আইলার ৫ বছর
দুর্গত এলাকা পরিদর্শন ও কিছু কথা
প্রকাশ : ২৪ মে ২০১৪, ২১:২৯
আইলা। একটি ঘূর্ণিঝড়ের নাম। ২০০৯ সালের ২৫ মে সকাল থেকে প্রবল বৃষ্টি আর ঝড়ো হাওয়া বইতে থাকে খুলনার উপকূলীয় এলাকায়। বেলা ১১টায় আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় আইলা। ধেয়ে আসা জলোচ্ছ্বাস, তছনছ করে দেয় জনপদ। বিধ্বস্ত হয়ে যায় খুলনা ও সাতক্ষীরা, কেড়ে নেয় অনেক প্রাণ। স্বজন হারানোর সেই দুঃসহ স্মৃতি আজো বয়ে বেড়াচ্ছেন উপকূলবাসী। উপকূলের ১১ জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা হলো খুলনার কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী, উত্তর বেদকাশী, মহেশ্বরীপুর ও কয়রা সদর ইউনিয়ন, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ও পদ্মপুকুর ইউনিয়ন, দাকোপ উপজেলার সুতারখালী ও কামারখোলা ইউনিয়ন এবং আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়ন। ভয়াবহ এই ঘূর্ণিঝড় আইলায় যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি মানুষ। আইলা ও জলোচ্ছ্বাসে উত্তর বেদকাশি ও দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের মানুষের বাড়ি-ঘর ভেসে যায়। তলিয়ে যায় হাজার হাজার একর জমির ফসল, বিনষ্ট হয় চিংড়ি ঘের, ভেসে যায় গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি, ধ্বংস হয় বৃক্ষরাজি, প্রাণ হারায় অনেকেই। আশ্রয়হীন মানুষগুলো বেঁচে থাকার জন্য আশ্রয় নেয় শাকবাড়িয়া বেড়িবাঁধে।
গত ২২ মে ২০১৪ তারিখে সরেজমিন খুলনা জেলার কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি ও উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে জানা যায়, ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় সংঘটিত হওয়ার পর সরকারের কাছ থেকে বড় ধরনের সহযোগিতা এলাকাবাসী পায়নি। বেসরকারি সংস্থাগুলো যে সাহায্য-সহযোগিতা করেছে তাও অতি সামান্য। দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নে ইউএনডিপি, ইসলামিক রিলিফ ওয়ার্ল্ডওয়াইড শেল্টার সহায়তা প্রদান করলেও এখনো অনেক লোক শাকবাড়িয়া বাঁধের উপরে বা পাশে ঝুপড়ি ঘর বেঁধে বাস করছে। গাবুনিয়া গ্রামের বৃদ্ধ মোহার মিস্ত্রী বলেন, ‘পাঁচ ব্ছর হইয়ে গ্যালো, এহনো আমাগের দুঃখ গেইল না, এলাকার লোকজন অনেকেই বাঁধের উপর ঝুপড়ি ঘর বাইন্দা আছে, কিন্তু কারো কাইছ থেইকা ভালো কইরা সাহায্যই পাইলাম না।’
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, এলাকাগুলোতে খাবার পানির সমস্যা ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। এই এলাকার বাঁধ ভেঙ্গে পানি লবণাক্ত হয়েছে। ফলে কুয়া, পুকুর থেকে মিষ্টি পানি পাওয়া যায় না। গভীর নলকূপের পানিও যেভাবে লবণাক্ত হয়েছে, তা খাওয়ার অযোগ্য। বাধ্য হয়েই মানুষ এসব পানি পান করছে। বীনাপানি গ্রামের কালিপ্রদ বৈদ্য জানান, লবণাক্ত পানি খাওয়ার জন্য এলাকায় মানুষ বিভিন্ন ধরনের চামড়ার রোগে ভুগছেন। কুয়া বা পুকুরের পানিতে ধোয়া-মোছার কাজ করলেও তারা দূর থেকে গভীর নলকূপের পানি সংগ্রহ করছে। তিনি জানান, পানি পরিষ্কার ও মিষ্টি পানি পাওয়ার জন্য তারা বর্ষার দিকে তাকিয়ে থাকেন। বর্ষা নামলে তার পানি ধরে রেখে খাবার পানির ব্যবস্থা করবেন। বীনাপানি, মাটিয়াভাঙ্গা, কাঠমাছচর, বেদকাশি, কাঠকাটা, উত্তর বেদকাশি, বড়বাড়ি এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জোয়ার আসলে শাকবাড়িয়া নদীর পানি বেড়ে যায় এবং যেকোন সময় জোয়ারের পানিতে এই বাঁধটিও ভেঙ্গে যেতে পারে। বাঁধের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা এই এলাকার মানুষের দাবি। পানি উন্নয়ন বোর্ড এই বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে।
এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার কারণে আইলা-পরবর্তী সময়ে জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার কারণে ফসল করতে পারছেন না তারা। কয়রা উপজেলার কয়রা, উত্তর বেদকাশি, দক্ষিণ বেদকাশি, মহারাজপুর ও মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের মানুষগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ফসল ফলানোর ক্ষেত্রে। এলাকার খালগুলো প্রভাবশালীরা লীজ নেয়। ফলে তারা পানি আটকে রেখে কৃত্রিমভাবে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে। লোকজনকে চিংড়ি চাষে বাধ্য করে। জানা যায় আইলার পরে চিংড়ি চাষ লাভজনক হচ্ছে না, ভাইরাসের আক্রমণ দেখা দিয়েছে। তাই মত্স্য বিভাগ ও প্রাণিসম্পদ বিভাগ বিষয়টি নিয়ে কার্যক্রম শুরু করতে পারে। মাটিয়াভাঙ্গা গ্রামের এক ব্যক্তি জানান, তারা জমিতে ধান চাষ করতে চান। কিন্তু জলাবদ্ধতা না দূর হলেও তা সম্ভব নয়, এজন্য তিনি সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
একথা অনস্বীকার্য যে, অন্য যেকোনো দুর্যোগের তুলনায় আইলার ক্ষতি বেশি ও দীর্ঘমেয়াদি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য আইলার বিষয়টি সবচেয়ে কম আলোচিত হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে আইলা একটি অতীত দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও কয়রা উপজেলার উত্তর ও দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের কয়েক হাজার মানুষ এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। অধিকাংশ মানুষ অর্ধাহারে-অনাহারে জীবিকা নির্বাহ করছে। আইলায় ক্ষতিগ্রস্তদের দুর্দশা লাঘবে খাদ্য, পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান কার্যক্রমে সরকারি ও বেসরকারি কার্যক্রমের সমন্বিত ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ করা না হলো আইলা দুর্গতদের দুঃখমোচন স্বপ্নই থেকে যাবে।
লেখক :ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক
ইমেইল: mohammad.azam@gmail.com