এরা উড়তে পারে না

পাখি আমাদের কমবেশি সবারই খুব প্রিয়, আমরা ভালোবাসি এদের আকাশে উড়ে চলা দেখতে, বেশি ভালো লাগে যখন এরা ঝাঁক বেঁধে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যায়। তবে এদের মধ্যে থেকে বেশ কিছু এমন প্রাণী আছে যারা নামে পাখি হলেও উড়তে পারে না। এদের সংখ্যাও কিন্তু নেহায়তই কম নয়। এই উড়তে না পারা পাখিদের কথা লিখেছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র এখন পর্যন্ত পৃথিবীর বুকে যত পাখি টিকে আছে তাদের মধ্যে প্রায় চল্লিশ প্রজাতির পাখি আছে যারা উড়তে পারে না। নাম করতে গেলে এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিচিত পাখিগুলো হলো—উটপাখি, কিউই, পেঙ্গুইন, ইমু, মুরগি ইত্যাদি। উড়তে পারে না বলেই ইংরেজিতে এদের বলে ফ্লাইটলেস বার্ড। যেসব পাখিরা উড়তে পারে না এবং যারা পারে তাদের মধ্যে দুটি মৌলিক পার্থক্য আছে—প্রথমত, উড়তে অক্ষম পাখিদের ডানার হাড়গুলো অপেক্ষাকৃত ছোট এবং দ্বিতীয়ত, উড়তে সক্ষম পখিদের বুকের ঠিক মাঝের লম্বা হাড়ের উপরটা জাহাজের পাটাতনের মতো। ওই পাটাতনের সাথেই আটকে থাকে শক্তিশালী পেশি, ওগুলো ওড়ার সময় পাখির ডানা নাড়াতে সাহায্য করে। আর যারা উড়তে পারে না তাদের বুকের ওই হাড়টি হয় চ্যাপ্টা বা খুব সামান্য বাঁকানো। উড়তে না পারার ব্যাপারটিতে পাখিরা অভ্যস্ত হয় সাধারণত সেই সব দ্বীপাঞ্চলে যেখানে কোনো ধরনের শিকারির উত্পাত নেই। তাই বলে সব জাতের উড়তে অক্ষম পাখিদের দ্বীপাঞ্চলেই পাওয়া যায় তা না। উট পাখিদের বাস পূর্ব ও পশ্চিম আফ্রিকার তৃণময় সমতলভূমিতে। উটপাখিরা উড়তে পারে না। তাই শত্রু দেখলে তারা অন্য ধরনের প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। ভয় দেখালে ওরা পায়ের থাবাকে ভয়ঙ্কর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। অস্ট্রিচ :অস্ট্রিচ হলো উটপাখি। উটের মতো লম্বা লম্বা পা বলেই হয়তো এদের নামটি এমন। উড়তে না পারা পাখিদের মধ্যে সবার কাছেই কমবেশি পরিচিত এই পাখিটি তার বিশাল আকৃতির জন্য। পৃথিবীতে টিকে থাকা সকল পাখিদের মধ্যে আকৃতিতে সবচেয়ে বড় হলো উটপাখি। এখন কেবল পাওয়া যায় আফ্রিকায়। মাটি থেকে পাওয়া ফসিল অনুসন্ধান করে অবশ্য দেখা গেছে একসময় ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলেও এদের বসতি ছিল। এদেরকে একা, কখনো জোড়ায় জোড়ায় আবার কখনো বিশাল দল নিয়ে ঘুরতেও দেখা যায়। এটা আসলে নির্ভর করে ঋতুর উপর। এদের লম্বা পাদুটো বেশ শক্তিশালী বিশেষ করে নখগুলো। ভীত সন্ত্রস্ত হলে এরা ঘণ্টায় প্রায় ৭২.৫ কিমি বেগে দৌড়ায়। আর খুব বেশি কাছাকাছি হলে শত্রুর দিকে ভয়ঙ্কর লাথি ছুড়তে পারে। লতাপাতা খেয়ে জীবনধারণ করলেও অনেক সময় পোকামাকড় খায় এরা। পানি ছাড়া দীর্ঘ দিন টিকতে পারে উটপাখি। কিউই :কিউইদের বাস নিউজিল্যান্ডে। ধূসর বাদামী রঙের এই পাখিদের আকৃতি অনেকটা মুরগির মতো। পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে যাওয়া পাখি মোয়াদের গোত্রের সাথে এদের যোগাযোগ আছে। অনেক অর্থেই কিউইরা আসলে ব্যতিক্রমী। আগের বড় পাখার যতটুকু এ যুগে টিকে আছে (মাত্র দুই ইঞ্চি) তাও ঢাকা পড়ে থাকে তাদের পালকের নিচে। একদম গোড়ার দিকে থাকার বদলে ওদের নাসারন্ধ্র থাকে লম্বা নমনীয় ঠোঁটের অগ্রভাগে। আর সব পাখিদের পালকের মতো এদের পালকের গোড়ার দিকে লম্বা হাতলের মতো থাকে না, এবং সেগুলো অনেক নরম ও চুলের মতো। পাগুলো বেশ মোটাসোটা মজবুত ও পেশিবহুল। প্রত্যেক পায়ের চার আঙুলে একটি করে বড় নখর আছে। ছোট ছোট চোখগুলো দিনের আলোতে খুব বেশি সুবিধা করতে পারে না। কানের বাইরের দিকটা বেশ বড় ও উন্নত। ঠোঁটের গোড়ার দিকটায় ছোট ছোট লোমের মতো থাকে। পেঙ্গুইন :পেঙ্গুইনকে বলা হয় কালো কোট পড়া ভদ্রলোক। পৃথিবীতে ১৭ প্রজাতির উড়তে না পারা জলচর এই পাখিদের বসবাস কেবল দক্ষিণ গোলার্ধে। এই ১৭ প্রজাতির অধিকাংশই কিন্তু অ্যান্টার্কটিকার বাইরে ৪৫ থেকে ৬০ ডিগ্রি অক্ষাংশে বাস করে। সেখানে দ্বীপের মধ্যে তারা বাচ্চা পেঙ্গুইনের জন্ম দেয় ও লালন-পালন করে। খুবই স্বল্প সংখ্যক পেঙ্গুইনের বসতি নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে আর গ্যালাপাগোস পেঙ্গুইন বাস করে বিষুব অঞ্চলে। ইমু :বড় আকৃতির পাখিদের একটির নাম ইমু। অস্ট্রেলিয়ার এদের আবাস ভূমি। এদের শরীরে এক বিশেষ ধরনের তেল পাওয়া যায়। আর এই তেলের জন্য ইউরোপিয়ানরা ১৯ শতকে এদের ব্যাপকভাবে হত্যা করেছিল। বর্তমানে এদের কেবল মাত্র একটি প্রজাতি টিকে আছে অস্ট্রেলিয়ায়। তাদের সংখ্যা প্রায় ৭০ হাজারের মতো। ইমু পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম পাখি। গড়পড়তা উচ্চতা ৫ ফুট (১.৫ মিটার) এবং ওজন ৪৫ কিলোগ্রাম (১০০ পাউন্ড)-এর বেশি। মাটিতে ছোট গর্ত বা খাঁজের মধ্যে এরা ঘন সবুজ রঙের প্রায় চার ইঞ্চি লম্বা ডিম রেখে দেয়। তা দিয়ে ডিম ফুটে ছানা বের হতে সময় লাগে প্রায় দুই মাস, তা দেওয়ার পুরো দায়িত্বই কিন্তু নেয় পুরুষ ইমু। এমনকি বাচ্চা যত্নআত্তির কাজটাও করে সে-ই।