[ বা জে ট ]

২০১৪-১৫- এর বাজেট: কিছু সুপারিশ

ঢাকার অভিজাত একটা ক্লাবের অভিজ্ঞতা। সদস্যদেরকে কোনো একটা সুযোগ বা সেবা বিনা পয়সায় দিলে সব সদস্যই হাজির। কিন্তু টাকার বিনিময়ে হলে অর্ধেক সদস্যও হাজির হয় না। টাকার এত মূল্য যা ধনী/ অভিজাতরা পর্যন্ত দেয়। কিন্তু টাকার মূল্য দেয় না আমাদের সদাশয় সরকার, অর্থ মন্ত্রণালয়, এই সূত্রে মাননীয় অর্থমন্ত্রী। দেখা যাচ্ছে, বাজেটের আকার বাড়ছে, অর্থাত্ খরচের বাজেট বাড়ছেই, বাড়ছে উন্নয়ন বাজেটের আকারও। ২০১৩-১৪ অর্থবছরেও তা বাড়বে। অথচ এক টাকার কাজে দুই টাকা খরচ না হলে বাজেটের আকার অনেক ছোট হতে পারতো। অর্থাত্ দুই টাকার কাজ দুই টাকায় হলে অনেক বেশি কাজ হতো। অতীব দুঃখের বিষয় এই কাজটি হচ্ছে না। বাজেটের গুণগত মান বাড়ানোর দিকে কারো নজর নেই। এবারও তাই হবে বলে শুনছি। এটাই কাগজগুলোর সংবাদ। মিডিয়া এটাকে বড় খবর মনে করে। আমি মাননীয় অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ করব, বাজেটে যে ব্যয় ধরা হবে তা যেন ঠিকমত খরচ হয়। ছাত্র নেই, সেই স্কুলে যেন ‘এমপিও’র টাকা না যায়। রাস্তা বানানোতে যাতে এক টাকার কাজ এক টাকায় হয়। এটি করলে আমরা বেঁচে যাই। দ্বিতীয়ত, শুনতে পাচ্ছি ‘ভ্যাটের’ আওতা না কি সর্বগ্রাসী হবে। অথচ ‘ভ্যাট’ একটি পরোক্ষ কর। পরোক্ষ কর আর্থিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। এতে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলেই একই কর দেয়। এটা অন্যায়। সংবিধান বিরোধী। ‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ড’ এটি পছন্দ করে। কারণ এতে তাদের সুবিধা। আপোষে টাকা ঘরে আসে। পরিশ্রম নেই। পরিশ্রম করতে হলে লোক দরকার ‘এনবিআর’-এর লোকবল কম। অতএব তাদের ঝোঁক পরোক্ষ করের দিকে। কিন্তু সরকার রাজনৈতিক। তার হিসাব ভিন্ন। তাকে সামাজিক ন্যায়বিচার মানতে হয়। না মানলে নির্বাচনে দণ্ড দিতে হয়। অতএব আশা করি, মাননীয় অর্থমন্ত্রী ‘ভ্যাট’-এর আওতা বাড়াতে গিয়ে বেপরোয়া হবেন না। কারণ এতে শুধু সামাজিক ন্যায়বিচার বিঘ্নিত হবে না, বাড়বে মূল্যস্ফীতি। এই ঝুঁকি নেয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। করযোগ্য আয় অর্থাত্ করমুক্ত আয়সীমা কিছুটা বাড়ানো হবে বলে কাগজে দেখেছি। করমুক্ত আয়সীমার সাথে ‘ডিসপোজেল ইনকামের’ সম্পর্ক। এই টাকাই বাজারে যাবে। এই টাকাই মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। ক্রয়ক্ষমতা মানুষের এই মুহূর্তে ঠিক রাখা দরকার। একদিকে বর্ধিষ্ণু আয়কর, অপরদিকে ভোগ কর (কনজামশন)- দুই-এ মিলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত করছে। এটা বাজার অর্থনীতির জন্য খারাপ খবর। মধ্যবিত্তই বাজার অর্থনীতির ভরসা। তাকে বেঁধে পেটালে বাজার অর্থনীতি হবে না। অতএব করমুক্ত আয়সীমা বেশকিছুটা বাড়ানো দরকার- কমপক্ষে ২০ শতাংশ। আবার কাগজে দেখলাম, সর্বোচ্চ করের স্ল্যাব না কি করা হবে ৩০ শতাংশ। বর্তমানে তা ২৫ শতাংশ। আমার মতে, এটি করা ঠিক হবে না। যারা করজালে আছে তাদের উপর চড়াও না হয়ে নতুন করদাতা খোঁজা দরকার। চোখের সামনে লোকেরা কর ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছে। কারা কারা এটি করছে ‘এনবিআর’ চেয়ারম্যান মহোদয় কিছুদিন আগে কাগজে বলেছেন। তাদের ধরার ব্যবস্থা হোক। এটা করলেই প্রচুর টাকা করের আওতায় আসবে। মানুষের ব্যাখ্যাতীত কিছু আয় আছে। নানাভাবে তা তাদের হাতে আসে। এটা ঘুষ-দুর্নীতির টাকা নয়। কঠোর শ্রম, মেধা ইত্যাদির টাকা। যেহেতু এগুলোর কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ নেই তাই তারা তা ঘোষণা দিতে পারে না। মোট আয়ের ২০-৩০ শতাংশ টাকা এই খাতে ঘোষণা দিলে টিউশনি, ডাক্তারির টাকা বেশ কিছুটা করের আওতায় আসবে। এভাবে অনেক পথ আছে যার মাধ্যমে আয়কর বাড়ানো যায়। এ কারণে আমি সর্বোচ্চ কর স্ল্যাব ৩০ শতাংশ করার বিরোধী। বিরোধী আরো একটা কারণে সেটি ‘সম্পদ কর’ (ওয়েলথ ট্যাক্স)। একথা সর্বজনবিদিত ‘বোকারা’ এখন সম্পদ কর দিচ্ছে। ভাবা যায়, ১৬ কোটি লোকের দেশে মাত্র চার-পাঁচ হাজার লোক ‘সম্পদ কর’ দেয়। যদি ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, উত্তরা ইত্যাদি অভিজাত এলাকার বাড়ি, ফ্ল্যাট ও জমির মালিক সম্পদ কর দিত তাহলে সম্পদ করের আওতায় আসত কমপক্ষে লক্ষাধিক লোক। কিন্তু বলা হচ্ছে, সম্পদ-সম্পত্তির মূল্যায়ন সমস্যা এখানে জটিলতা সৃষ্টি করছে। কিন্তু এ কথা গ্রহণযোগ্য নয়। গুলশানের এক বিঘার উপর জমি এর মূল্যায়ন আমরা জানি না- এটা মতলবী কথা। অতএব, মাননীয় অর্থমন্ত্রী এ ব্যাপারে ভাবুন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটে এর একটা বিহিত করুন। নতুবা বর্তমান বিধিতে ফিন্যান্সিয়েল এ্যাসেটওয়ালারা ক্ষতিগ্রস্ত। আনপ্রডাক্টিভ খাতে টাকা যারা রাখে তারা লাভবান। এতে জমি, ফ্ল্যাট, বাড়ির দাম বাড়ছে। আশা করি, মুহিত সাহেব বিষয়টি নিয়ে ভাববেন। সঞ্চয় বিনিয়োগ বড় একটি বিষয়। দেশের সঞ্চয় স্থবির। বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির। এটা খুবই উদ্বেগের বিষয়। সঞ্চয়ের একটা বড় মাধ্যম সঞ্চয়পত্র। আগের সরকার অহেতুক সঞ্চয়পত্রের উপর চড়াও হয়। সুদের হার হ্রাস করা হয়, সঞ্চয়পত্র ক্রয়ের ঊর্ধ্বসীমা হ্রাস করা হয়। সঞ্চয়পত্রের আয়কে আয়করের আওতায় আনা হয়। এ সব করে সঞ্চয়পত্রকে অনাকর্ষণীয় করা হয়। পরে ভুল শুধরানোর চেষ্টা হয়। কিন্তু এখনো ক্রয়সীমা বাড়ানো হয়নি। আসন্ন বাজেটে তা করা উচিত। অধিকন্তু সঞ্চয়পত্রের উপর প্রাপ্ত সুদকে করের আওতায় আনা হয়েছে। ঠিক আছে তা থাকুক। উেসই কেটে নেয়া হোক। তবে একে ‘ফাইনাল সেটেলম্যান্ট’ করা হোক। এতে সরকারের ক্ষতি নেই। মানুষ, করদাতারা বহু হুজ্জতি থেকে বেঁচে যায়। বেঁচে যান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও। কারণ শুনেছি তাঁরও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ আছে। সঞ্চয়পত্রকে আকর্ষণীয় রাখা হোক। বলা হচ্ছে, ‘কর্পোরেট ট্যাক্স’ কমানো হবে। এর কারণ বোঝা দায়। আমাদের ব্যবসায়ীরা বিশেষ করে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির মালিকদের অধিকাংশই গার্মেন্টস শিল্পের মালিক, নতুবা অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পের মালিক। এই সূত্রে তারা বহু রেয়াত, সুবিধা, ভর্তুকী পান। এর উপর কর্পোরেট ট্যাক্স কমানোর কথা উঠে কেন? যদি আয়করের সর্বোচ্চ স্ল্যাব ২৫ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশে উন্নীত করা হয় তাহলে কর্পোরেট ট্যাক্স কমানোর কথা উঠে কেন? আমাদের প্রাইভেট ও পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিগুলোর হিসাব রক্ষণ পদ্ধতি এমনিতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন নয়। তারা প্রচুর আয় লুকায়। তারা কৈ-এর তেল দিয়ে কৈ ভাজে। প্রকৃত মুনাফা তারা কখনও দেখায় না। তার উপর কর্পোরেট ট্যাক্স কমানোর প্রস্তাব আমার ধারণা এই খাতকে বেশি ‘পেম্পার’ করার শামিল। এটা হবে উগ্র বাজার অর্থনীতির একটা কাজ। অর্থমন্ত্রীকে বলব, বিষয়টা ভালো করে ভাবতে। কালো টাকা সাদাকরণ সম্পর্কে বাজারে দুই ধরনের খবর। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘জান’ থাকতে তিনি হতে দেবেন না। আবার কাগজেই দেখলাম শেষ পর্যন্ত তা হবেই। জানি না শেষ পর্যন্ত কী হবে। তবে একটা কথা বলব। দেশের টাকা দেশে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। গরম গরম কথা বলে দেশের টাকা বিদেশে নেয়ার ব্যবস্থা করা হবে তা সহ্য করা যায় না। শোনা যায়, ইউরোপ, আমেরিকা ইত্যাদি অঞ্চলের দাতাদের টাকায় চলা বাংলাদেশি এনজিও-এর কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান তাদের স্বার্থে কাজ করছে। তারা উগ্র অবস্থান নিয়ে দেশে এমন একটা অবস্থান সৃষ্টি করছে যাতে সব টাকা ইউরোপীয় দেশ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডায় চলে যায়। হুন্ডিওয়ালারাও না কি তাই চায়। কারণ টাকা ট্রান্সফারেই তাদের লাভ। এসব কথা মাননীয় অর্থমন্ত্রীকে বিবেচনায় রাখতে হবে। আমি কালো টাকা সম্বন্ধে কী সিদ্ধান্ত হবে সে সম্পর্কে কিছু না বলে শুধু এটুকুই বলব- হয় ‘কালো’ টাকা ‘জেনারেশন’ বন্ধ করুন, আর তা না পারলে একে সিস্টেমের মধ্যে রাখার ব্যবস্থা করুন। অন্তত দেশের বাইরে যেতে দেবেন না। আমাদের বিনিয়োগ দরকার। আরেকটা কথা, ‘সাদা টাকা’ যাতে কালো না হয় তার ব্যবস্থা করতে হবে। নানা উত্পাতে সাদা টাকাও কালো হচ্ছে। এটা হতে দেয়া উচিত নয়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটে এ ব্যাপারে বক্তব্য চাই। বিনিয়োগের বড় বাধা জমি। জমি পাওয়া যায় না। একজন বড় ‘ব্যবসায়ী-এজেন্ট’ কয়দিন পরে পরে সরকারের কাছে জমি চান। অথচ তার জমি সারাদেশে। সবাই তা জানে। শত শত একর জমি তিনি কিনে রেখেছেন শিল্পের নামে। কিন্তু তিনি শিল্প করেন না। এমন বহু উদাহরণ আছে। তাদের জমি সরকারের নিয়ে নেয়া উচিত। সময় দেয়া হোক শিল্প করার। না করলে ঐসব জমিতে ইন্ডাস্ট্রিয়েল পার্ক করা হোক। সম্পত্তি ‘রিকুইজিশন’ করা হোক। শত হোক কৃষকের জমি নিয়ে যদি ‘পূর্বাচল’ করা যায় তাহলে যারা জমি ক্রয় করে বছরের পর বছর ধরে রেখেছে তাদের জমি নিয়ে নেয়া যাবে না কেন? শিল্প অবশ্যই করতে হবে ঢাকার বাইরে। ঢাকার সর্বনাশ হয়ে গেছে। শিল্পের কারণে ঢাকার আশ-পাশের নদী শেষ হয়েছে। শুনতে পাচ্ছি বিশ হাজার কোটি টাকা খরচ করে নাকি ঢাকা শহরের লোককে পানীয়জল খাওয়াতে হবে? এমতাবস্থায় ঢাকায় নয় সারা দেশে শিল্পের ব্যবস্থা করা দরকার। আসন্ন বাজেটে এ সম্বন্ধে কোনো খবর থাকবে কী? শেয়ার বাজার যেন অবহেলিত না হয়। ‘সাবসিডির’ টাকা যারা নষ্ট করে, অপচয় করে সেই সাবসিডি বন্ধ করা হোক এটা সকলের দাবি। ‘সেইফটি নেটের’ টাকা দরকার। কিন্তু শতাধিক কর্মসূচির অধীনে যে টাকা ব্যয়িত হয় তার বিরাট অংশ যায় অসাধুদের পকেটে। এই ক্ষেত্রে সমন্বয় দরকার, অপচয়, চুরি বন্ধ করা দরকার। এই ক্ষেত্রেও উগ্র বাজার অর্থনীতির দাপট। এটা বন্ধ করার ব্যবস্থা থাকবে কী আগামী বাজেটে? আগামী বাজেটে কী বুড়ো মানুষরা কিছু পাবেন? তাদের জন্য কী কোনো সুখবর থাকবে? বৃদ্ধ লোক, বয়স্ক লোকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তাদের কথা এখনই ভাবা দরকার, মাননীয় অর্থমন্ত্রী। লেখক:অর্থনীতিবিদ