শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে কিছু ভাবনা

আমাদের জীবনের অনেক দুঃখ বা কষ্টের মাঝেও কিছু কিছু আনন্দ মনকে বড় নাড়া দেয়। ভাবনার মধ্যে পরিবর্তন আনে। স্বপ্ন দানা বাঁধে মনে। সেই স্বপ্নের পরিমণ্ডলে যদি সন্তানের সাফল্য নিহিত থাকে তাহলে পিতা-মাতার মনটা যে কি আনন্দে নেচে উঠে তা কি বলার অপেক্ষা রাখে। আজ যে শিশু কাল সে পরিণত ও আগামীদিনের ভবিষ্যত্ - যা ধ্রুবসত্য। সেই শিশুদের বেড়ে উঠা, চলার পথকে মসৃণ করে দেয়া, চাপমুক্ত করা যেমন মাতা-পিতার একান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য তেমনি তা রাষ্ট্রেরও বটে। শিশুরা তাদের পাঠ্য জানতে শুরু করে অ, আ, ক, খ... বা এ, বি, সি, ডি... বা ০, ১, ২, ৩...... দিয়ে। অগ্রসর হতে থাকে তারা সামনের দিকে। পরিণত হয় তারা কিশোর-কিশোরীতে। স্বপ্নে বিভোর হয় তাদের মন। মন-মানসের রঙ্গিন সেলগুলোতে তাই তারা লালন করতে থাকে নিজেদেরকে আকাশের এক জ্বলন্ত নক্ষত্ররূপে অথবা ডানামেলা এক একটি উড়ন্ত পাখি হিসাবে। ধীরে-ধীরে জানতে শেখে তারা ভূগোলকে, বিশ্বকে, বিজ্ঞানী বা মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইনের থিওরি অফ রিলেটিভিটিকে বা নিউটনের মহাকর্ষীয় বা আর্কিমিডিস প্রিন্সিপলের মতো বিজ্ঞানের জটিল জটিল সূত্রকে অথবা গ্রেগর জোহান মেন্দেলের বেসিক প্রিন্সিপলস অফ জেনেটিক্সকে। এই জানাগুলোর মধ্যবর্তী সময়ে স্তরে স্তরে তাদেরকে শিক্ষার কিছু ফিটনেস টেস্টের মধ্যদিয়ে যেতেই হয়। যে টেস্টগুলোকে আমরা বিভিন্ন নাম দিয়ে সনাক্ত করি যেমন জেএসসি বা এসএসসি বা এইচএসসি বা সমমানের স্তরগুলো। তদুপরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিযুদ্ধ তো রয়েছেই। এগুলোর প্রতিটি স্তর শিক্ষার্থীদের জন্য এক একটি স্ট্রেস- মাতা-পিতার জন্য তো বটেই। তারপরেও এগুলোকে টপকাতেই হবে। জীবনকে এগিয়ে নিতে হবে। ভাল ফলাফল যে করতে হবে-সে আশায়। এরূপ একটি টেস্টের (এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা) রেজাল্ট প্রকাশিত হলো এ মাসের ১৭ তারিখে। দশটি শিক্ষা বোর্ডে গড়ে পাসের হার ছিল ৯১.৩৪%। শুধু জিপিএ ৫-এর সংখ্যাই ছিল লক্ষণীয় অর্থাত্ ১,৪২,২৭৬ জন (দৈনিক ইত্তেফাক, ১৭ই মে)। জিপিএ ৪ থেকে ৫-এর মধ্যেও রয়েছে প্রায় ৫ লাখের উপরে। ফেল করেছে কম অর্থাত্ এক লাখের কিছু বেশি। সার্বিকভাবে এতো ভাল রেজাল্ট হওয়াতে বাঁধভাঙ্গা উল্লাসে মেতে উঠেছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মন। তাদের প্রাণ-উচ্ছল ও হাসিমাখা আনন্দের অংশীদার তাদের পরমপ্রিয় শ্রদ্ধেয় শিক্ষকবৃন্দ, অভিভাবক বা মাতা-পিতা, বন্ধু বা পড়ার সাথীরা ও পরিবারের আপনজনরা। মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকরা অক্লান্ত পরিশ্রম ও যথোপযুক্ত শিক্ষা ও পাঠদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদেরকে দেশ গড়ার হাতিয়ার হিসাবে যেমন তৈরি করেছেন-স্বপ্ন দেখিয়েছেন-যাদের অবদান কখনো তুলনীয় হয় না, তেমনি অনেক মাতা-পিতা কষ্টের শেষ আয়টুকু অন্তর থেকে উজাড় করে দিয়েছেন সন্তানের মঙ্গল কামনায় কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের আশায়। অনেক সময় ক্লাসমেট বন্ধুরা নিজেদের মধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনার মাধ্যমে বিজ্ঞান, গণিত বা তাদের পড়ালেখার অনেক জটিল সমস্যার সহজ সমাধানও খুঁজে পান। আপনজনদের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও অনুপ্রেরণার কি কোনো তুলনা চলে? তাদের কারো কারো উত্সাহ ও অনুপ্রেরণা আজকের এই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অনেকেরই সাফল্যের চাবিকাঠি। তাই এই আকাশচুম্বী সাফল্যে সমন্বিতভাবে সবার অবদানই অনস্বীকার্য। বাঁধভাঙ্গা উল্লাস ও উষ্ণ অভিনন্দনে সিক্ত যেমন উত্তীর্ণরা, তেমনি সেই আনন্দের সমান অংশীদার তাদের পরিমণ্ডলের এই মানুষগুলোরও-যাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় আজকের এই অর্জিত সাফল্য। তাই প্রাণঢালা উষ্ণ অভিনন্দন জানাই তাদের সকলকে। যে শিক্ষার্থীরা ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পাবে না তাদেরকে আমরা সিমপ্লি খারাপ ছাত্রের উপাধি দিয়ে আমাদের দায়-দায়িত্ব কি এড়াতে পারি? এটা বরং অমানবিকতার শামিল। ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোতে সীমিত আসন সংখ্যা বা আবাসিক অপ্রতুলতার কারণে এমনিতেই তারা ছিটকে পড়ে এবং অল্পবয়সে তাদের মনমানসিকতার উপরে তা যথেষ্ট চাপ বা প্রভাব ফেলে বৈকি! দেখা যায় পরে যা পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে অশান্তিও ডেকে আনে। তাই এই ছিটকে পড়া শিক্ষার্থীরা যে প্রতিষ্ঠানে যে বিষয়েই পড়ালেখা করুক না কেন-হউক সেটা অনার্স বা পাস কোর্স-সেই প্রতিষ্ঠাগুলোতে গুণগত বা মানসম্পন্ন শিক্ষা গ্রহণের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই। লেখকঃ ওহাইও স্টেটে একটি ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত। alamrowshon¦gmail.com