নিষ্ঠুরতার ব্যারোমিটারের গন্তব্য কোথায়
প্রকাশ : ২৮ মে ২০১৪, ২১:৪১
আমাদের নিষ্ঠুরতার ব্যারোমিটার কোথায় গিয়ে ঠেকেছে? মাত্র ৭ দিনের পত্রিকা পড়ে তা জেনে নেয়া যাক। ২১ মে’র পত্রিকার খবর- স্থানীয় একজন উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা একরামুল হক। যিনি কিনা মাত্র ক’মাস আগে জনগণের বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। তাকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। খুনেই খুশি নয় খুনিরা। মনের খায়েশ চরিতার্থ করতে পরে তাকে কুপিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করে তার লাশ গাড়িতে রাখে। এখানেই শেষ নয়! পেট্রোল ঢেলে গাড়িসহ তার লাশ পুড়িয়ে অঙ্গার করে তবেই স্থান ত্যাগ করে তারা। কি দোষ করেছিলো একরামুল? বিপুল ভোটে বিজয়ী হওয়াই ছিলো তার মস্ত অপরাধ। জনগণ কেন তাকে এতো ভোট দিলো? এই বিপুল ভোট আর জনগণের ভালোবাসাই তো শেষে তার জীবনের জন্য কাল হলো। মানুষ কতটা নিষ্ঠুর হলে এমন কাজ করতে পারে? ঠান্ডা মস্তিস্কে দিনের বেলায়, সবার সামনে একজন জনপ্রতিনিধিকে গুলি করে কুপিয়ে তারপর গাড়িসহ পুড়িয়ে মারা কি সহজ কথা? অতি নিকটে নারায়ণগঞ্জের পেনেল মেয়র নজরুলসহ ৭ জনকে অপহরণের পর কি নিষ্ঠুর ভাবেইনা তাদের খুন করা হলো। খুনের পর তাদের পেট ফেঁড়ে ইট পাথর দিয়ে বস্তায় ভরে তবেই শীতলক্ষ্যা নদীর তলে রাখা হলো তাদের লাশ। এমন নিষ্ঠুর ঘটনাতো অহরহই হচ্ছে এদেশে।
দেশে এমন ঘটনা ঘটছে যা আদিম বর্বরতাকেও হার মানায়। গোপালগঞ্জ সদর উপজেলায় ডুমদিয়া গ্রামে গত ১৮ মে নানি, নাতি-নাতনি ও শাশুড়িসহ একই পরিবারের চারজনকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে! আর এ হত্যা সংঘটিত করেছে বাইরে থেকে ঘরের শিকল আটকে দিয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে! পুলিশ এ ঘটনায় অভিযুক্ত আজাদ মোল্লাকে আটক করেছে। পারিবারিক কলহের জের ধরে সে এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়। কেমন বর্বরতা! যখন একের পর এক খুন, অপহরণ, গুমসহ নানামুখী অপকর্মের শিকার হতে চলেছে মানুষ, তখন বিষয়টি আর কোনো ব্যক্তি বা পারিবারিক সমস্যা নয় বলেই আমরা মনে করি। এ ধরনের ঘটনাগুলো সব জাতির জন্যই একটি অশনি সংকেত বহন করে। ইঙ্গিত দেয় মানুষের হিংস্রতার উত্থানের। শুধু এ ঘটনাই নয় ক্রমাগত এমন সব ঘটনা ঘটছে তা বিশ্বাসযোগ্য না হলেও অবলীলায় সংঘটিত হচ্ছে। এটাতো কেবল মগের মুল্লুকেই সম্ভব। এটাতো মগের মুল্লুকই! সরকারদলীয় সাংসদ ও সাবেক মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সম্প্রতি দেশে এমন অবস্থা দেখে রাগে ক্ষোভে প্রকাশ্যে বক্তৃতায় বলেছেন, ‘দেশটা একদম মগের মুল্লুক হয়ে উঠেছে।’ মোটেও তামাশার কথা নয়; খোদ সরকারের ভেতরের লোক যখন দেশের অবস্থা মগের মুল্লুকের সঙ্গে তুলনা করেন, তখন ধরে নিই, অবস্থা সত্যিই সহ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। এমন দেশ কি আমাদের? রক্তমাখা এই দেশ, গুমের দেশ, পোড়া মানুষের দেশ, খুনের দেশ আমাদের না; ওদের।
বর্তমান সময়ে নানা ইস্যুতেই যেভাবে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে, তা কোনো সভ্য মানুষের কাজ হতে পারে না। সমাজ থেকে ঘৃণ্যরূপী এ মানুষকে যথাযথ শাস্তির আওতায় না আনা গেলে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে দেশ। দেশজুড়ে কেবল গুম, খুন, হুঙ্কার আর অশান্তির দাবানল। জনগণ শান্তি চায়। ধন-দৌলত কিছুই চায় না, দেশে একটু শান্তি চায়। চুরি, ছিনতাই, গুম, হত্যা চায় না; দেশের প্রতিটা মানুষের সম্পদ আর স্বজনদের জীবনের নিরাপত্তা চায়, চায় একটু স্বস্তি। ঘুমানোর সময় নিশ্চিন্তে ঘুমোতে চায়। সকালে সংবাদপত্র খুলে ভাল খবর পড়তে চায়। কিন্তু যেভাবে দুর্বৃত্তদের অপরাধ প্রবণতা বেড়েই চলেছে, এরকম পরিস্থিতি পুরো জাতির জন্যই দুর্ভাগ্যের। আমরা মনে করি দেশের যে কোনো হত্যাকাণ্ডের সঠিক তদন্ত নিশ্চিত করতে ও তার শাস্তি প্রদানে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে সরকারকেই।
লেখক :সাংবাদিক
e-mail-newsstore9@yaho.com