বেকারত্ব সমীক্ষার নানা দিক
প্রকাশ : ২৮ মে ২০১৪, ২১:৩৯
দেশে বেকারত্ব বাড়িতেছে—পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এইরূপ খবরে আমাদের প্রথমেই মনে হইতে পারে, চাকুরীর বাজারে চলিতেছে জ্যৈষ্ঠের খরতাপের মতো দারুণ দহন বেলা। লন্ডনভিত্তিক ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিটের প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশেই স্নাতক ডিগ্রিধারী শিক্ষিত বেকারের হার সর্বাধিক, প্রায় ৪৭ শতাংশ। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) তথ্যমতে, ১৯৯০ হইতে ’৯৫ সালে ১৫ হইতে ২৪ বছর বয়সী বেকার যুবকের সংখ্যা ছিল ২৯ লক্ষ। কিন্তু ২০০৫ হইতে ২০১০ সালের মধ্যে তাহা প্রায় পাঁচগুণ বৃদ্ধি পাইয়া এক কোটি ৩২ লক্ষে উন্নীত হইয়াছে। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির একটি গবেষণার তথ্যানুযায়ী, দেশে ফি বত্সর ২২ লক্ষ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু কাজ পায় মাত্র সাত লক্ষ মানুষ।
এই সকল তথ্য দূরবিনের একটি দিক দিয়া দেখিলে মনে হইতে পারে, চাকুরীর বাজার ভয়াবহ। কিন্তু দূরবিনের অন্য দিক দিয়া দেখা যাইতেছে, ফি বত্সর কর্মজীবনে প্রবেশ করিতে পারে প্রায় সাত লাখ মানুষ। ইহা ‘মাত্র’ নহে। বরং শুধু চাকুরীকেই যদি একমাত্র কর্মসংস্থানের উপায় ধরা হয়, তবে বিপত্তি দিন দিন বাড়িবে বৈ কমিবে না। ইহাও স্পষ্ট যে, শিক্ষার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য মানবসম্পদের উন্নয়ন ও বিকাশ হইলেও আমাদের যে শিক্ষাব্যবস্থা চালু রহিয়াছে, তাহা কোনোভাবেই সময়ের চাহিদা মিটাইতে পারিতেছে না, মননের তো নয়ই। ক্ষেত্রবিশেষে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা অগ্রগতির নির্দেশক না হইয়া সমাজের জন্য অনেকটা বোঝা হইয়া দাঁড়াইয়েছে। এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হইল, বেশির ভাগ স্নাতক সম্পন্ন করা শিক্ষার্থী চাকুরীবৃত্তিকেই জীবিকা নির্বাহের একমাত্র ও শেষ অবলম্বন মনে করেন। এই সমস্যা তাহাদের মননে। স্নাতক হইবার পরও কেহ কেহ নিজে উদ্যোক্তা হইবার চেষ্টা করিলেও তাহা বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত বেকারের তুলনায় অতি নগণ্য। ব্রিটিশ আমলের কেরানি তৈয়ারী করিবার শিক্ষার যে উপযোগিতা ছিল, এই একবিংশ শতকে আসিয়াও আমাদের শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশের মাথায় তাহা এখনও গাঁথিয়া রহিয়াছে। আর চাকুরীর ক্ষেত্রে যেই সুযোগ আসে, তাহারা কোনোরূপ বাছবিচার ছাড়াই, সেখানেই যোগদান করিতে ব্যগ্র হইয়া পড়েন। অন্যদিকে আমাদের দেশে কোন বিষয়ে একজন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করিবে, তাহা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ওই শিক্ষার্থীর ইচ্ছাধীন থাকে না। ইহাও আমাদের শিক্ষা পরিকল্পনার একটি বড় গলদ। প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিয়া যেই বিষয়ে সুযোগ পান, সেইটি পড়িতেই বাধ্য হন তাহারা। এই কারণে এইরূপ ঘটনা আমাদের দেশে খুব বিরল নহে যে, চিকিত্সক ও প্রকৌশলী হইয়াও অনেকে সরকারের প্রশাসন, পুলিশসহ বিভিন্ন ক্যাডারে যোগদান করিয়া থাকেন। আবার রাজনীতি বিজ্ঞানে পড়ালেখা করিয়া একটি আইটি কোর্সে ভর্তি হইয়া পরবর্তীতে আইটি খাতে কাজ করিতেছেন—এইরূপ শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কম নহে। বিশেষায়িত পদে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে দক্ষ কর্মী পাইবার ‘সরবরাহ লাইন’ও ভালো নহে। প্রতি বত্সর যে পরিমাণ স্নাতক বাহির হন, তাহার খুব কম সংখ্যকই মানসম্পন্ন।
তাই, বেকার বাড়িতেছে, তাহার অর্থ এইরূপও করা যায় যে, নিম্ন মানসম্পন্ন জনশক্তির সংখ্যা ফি বত্সর বাড়িতেছে যাহারা চাকুরী ছাড়া আর কিছু করিবার কথা ভাবেন না। প্রথাগত চাকুরী ও প্রচলিত ছকে বাঁধা পথে চলিবার মানসিকতাই ইহার জন্য দায়ী। পরিবর্তন দরকার এই মানসিকতার। প্রত্যেকেই তাহার স্ব স্ব যোগ্যতা অনুযায়ী নিশ্চয়ই কিছু একটা করিবার ক্ষমতা রাখেন। তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়িতেছে, তাহা উদ্বেগের না হইয়া স্বস্তির ও শক্তির হইবে, যদি তাহাদের সত্যিকারের মানবসম্পদে পরিণত করা যায়। বেকারত্বের সমস্যাটিকে তাই একরৈখিকভাবে দেখিলে চলিবে না।