সামাজিক সংকট ও তার উত্তরণ
প্রকাশ : ২৫ মে ২০১৪, ২২:২৮
প্রতিভাধর ব্যক্তিরাই সমাজের স্পিরিট বা চালিকাশক্তি। যাদের চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হয় সাধারণ জনতা। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মেধাবীরা তাদের সৃজনশীল কর্ম দ্বারা সভ্যতার সৈকত ভূমিতে পদচিহ্ন রেখে গেছেন। তারা হয়েছেন মানব জাতির আলোকবর্তিকা। কোন জাতিকে যদি ধ্বংস করতে হয় তাহলে ঐ জাতিকে মেধাশূন্য করলেই যথেষ্ট। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিতে অনেক আন্তর্জাতিকমানের মেধাবী ব্যক্তিত্বের জন্ম হয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার বাংলাদেশে সফরে এসে আমাদের দেশের মেধাবী ছাত্রদের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক স্বীকার করেছেন যে বাংলাদেশে যথেষ্ট মেধা আছে। কিন্তু দেশটার অস্থিতিশীলতা উন্নয়নের পথে অন্তরায় হয়ে আছে।
সাহিত্য-সংস্কৃতির ঐতিহ্যে এবং আবিষ্কার এবং শিল্পকর্মে এ জাতির গর্বের অনেক কারণ আছে। দার্শনিক প্লেটো বলেছিলেন- `An ideal ruler must be a philosopher`. তিনি গতানুগতিক দর্শন ভাবেননি। তিনি ভেবেছিলেন মানবতার জ্ঞানে উচ্চ প্রজ্ঞাময় শাসক শ্রেণী যে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হবে এবং যার মাধ্যমে জাতি উন্নয়নের পথ দেখবে। এই শ্রেণীর ব্যক্তি অবশ্যই সর্বোচ্চ মেধাসম্পন্ন ব্যক্তি। তাদের দেশপ্রেম তীব্র। কিন্তু আজ আমাদের শঙ্কিত হতে হয় যখন দেখি জাতির মেধাবীরা পাচার হয়ে যাচ্ছে। মেধাবীরা পাচার হয়ে গেলে দেশ অন্তঃসারশূন্য হয়ে যাবে। দক্ষ মানব সম্পদ সম্পন্ন জাতি দেখতে চাইলে জাতিকে শিক্ষিত করতে হবে এবং শ্রম ও মেধার সমন্বয় ঘটাতে হবে। আধুনিক বিজ্ঞান প্রযুক্তির জ্ঞান প্রদান করতে হবে এবং প্রকৃত মানুষ হতে গেলে সত্য জ্ঞানে প্রদ্ভাসিত হতে হবে। এ ক্ষেত্রে সাধারণ জনতার অংশগ্রহণ স্বাভাবিক হতে হবে। প্রকৃত মেধাবীদের কাজ হল গণমুখী চিন্তা তথা জনতার উন্নয়ন। ব্যক্তি উন্নত না হলে রাষ্ট্র উন্নত হবে কিভাবে? কারণ ব্যক্তি নিয়ে রাষ্ট্র গঠিত। কিন্ত জাতির মেধাবীরা যদি পাচার হয়ে যায় তাহলে দেশে কাণ্ডারী হওয়া লোকের অভাব বোধ হবে। বিদেশে পড়াশুনা বা চাকরির সুযোগ পেয়ে মেধাসম্পন্ন ব্যক্তিরা পাড়ি জমাচ্ছেন বিদেশের মাটিতে। তারা পড়াশুনা শেষ করে আর স্বদেশে ফিরে আসেন না। এটা দুঃখজনক। শুধু ভোগবিলাস আর ফুর্তিই জীবন নয়। জীবন অনেক ব্যাপক। প্রকৃত দেশপ্রেমিক না থাকলে দেশ ধ্বংস হয়ে যাবে। সুতরাং ছাত্রদের বাল্যকাল থেকেই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ।
আমরা পশুও হতে চাইনে আর দেবতাও হতে চাইনে। আমরা প্রকৃতপক্ষে মানুষ হতে চাই। জাতির উত্থানের স্বার্থে মহামানবের আগমন ঘটুক। বাঙালি জাতি তার মেধাবীদের নিয়ে গর্ববোধ করুক এই স্বপ্ন-সাধ আমাদের চিরদিনের। আজ আমরা রাষ্ট্রনীতির এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি যেখানে বেকারদের দীর্ঘ মিছিল। যখন দেখি দশজনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির জন্য একশ’ বস্তা আবেদনপত্র জমা পড়ে। বেকারদের মিছিল থামাবে কে? সরকারের একার পক্ষে কি এটা সম্ভব? আমাদেরকে দলমত নির্বিশেষে জাতির জন্য ভাবতে হবে। তবেই জাতির উন্নয়ন হবে। আমি অধুনালুপ্ত একটি পত্রিকায় একসময় লিখেছিলাম- “মানুষের ভিতর বিভক্তি দেশপ্রেম— সর্বোপরি মানব প্রেমহীনতার বড় নিদর্শন। এই বিভেদ বিভ্রান্তি যতদিন থাকবে ততদিন উন্নতির স্বপ্ন দুঃস্বপ্ন মাত্র”।
প্রাচীন গ্রীসের মানুষগুলোর মধ্যে সক্রেটিস যে শিক্ষা দিয়েছিলেন তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ উক্তি-“ Know thyself” অর্থাত্ নিজকে জান। যে ব্যক্তি নিজকে জানতে পেরেছে সে তার সত্তাকে জানতে পেরেছে। সূত্রমতে- Cognize psyche being. সক্রেটিস বলেছেন- “Knowledge is virtue and virtue is knowledge”. অর্থাত্ পুণ্যই জ্ঞান এবং জ্ঞানই পুণ্য। মানুষের ভিতর যদি সত্যের জ্ঞান ঢোকে তাহলে সে পুণ্য অর্জন করতেই থাকবে এটা স্বাভাবিক। মানবতার কল্যাণ হবে তার জীবনের বৈশিষ্ট্য। মানুষের জীবন চালনার কোন গাইড লাইন আছে কি না তা আজ ভাববার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্রষ্টা জগত্ সৃষ্টি এবং মানব সৃষ্টির পর তার দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে সত্যিকার মানুষ হওয়ার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। যে তার সত্তাকে চিনলো না সে নিজেকে চেনবে কি করে? আসলে বিশ্ব সমাজে আজ যন্ত্রের ব্যবহার এবং সম্পদের প্রাচুর্য আর ভোগবাদ, বস্তুবাদ, যান্ত্রিকতাবাদ এর মাধ্যমে ত্রাহি! ত্রাহি! অবস্থা। দার্শনিক ব্রাডলি মনের দুঃখে বলেছিলেন-“বস্তুর দাসত্বে যেদিন মানবজীবন বন্দি হয়ে পড়বে সেদিন অজানা অচেনা বিষয়ের প্রতি তার আর আকর্ষণ থাকবে না, সেদিন গোধূলির রক্তিম আভা যার হূদয় দেশকে আর স্পন্দিত করবে না”। আজ শিক্ষার হার বাড়ছে বিশ্বব্যাপী।
আজ ক্যাম্পাসের দিকে দৃষ্টি দিলে আমরা অসহায় হয়ে পড়ি। অস্ত্রের ঝন-ঝনানিতে ছাত্র-অভিভাবক আজ শঙ্কিত। দুঃখিত হতে হয় যখন শিক্ষিত পরিবেশে অল্পশিক্ষিত পুলিশ শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রবেশ করে এবং ছাত্রদের সাথে রূঢ় আচরণ করে। ক্যাম্পাস নামক শান্তিনিকেতনে কোন দেশে এমনি ঘটে। এমন হয় তা আজকে আমাদেরকে ভাবতে হবে। কেন সমাজের শিক্ষাঙ্গনে এমন হচ্ছে? আমাদেরকে শিক্ষানীতিতে যান্ত্রিক শিক্ষার পাশাপাশি শৈল্পিক, নৈতিক, আত্মিক, নান্দনিক শিক্ষার প্রয়োজন। যেদিন জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণ হবে এবং জাতি আলোকিত হবে সেদিন আমাদের শান্তির জন্য সংগ্রাম করার প্রয়োজন হবে না।
লেখক:প্রাবন্ধিক, প্রভাষক, দর্শন বিভাগ, ইস্পাহানী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা-১৩১০