অধৈর্য হইলে চলিবে না

সমপ্রতি রাজধানীতে অনুষ্ঠিত রাজনীতিবিষয়ক এক সেমিনারে প্রধান কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও ধর্মভিত্তিক সংগঠনের নাম উল্লেখ করিয়া বিশিষ্ট একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলিয়াছেন যে, রক্তমাখা হাত উদারতার সংস্কৃতির গলা টিপিয়া ধরিয়াছে। চর্তুদিকে রক্ত। এই রক্ত ও রক্তপাত হইতে আমাদের রাজনীতিকে উদ্ধার করিতে হইবে। সামগ্রিকভাবে অসহিষ্ণুতার মাত্রা যে ক্রমবর্ধমান এবং ক্ষেত্রবিশেষে তাহা যে রক্তাক্ত রূপ পরিগ্রহ করিতেছে, তাহা অসত্য নহে। তবে বিশেষ করিয়া রাজনীতিকে কেন্দ্র করিয়া সুশীল সমাজের এই ধরনের উচ্চকণ্ঠ হতাশা ও আক্ষেপ যে আকস্মিক নহে— তাহা সুবিদিত। ইহা মূলত সদিচ্ছাপ্রসূত বলিয়াই আমাদের বিশ্বাস, যদিও সদিচ্ছার গণ্ডি অতিক্রম করিয়া রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের প্রতি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিদ্বেষ ও বিষোদগারের তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং উদাহরণও রহিয়াছে দেশবাসীর সম্মুখে। প্রবল উত্সাহে রাতারাতি ‘রাজনীতিকে উদ্ধার’ করিতে গিয়া গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার ও অর্থনীতির কী দশা হইয়াছিল— নিকট অতীতের সেই অভিজ্ঞতা বিস্মৃত হওয়া কঠিন। তাহা সত্ত্বেও বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশের বক্তব্য শুনিয়া মনে হইতে পারে যে, পৃথিবীর আর কোনো দেশে এমন হানাহানির ঘটনা ঘটিতেছে না; কেবল বাংলাদেশের রাজনীতিই তলাইয়া যাইতেছে। বস্তুত বাংলাদেশের সমাজ একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করিতেছে। তাহার বহিঃপ্রকাশ ঘটিতেছে নানা ক্ষেত্রে। রাজনীতিও ইহার বাহিরে নহে। বরং রাজনীতির ক্ষেত্রেই উত্তাপ-উত্তেজনা-অসহিষ্ণুতার মাত্রাটা তুলনামূলকভাবে বেশি। ইহার সঙ্গত কারণও রহিয়াছে। ভুলিয়া গেলে চলিবে না যে, স্বাধীনতাপ্রাপ্তির পর যেই কয়েকটি দশক আমরা পার করিয়াছি, তাহার প্রায় অর্ধেকই ছিল অগণতান্ত্রিক শাসন। বাকিটা নামে গণতন্ত্র হইলেও আচার-আচরণে যে দীর্ঘ ঔপনিবেশিক ও স্বৈরশাসনের রেশ রহিয়া গিয়াছে তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরে নির্বাচনের কোনো বিকল্প নাই। অথচ কী উপায়ে, কাহার তত্ত্বাবধানে সেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে— তাহা লইয়া যেমন বিরোধ আছে, তেমনি অমীমাংসিত রহিয়া গিয়াছে স্পর্শকাতর অনেক বিষয়। তদুপরি, রাজনীতি ও ক্ষমতা যেহেতু পরস্পর অবিচ্ছেদ্য, সেইক্ষেত্রে রাজনীতির মাঠ দখলের বলদর্পী প্রতিযোগিতা তো অবশ্যাম্ভাবী এবং ইহা যে কেবল প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নহে—তাহাও বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রশ্ন হইল, বিগত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল হইতে মুক্ত হইয়া স্বাধীনতা লাভকারী শতাধিক রাষ্ট্রের মধ্যে কোন্ দেশটিই-বা এই অসুস্থ প্রবণতার বাহিরে? একমাত্র ব্যতিক্রম হিসাবে প্রায়শ যেই দেশটির নাম উল্লেখিত হইয়া থাকে, বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ বলিয়া বিবেচিত সেই ভারতও গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখিতে সক্ষম হইলেও অনেক ক্ষেত্রে তাহাদের চিত্রও যে খুব একটা ভিন্ন নহে— তাহাও অনেকটা স্পষ্ট। ইহাও সুবিদিত যে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বিশ্বের উন্নত দেশগুলিকেও দীর্ঘ রক্তাক্ত পথ পাড়ি দিতে হইয়াছে। অতএব, অধৈর্য হইবার কিছু নাই। এক্ষণে আমাদের রাজনীতির অঙ্গনে যেই অস্থিরতা বা অসহিষ্ণুতা পরিলক্ষিত হইতেছে সময়ান্তরে স্বাভাবিক নিয়মে তাহাও প্রশমিত হইবে। একপর্যায়ে সকলেই উপলব্ধি করিবেন যে, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছাড়া গত্যন্তর নাই। রাতারাতি রাজনীতিকে উদ্ধারের উদ্ভট ভাবনা পরিহার করিয়া ততদিন পর্যন্ত ধৈর্যধারণ গণতন্ত্রের স্বার্থেই অপরিহার্য শুধু নয়, অবিকল্পও বটে।