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রচুর পুরস্কার জমা হয়েছে তার ঝুলিতে। খেলাধুলার পাশাপাশি নাচ, গান ও অভিনয়েও তার দক্ষতা হার মানায় অন্যদের। পড়ছেন দেশসেরা বিদ্যাপিঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে। এই বিভাগে তিনি রয়েছেন তৃতীয় অবস্থানে। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মেয়েটির নাম তানজিনা তানিন নিশি। তাকে নিয়ে লিখছেন আহসান রনি প্রথম শ্রেণী থেকেই খেলাধুলার শুরু তার। স্কুলের প্রতিযোগিতায় ব্যাঙ দৌড়, বিস্কুট দৌড়, পঞ্চাশ-এক শ মিটার দৌড়সহ সব খেলাধুলাতেই থাকত তার সরব অংশগ্রহণ। পুরস্কৃতও হয়েছেন বহুবার। নিশির মা তাকে বলতেন, ‘পুরস্কার পাওয়ার চেয়ে যেকোনো খেলায় অংশগ্রহণটাই বড় কথা।’ তাই পাবনার ওয়াইডব্লিউসিএ নার্সারি স্কুলের ছাত্রী নিশি যখন যে খেলা দেখতেন সেখানেই অংশগ্রহণ করতে চাইতেন। তার এই খেলতে চাওয়া একসময় খেলাধুলার প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা তৈরি করে দেয়। ফলে তার এলাকায় কানামাছি থেকে কুমির ডাঙা; গোল্লাছুট থেকে লাফালাফি সব জায়গাতে তার উপস্থিতি দেখতে পেত সবাই। ধীরে ধীরে বড় হতে থাকলেন, কিন্তু খেলাধুলা ছাড়লেন না। ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বরসহ বিভিন্ন দিবসে তার স্কুলের দলের নেতৃত্ব দিতেন তিনি। নিজেই নিজের খেলাধুলার ইচ্ছাকে কখনও দমাতে দেননি। এর পাশাপাশি বাবা-মায়ের কাছ থেকে সবসময় সমর্থন তো ছিলই। তার আব্বু নিজেও একজন খেলোয়াড় ছিলেন, এখনও সময় পেলে লন টেনিস খেলেন। আর আম্মুও লুডু, দাবা, ক্যারাম খেলায় পারদর্শী। তাই তার পরিবারকে অনেকটা খেলাপাগল পরিবার বলা যেতে পারে। বাবার চাকরির সুবাদে একসময় তিনি ভর্তি হলেন রংপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। স্কুলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতার প্রতিটি বিভাগে তিনি একটা না একটা পুরস্কার পেতেনই। এর পিছনে ছিল তার সাধনা। যেমন, বস্তা দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য তিনি ১ মাস বস্তা নিয়ে দৌড় প্র্যাকটিস করেছেন। স্কুলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় তিনি টানা ৪ বার ৪টি ইভেন্টে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মাধ্যমে সারা স্কুলের মধ্যে প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তিনি জাতীয় স্কুল ও মাদ্রাসা গ্রীষ্মকালীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। ২০০৭ সালে গোলক নিক্ষেপ প্রতিযোগিতায় তৃতীয় পুরস্কার লাভ করেন। রংপুরে ২০০৬ ও ২০০৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় ব্যাডমিন্টন খেলায় তিনি চ্যাম্পিয়ন হন। শুধু খেলাধুলা নয়, পড়াশোনাতেও কম যান না এই তরুণী। ২০০৯ ও ২০১১ সালে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর ২০১২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় ভলিবল দলের হয়ে খেলা শুরু করেন। সেবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় গেমসে ভলিবল খেলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহিলা দলের হয়ে তিনি চ্যাম্পিয়ন হন। এছাড়া হলের ইনডোর, আউটডোর খেলার বহু পুরস্কার জমা হয়েছে তার সেলফে। ২০১৩ সালে ঢাবির আন্তঃহল ক্যারাম, ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন তিনি। সে বছর আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় হ্যান্ডবল খেলায় ঢাবির হয়ে অংশ নিয়ে দ্বিতীয় রানারআপ হন তিনি। বাংলাদেশ গেমসে ঢাবি ভলিবল দলের হয়েও অংশ নেন তিনি। গত বছরের তুলনায় এ বছর তিনি ছিলেন আরও উজ্জ্বল। ইনডোর চারটিতে চ্যাম্পিয়ন, আন্তঃহল ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতায় দ্বৈত বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হন। এ বছর আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ব্যাডমিন্টনে তিনি রানারআপ ট্রফি অর্জন করেন। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ক্যারাম, গান ও অভিনয় প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। পড়াশোনা ও খেলাধুলা একই সাথে সাফল্যের সাথে কীভাবে চালান; এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিভাময়ী এই তরুণী বলেন, ‘পড়াশোনা ও খেলাধুলায় একই সাথে ভালো করা অনেক কষ্টকর। তবে সকলের সাহায্য পাই তাই সেই কষ্ট আর কষ্ট মনে হয় না। আর আগ্রহ থাকলে কোনো কাজ আটকায় না।’ নিশি মনে করেন, ‘একঘেয়ে ও বিরক্তিকর জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য খেলাধুলাসহ বিভিন্ন কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটসে জড়িত হওয়া খুব জরুরি। ভালোলাগার কাজগুলো করতে পারলে জীবনে আনন্দের অভাব হয় না।’