বন্ধুত্বের আবাহন ছেড়ে মাদ্রিদে এখন যুদ্ধের উত্তেজনা

ইউরোপীয় ফুটবলে একই শহরের দুই দলের লড়াই এমনিতেই দারুণ আকর্ষণীয় এক ব্যাপার, বাড়তি উত্তেজনা। আর সেটা যদি হয় চ্যাম্পিয়ন্স লিগে, তাহলে তো আর কথাই নেই। স্পেনের মাদ্রিদে এখন তাই রিয়াল মাদ্রিদ ও অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদকে ঘিরে যুদ্ধের উত্তেজনা। কারণ পর্তুগালের লিসবনে যে আজ ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরটির শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে মুখোমুখি মাদ্রিদিস্তারা। অ্যাটলেটিকোর সাম্প্রতিক সাফল্যই এককালের বন্ধুত্বপূর্ণ এই ডার্বি লড়াইকে উত্তেজনার আগুনে পোড়াচ্ছে এখন। নগর প্রতিদ্বন্দ্বীদের ম্যাচকে কেন্দ্র করে সমর্থকদের পাগলাটে আচরণ, ম্যাচের কয়েকদিন আগে থেকেই দু’দলের খেলোয়াড়দের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য তো সাধারণ ব্যাপার, ম্যাচে দু’দলের খেলোয়াড়-সমর্থকদের বিবাদে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও মোটেই বিরল নয়। ই্ংল্যান্ডে ম্যানচেস্টার ডার্বি-নর্থ লন্ডন ডার্বি, ইতালির মিলান ডার্বি কিংবা স্কটল্যান্ডে সেল্টিক-রেঞ্জার্সের ওল্ড ফার্ম ডার্বির কথা আলোচনা করতে গেলে বোঝা যায় বিষয়টিই। সেদিক থেকে আশ্চর্য ব্যতিক্রম মাদ্রিদ ডার্বি। দু’দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে তো দূরে থাক সমর্থকদের মাঝেও বিরোধের বড় কোন খবর এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায়নি সংবাদ মাধ্যমে। আর এই ম্যাচ নিয়ে গণমাধ্যমের আলোচনার ক্ষেত্রটাও খুবই সীমাবদ্ধ। মাদ্রিদ ডার্বির চেয়ে বরং রিয়াল-বার্সেলোনার এল ক্লাসিকো নিয়েই ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে গণমাধ্যম। আর গণমাধ্যমের দোষ দিয়েই বা কি লাভ। দুই দলের মুখোমুখিতায় একটি দল যখন অপরাজেয় থাকে টানা চৌদ্দ বছর; তখন এই দ্বৈরথ নিয়ে মানুষের উত্তেজনা না থাকাটাই বরং স্বাভাবিক। গত বছর সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে কোপা দেল রে ফাইনালের আগে রিয়ালের বিরুদ্ধে অ্যাটলেটিকোর সর্বশেষ জয়টি এসেছিল ১৯৯৯ সালে। আর্জেন্টাইন দিয়েগো সিমিওনির কোচিংয়ে ইউরোপা কাপ, সুপার কাপ এবং ঘরোয়া লিগ কাপ জিতে গত কয়েক বছর ধরেই রিয়াল-বার্সেলোনার একাধিপত্য ভেঙ্গে লা লিগায় তৃতীয় শক্তি হিসাবে উঠে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছিল অ্যাটলেটিকো। মাদ্রিদের তুলনামূলক দারিদ্র্যপীড়িত দক্ষিণাঞ্চলের দলটি উঠে আসার পথে সবচেয়ে বড় লাফটি দিয়েছে এ মাসেই। বার্সেলোনাকে তাদের মাঠে রুখে দিয়ে দীর্ঘ দেড় যুগ পর লিগ শিরোপা জিতেছে অ্যাটলেটিকো। এই শিরোপাকে নিতান্ত একটি সাফল্য হিসাবে দেখার সুযোগ নেই। এমন দল যারা মাঝে মাঝে বড় দলকে হারিয়ে চমকে দেয়, সেই তকমা ঝেড়ে ফেলে স্প্যানিশ ফুটবলের প্রকৃত পরাশক্তি হয়ে ওঠারও সূক্ষ্ম একটা ইঙ্গিত ছিল অ্যাটলেটিকোর লা লিগা জয়ে। দশম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপার খোঁজে এক যুগ ধরে হন্যে হয়ে ছুটতে থাকা রিয়ালের প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠার একটা পরিষ্কার ইশারাও পাওয়া গেছে অ্যাটলেটিকোর এই সাফল্যে। ১৯০১ ও ১৯০২ সালে প্রতিষ্ঠিত রিয়াল ও অ্যাটলেটিকোর শতাব্দী প্রাচীন লড়াইয়ে এটাই যোগ করেছে নতুন মাত্রা। তবে দুই দলের এই মুখোমুখিতায় অন্যান্য ডার্বি ম্যাচের মতো নোংরামির সুযোগ নেই বলেই জানালেন অ্যাটলেটিকো সভাপতি এনরিক সিরেজো, ‘আমাদের দীর্ঘদিনের একটা ক্রীড়া দ্বৈরথ আছে। তবে সেটা ফুটবলের জন্য খুবই স্বাস্থ্যকর। আপনাকে অবশ্যই কয়েকজন পাগলাটে সমর্থককে সামলাতে হবে। তবে, অতীত ইতিহাস বলছে সবদিক থেকেই দারুণ একটা দ্বৈরথ এটা।’ অ্যাটলেটিকো সমর্থকদের ক্রীড়াসুলভ আচরণই দ্বৈরথটাকে নোংরামির দিকে ঠেলে না দেয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে জানিয়ে ক্লাবের শতকরা ২৫ ভাগ মালিকানার অধিকারী সিরেজো আরো বলেন, ‘জয়টা সব সময়ই দারুণ। তবে আমাদের সমর্থকদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আমরা জিতি বা হারি তারা আমাদের সমর্থন দিতে প্রস্তুত। কিভাবে জিততে হয় সেটার পাশাপাশি আমরা জানি হারটাকে কিভাবে নিতে হয় সেটাও।’ তবে সিরেজোর এই বক্তব্যের সাথে মোটেই একমত নয় মাদ্রিদের প্রশাসন। সম্ভাব্য সবধরনের ঝামেলা এড়াতে আজ রাতে অতিরিক্ত প্রায় দেড় হাজার পুলিশ থাকবেন মাদ্রিদের রাস্তায়। তাই লিসবনে যাই ঘটুক না কেন সেটা মাদ্রিদের পরিবেশে প্রভাব ফেলবে না বলেই জানালেন পুলিশ সদস্য লোরা, ‘তারা হয়তো লিসবনে একজন আরেকজনের পথ মাড়াতে পারে। তবে, মাদ্রিদে সেই সম্ভাবনা নেই।’ মাদ্রিদে কোন প্রভাব না ফেললেও, আজ যদি অ্যাটলেটিকো জিতে যায় তাহলে সেটা নিশ্চিতভাবেই বড় ধরনের একটা প্রভাবই ফেলবে স্প্যানিশ ফুটবলে। এল ক্লাসিকোর জনপ্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জ করে সেটা হয়তো নতুন নতুন রূপে প্রতিষ্ঠিত করবে মাদ্রিদ ডার্বিকে। পাশাপাশি রিয়াল-অ্যাটলেটিকোর এতোকালের বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বৈরথেও দেবে নতুন মাত্রা।