আমিই ইতালির সেরা

বর্তমান ফুটবলের নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বর্ণময় চরিত্র তিনি। অদ্ভুত কথা, মাঠে ও মাঠের বাইরে ভূতুড়ে সব কাণ্ড কারখানা ঘটিয়ে সবসময় আলোচনায় আছেন মারিও বালোতেল্লি। নিজেই একবার টি-শার্টে লিখে এনেছিলেন—হোয়াই অলওয়েস মি! এটাও ঠিক যে শুধুমাত্র গায়ের বর্ণের জন্য এই সদারসিক মানুষটিকে অযাচিত অনেক আক্রমণের শিকার হতে হয়। সে নিয়েও বালোতেল্লির দুঃখ কম নয়। পুমার নতুন একটি বুটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে নিজের এই মজার চরিত্র ফুটে উঠলো তার দেওয়া সাক্ষাত্কারে। সেই সঙ্গে চোখে পানি এনে দেওয়া কথাবার্তা বললেন বর্ণবাদ প্রসঙ্গে— ইতালির সেরা খেলোয়াড় কে? (হাসি) সবচেয়ে গতিশীল? আমি। সেরা ফুটবলার? আহ! এটা আমাকে বলতে বাধ্য করবেন না। নিশ্চয়ই আপনারাও বোঝেন এটা কে। সবচেয়ে টেকনিক্যাল? এই যে, আপনারা যাকে দেখছেন। সবচেয়ে মজার লোক? এটাও তো আপনাদের জানার কথা, এটা মারিও বালোতেল্লি। তাহলে, সবচেয়ে আকর্ষণীয় ফুটবলার কে, জানতে চাইছেন? কাম-অন! অবশ্যই ইতালির সবচেয়ে আকর্ষণীয় ফুটবলার মারিও বালোতেল্লি! বিশ্বকাপ নিয়ে বলুন। রোমাঞ্চিত বিশ্বকাপ সামনে রেখে? আমার ছোটবেলার স্বপ্ন হল, বিশ্বকাপ খেলা। আসলে পেশাদার ফুটবলাররা এই স্বপ্ন নিয়েই খেলা শুরু করে। আমি এখন পর্যন্ত ভালোই খেলছি। আশা করি, সুযোগটা কাজে লাগাতে পারবো। গোল্ডেন বুট জিততে পারবেন? জিতলে কী করবেন? আমার জুতোর আলমারিতে বাকী জুতোগুলোর পাশে রেখে দেব! আমার মনে হয়, আমি গোল্ডেন বুট জিতবো। ২০১২ ইউরোর শুরুতে ভালো করতে না পারলেও পরে ভালো খেলেছি। আর এবার আমার বিশ্বাস ইতালি খুব ভালো করবে। আমিও ভালো করবো। কেন এই বিশ্বাস, জানি না; তবে ভালো করবো। ইতালি কী আসলেই ভালো দল? অবশ্যই ভালো দল। পিরলো, বুফন আছে, আরও চার-পাঁচ জন ভালো খেলোয়াড় আছে। আমি আছি। অবশ্যই ভালো দল। আবারও আপনি বর্ণবাদী আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন। ইতালিতেই কী এই ঘটনা ঘটে শুধু? না। বর্ণবাদ আসলে সব জায়গাতেই আছে। এখানে, ইতালিতে বা স্পেনে সেটা হয়তো একটু বেশি প্রকাশ্যে আসে, অন্য জায়গায় আসে না। ইংল্যান্ডেও যথেষ্ট বর্ণবাদী মানসিকতা আছে। তবে ওরা খুব ভালোভাবে ব্যাপারটাকে লুকিয়ে রাখতে পারে। সিটিতে খেলার সময় বর্ণবাদী আক্রমণ সহ্য করতে হয়েছে? প্রকাশ্যে খুব একটা না। সেখানে এই সুযোগটাও কম ছিল। আমার মনে আছে, সিটিতে যোগ দেওয়ার পরপর আমরা কোথাও যাচ্ছিলাম। বিমানে চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখি সাদা মানুষের চেয়ে কালো মানুষই বেশি। আসলে কী জানেন, এই সংখ্যা ব্যাপারটাই বড় পার্থক্য গড়ে দেয়। ইতালিতে কালো মানুষের সংখ্যা বিস্ময়কর পরিমাণে কম। এই আমাদের দলেই (এসি মিলান) আমি একা। আসলে কেন এমন হয়। আপনার অভিজ্ঞতা কী বলে, কেন লোকজন বর্ণবাদী আচরণ করে? আসলে এরা একটু অন্যরকম কাউকে নিজেদের একজন বলে দেখতে অভ্যস্থ না। একজন মানুষ, সে সাদা নয়; এটা তারা বিশ্বাস করতে পারে না। এই মূর্খরা এটা মেনে নিতে পারে না যে, ভিন্ন বর্ণের একজন মানুষ তাদের মতো করে পথ চলতে পারে। আপনাকেই কেন এটা সহ্য করতে হয়? আপনার মনে হয় না—হোয়াই অলওয়েস মি! মনে হয়। এই অপদার্থ লোকজন আমার ওপর ক্ষুব্ধ হয়, যাচ্ছে তাই বলে। অথচ আমি কিন্তু ওদের মতো একজন। আমি ভুল করি, সবাই তো ভুল করে। আমি নিজের ভুলের জন্য মাশুলও দেই। আমার ধারণা, আমি সাদা হলেও কিছু লোকের গায়ে জ্বালার কারণ হতাম; তবে এতোটা নয়। ঈর্ষা কী একটা কারণ হতে পারে? পারে, ঈর্ষা খুব ভয়াবহ একটা ব্যাপার। তবে কী হয় আপনি যখন সংখ্যাগুরু অংশ থেকে এরকম সংখ্যালঘু বর্ণের একটা মানুষের প্রতি হিংসাত্মক আচরণ করেন, সেটা আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বর্ণবাদবিরোধী অনেক আন্দোলন হয়। আপনি আপনার এসব অভিজ্ঞতা নিয়ে কোনো আন্দোলনে সামনে থাকতে পারেন না? লোকে তো এর বিপক্ষে লড়ছে। এই লড়াইটা গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা শুধু কথাই বেশি হচ্ছে। আমি মিডিয়াতে প্রতিবার আমার অভিজ্ঞতা বলি, চার-পাঁচ দিন হৈ চৈ থাকে; তারপর সব আগের মতো। ফলে সত্যিই যদি বর্ণবাদের বিপক্ষে কোনো কার্যকর আন্দোলন গড়ে ওঠে, আমি প্রথম ব্যক্তি হব, যে সেই আন্দোলনের জন্য রাস্তায় নামবো। তবে শুধু এই কথা বলার জন্য বলা; এটা আর করতে চাই না। কিন্তু বারবার বলেও তো একটা সচেতনতা তৈরি করা যায়। বললে তো বলাই যায়। কিন্তু আমার মনে হয় না, শুধু বলে কোনো পরিবর্তন আনা যায়। সত্যিকারের একটা বড় আন্দোলন লাগবে। যে আন্দোলনে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ মানুষরা রাস্তায় নামবেন। আর এটা সবচেয়ে বেশি দরকার, সেইসব কালো মানুষের জন্য, যারা আমার চেয়ে অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ; যাদের খবর পত্রিকায় আসে না। আপনি ইতালিকে একটা বিশ্বকাপ জেতালে আপনি তাদের হিরো হয়ে যেতে পারেন। তখন তো অবস্থা হয়তো বদলাবে। এটা খুব খারাপ চিন্তা। এটা আমার ভাবতেই কষ্ট লাগে যে, ইতালির এই অবস্থা একটা বিশ্বকাপ জিতলে বদলাতে পারে। আমি বরং এটা আশা করতে চাই যে, আমরা জিতি আর না জিতি, ইতালি বদলাবেই!