পার্বত্য অঞ্চলে মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম

অবশেষে পার্বত্য শান্তি চুক্তির আওতায় শিক্ষা ক্ষেত্রে কিছু বাস্তবোচিত সময়োপযোগী এবং ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গৃহীত হইয়াছে। পত্রিকান্তরের খবরে প্রকাশ, পার্বত্যঅঞ্চলের মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলার জেলা পরিষদের ব্যবস্থাধীনে ন্যস্ত করিবার উদ্যোগ গৃহীত হইয়াছে। ইহাতে তিন পার্বত্য জেলা যথা—খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটির সার্বিক মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রমের দায় দায়িত্ব এইসব জেলা পরিষদগুলির উপর বর্তাইবে। ইহা যে সেইখানকার শিক্ষা কার্যক্রমের ক্ষেত্রে ব্যাপক কল্যাণ বহিয়া আনিবে উহা বলাই বাহুল্য। উল্লেখ্য, বর্তমানে মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে। কিন্তু এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নানাবিধ অনিয়ম অব্যবস্থা ইত্যাদির কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের অধীনস্থ জেলাগুলির শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যাপক পশ্চাত্পদতা লক্ষ করা যায়। শিক্ষক নিয়োগ হইতে শুরু করিয়া শিক্ষকদের পদায়ন এবং শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই এই জাতীয় অনিয়ম অব্যবস্থা দৃশ্যমান। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই সর্বশেষ সিদ্ধান্তের দরুন পার্বত্য চট্টগ্রামে মাধ্যমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে আশানুরূপ উন্নতি ঘটিবে বলিয়া ওয়াকিবহাল মহল মনে করেন। বিশেষত এতদিন রাজধানী হইতে শিক্ষক নিয়োগ এবং তাহাদের পদায়ন ইত্যাদি নিয়ন্ত্রিত হইতো বিধায় স্থানীয়রা এইসব ক্ষেত্রে বঞ্চিত হইয়া আসিতেছে। তাহাছাড়া এই তিন জেলায় শিক্ষক সংকট যেমন চরমে তেমনি আবার যোগ্য ও অভিজ্ঞ শিক্ষকের রহিয়াছে তীব্র অভাব। এইসকল কারণে স্থানীয় বিপুলসংখ্যক আদিবাসী শিক্ষার আলোকপ্রাপ্তি হইতে বঞ্চিত রহিয়া যাইতেছে। অথচ, ১৯৯৭ সালের সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি পরিষদের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি মোতাবেক পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসীদের জীবনের মানোন্নয়নের ব্যাপারটিকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করা হইয়াছিল। আর সেই মোতাবেক শিক্ষা হইতে শুরু করিয়া সকল ক্ষেত্রেই স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রয়োজনসমূহ মিটাইবার জন্য এক প্রকার নৈতিক বাধ্যবাধকতার বিষয় নিশ্চয়ই কেহ অস্বীকার করিতে পারিবেন না। মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম আলোচ্য জেলাসমূহের পরিষদগুলির ব্যবস্থাপনায় স্থানান্তরিত হইলে উহা ঐ চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আরও এক ধাপ অগ্রগতি বলিয়া বিবেচিত হইবে নিশ্চয়ই। পার্বত্য জেলাসমূহ নানা কারণে পশ্চাত্পদ। উল্লেখ্য, একশ্রেণীর সন্ত্রাসীর পদচারণায় এবং তত্পরতায় ঐসব জেলায় অশান্তি বিরাজ করিবার প্রেক্ষিতে ঐ শান্তিচুক্তির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তাই অশান্ত পার্বত্য ভূমিকে শান্ত ও শান্তিপূর্ণ করিয়া তুলিতে হইলে ঐ চুক্তির পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন অপরিহার্য। সেইখানকার বাসিন্দারা জীবনের সকল ক্ষেত্রে সমান সুযোগ-সুবিধা লাভ করিবে এবং দেশের সার্বিক উন্নয়ন সাধনের ব্যাপারে যথাযথ ভূমিকা রাখিবে, ইহাইতো সকলের কাম্য। আদিবাসীদের নিকট তাহাদের স্ব স্ব সংস্কৃতি, জীবনাচার, ঐতিহ্য, ভাষা সব কিছুই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর তাহাদের এইসব ব্যাপারে যথাযথ গুরুত্ব কর্তৃপক্ষীয় মহল হইতেও প্রত্যাশিত। শান্তি যেইহেতু আমাদের সকলের লক্ষ্য এবং কাম্য, সেইহেতু শান্তি প্রতিষ্ঠাকল্পে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের জীবনের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়ে সবিশেষ যত্নবান হওয়া একান্তই আবশ্যক। আমাদের পার্বত্য অঞ্চলের বিপুল সম্ভাবনা রহিয়াছে আর তাই উহাকে কাজে লাগাইয়া এবং স্থায়ী বাসিন্দাদের সকল প্রকারের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করিয়া ও সর্বোপরি সকলের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ব্যবস্থা করিয়া দেশকে আগাইয়া লইবার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা যায় নিশ্চয়ই। আমরা আশা করিব এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনপ্রকার সংকীর্ণতা মতলববাজি বা শ্রেণি কিংবা গোষ্ঠী স্বার্থ যেন প্রাধান্য বিস্তার করিতে না পারে সেইদিকে সংশ্লিষ্টমহল সদা সতর্ক দৃষ্টি রাখিবেন।