মেসির ঈর্ষা মেসির জেদ!
প্রকাশ : ৩০ মে ২০১৪, ২২:১০
তিনটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, দুটি ক্লাব বিশ্বকাপ, ছয়টি লা লিগা, ছয়টি সুপার কাপ, একটি যুব বিশ্বকাপ, একটি অলিম্পিক স্বর্ণ এবং টানা চার বছরের ফিফা বর্ষসেরা; আর কী চাই সর্বকালের সেরাদের তালিকায় নাম লেখাতে! আপনার মনে হতে পারে আর কিছু দরকার নেই। কিন্তু আসল জিনিসটাই যে বাকি রয়ে গেছে—ফিফা বিশ্বকাপই তো ছুঁয়ে দেখতে পারেননি লিওনেল মেসি।
যদিও কিছুদিন আগে ডিয়েগো ম্যারাডোনা বলেছেন, সর্বকালের সেরা হওয়ার জন্য বিশ্বকাপ জিতে নিজেকে প্রমাণ করার কিছু নেই মেসির; মেসি এমনিতেই সেরা। কিন্তু বাত্সল্য থেকে বলা ম্যারাডোনার এই কথায় কাজ খুব একটা হচ্ছে না।
পেলে থেকে বেকেনবাওয়ার; সবাই একটা কথাই বার বার বলেন—বিশ্বসেরা হতে গেলে একবার হলেও ফিফা বিশ্বকাপ স্পর্শ করতে হবে মেসিকে। মেসি নিজেও গত কিছুদিন এই কথাটা বার বার বলছেন। এবার খুব স্পষ্ট করে বললেন, এই বিশ্বকাপের কারণে তিনি সত্যিই ঈর্ষা করেন জাভি, ইনিয়েস্তা, পুওলদের মতো কিংবদন্তীদের।
ইএসপিএনকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি এই ঈর্ষার কথা অকপটে স্বীকার করে আবারও বললেন—বিশ্বকাপ না জিতে কিংবদন্তী হওয়া যায় না। আর বিশ্বকাপটা জিততে এবার মাঠে প্রাণ উত্সর্গ করে দিতেও যে পিছপা হবেন না, সেটাও বুঝিয়ে দিয়েছেন বার্সেলোনার এই গ্রেট।
তবে ঈর্ষার কথাটা বলতে গিয়ে একটু অন্যরকম একটা ব্যাখ্যা দিলেন মেসি। নিজেকে কিংবদন্তী করার জন্য শুধু নয়, এই আরাধ্য ট্রফি স্পর্শ করার যে একটা নিজস্ব অনুভূতি আছে; সেটা পাওয়ার জন্যই তিনি গ্রেটদের ঈর্ষা করেন, ‘আমি অবশ্যই ওদের ঈর্ষা করি। আমি আমার স্প্যানিশ বন্ধুদের (বার্সেলোনার) হিংসা করি। আমি ভাবি, ইস্্, আমিও যদি ওদের মতো এরই মধ্যে একটা বিশ্বকাপ জিতে ফেলতে পারতাম। আমি বিশ্বকাপ জিততে চাই। আমার মেডেল লিস্টে বিশ্বকাপটা অবশ্যই যোগ করতে চাই।’
ব্যক্তিগত এই জ্বালাপোড়া একজন কিংবদন্তীর ভেতর থেকে যেমন সেরাটা বের করে আনতে পারে, তেমনই উল্টো হতাশ করে ফেলতে পারে তাকে। এখন মেসির কোনটা হবে, সেটা সময় বলবে। তবে মেসি বিশ্বকাপ জিততে মরীয়া; সেটা নিজের জন্য তো বটে, বেশি করে চান দলের জন্য।
তার পাওয়া না পাওয়ার চেয়ে আর্জেন্টিনার প্রাপ্তি বা অপ্রাপ্তি যে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটা, বুঝতে পারেন মেসি। তাই নিজে কিংবদন্তী হলেন কিনা; সেটাকে একটু মাথার পেছনে ঠেলে দিয়ে দলের জন্য আগে জিততে চান এবার ট্রফিটা, ‘আমার প্রতি বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর জন্য নয়, বা গ্রেটনেস অর্জনের জন্যও নয়; অবশ্যই বিশ্বকাপ জিততে চাই আমি মূলত দেশের জন্য। আমার জন্য এটা যত প্রয়োজন, আর্জেন্টিনার আরও বেশি প্রয়োজন। হ্যা, জিততে পারলে সেটা তো আমার ঝুলিতেও যোগ হবে।’
আর মেসির ধারণা, এবার সেই বিশ্বকাপটা আর্জেন্টিনাতে নিয়ে যাওয়ার মতো সেরা অবস্থায় আছেন তিনি। যদিও বার্সেলোনাতে তার ফর্ম খুব ভালো ছিল না। তারপরও মেসি বলছেন, বিশ্বকাপ জিততে যে পরিপক্বতা দরকার, সেটাই এতোদিনে এসেছে তার মধ্যে, ‘২০০৬ তো বটেই, ২০১০ সালের পরও আমি অনেক পরিণত হয়েছি। আমার জীবনে ভালো-খারাপ অনেককিছু ঘটেছে। যা আমাকে আরও পেশাদার করে তুলেছে এবং আমার ব্যক্তিত্বকে পরিণত করেছে বলেই আমার মনে হয়। এখন আমি অনেক আত্মবিশ্বাসী এবং অনেক ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। এরকম একটা ট্রফি জয়ের জন্য এরকম প্রস্তুতি দরকার আপনার।’
নিজের মধ্যে ঠিক কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে, সেটা বুঝতে পারেন। সবচেয়ে বড় দুটি পরিবর্তন তো আমরাও দেখতে পাই—এখন মেসি জাতীয় দলের হয়েও নিয়মিত গোল করেন এবং সেই মেসি এখন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। মেসি মানছেন, অধিনায়কত্ব তাকে আরও দায়িত্বশীল করেছে, ‘হ্যা, আমি এখন জাতীয় দলের অধিনায়ক। যদিও এটা আমি বার বার বলি, ফুটবলে অধিনায়কত্ব আমাকে সেভাবে বদলে দেয়নি। অন্তত সতীর্থদের ব্যাপারে, বন্ধুদের ব্যাপারে আমার আচরণ বা মানসিকতায় কোনো বদল আসেনি। তবে এটা তো ঠিক, এই আর্মব্যান্ডটার একটা আলাদা অনুভূতি আছে। অন্তত আমি আগে যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি দায়িত্বশীল। সবচেয়ে বড় কথা আর্জেন্টিনাকে জেতানোর জন্য আমি যা করার দরকার, এখন করতে প্রস্তুত।’
আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতাতে হলে যে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে, ভালোই বোঝেন এই সাবেক ফিফা বর্ষসেরা তারকা। তিনি মনে করেন, গ্রুপ পর্বের একেবারে প্রথম ম্যাচে জয় পাওয়াটাই তাদের বিশ্বকাপ জয়ের অভিযানের প্রথম লক্ষ্য। ভালো শুরুর কোনো বিকল্প তিনি দেখেন না।
এসব কথাবার্তায় পরিষ্কার যে, বিশ্বকাপ জিততে কতোটা মরীয়া এই রোসারিওর তারকা। বিশ্বকাপের কথা বাদ দিন। এখন এমনিতে কী মেসি বিশ্বসেরা খেলোয়াড় নন?
এই প্রশ্নের উত্তর সময়ের হাতে ছেড়ে দিয়ে অনেকটাই যেন দার্শনিক হয়ে গেলেন মেসি। বললেন, এইসব সেরা-খারাপের চেয়ে তার কাছে অনেক বেশি বড় ব্যাপার ফুটবলের মজাটা। সেটা না থাকলে তিনিও থাকবেন না, ‘এখনকার যুগেই তো কতো গ্রেট খেলোয়াড় আছে—নেইমার, ইনিয়েস্তা, জাভি, ক্রিস্টিয়ানো, রিবেরি, রোবেন...। কে সেরা, সেটা লোকেদের বলতে দিন। আমি শুধু বুঝি ভালো ফুটবল খেলতে হবে, মজা পেতে হবে। আমি আমার নিজের সবচেয়ে বড় সমালোচক। আমি যতক্ষণ ফুটবল খেলে মজা পাই, বুঝি সব ঠিক আছে। সেই ছোটবেলা থেকে আনন্দের জন্য ফুটবল খেলি। আজও সমান মজা পাই। যেদিন সেটা পাবো না; আমাকে আর ফুটবলে দেখবেন না।’