‘ম্যারাডোনার কোন দোষ নেই

অনেকের মতে তিনি ইংল্যান্ডের ইতিহাসের সেরা গোলরক্ষক। দেশের বাইরে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সেরা সাফল্যটা এসেছিল তার সময়েই। ইতালিতে ১৯৯০ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড খেলেছিল সেমিফাইনাল পর্যন্ত। দেশের হয়ে ১৯ বছরের ক্যারিয়ারে ১২৫ টি ম্যাচ খেলা পিটার শিলটন খেলেছেন তিনটি বিশ্বকাপে। এছাড়া নটিংহ্যাম ফরেস্টের হয়ে টানা দুটি ইউরোপিয়ান কাপ জয়, ক্লাবটির হয়ে ১০০০ টি ম্যাচ খেলার রেকর্ড—এতো কিছুর পরও তাকে মনে রাখা হয় ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের জন্য। হ্যান্ড অব গড খ্যাত ডিয়েগো ম্যারাডোনার ‘আলোচিত-সমালোচিত’ গোলটি এসেছিল সেই ম্যাচেই। ইংলিশদের গোলপোস্টে তখন ছিলেন এই পিটার শিলটন। ফিফা ডটকমকে দেয়া সাক্ষাত্কারে শিলটন কথা বলেছেন সেই গোল নিয়ে। সাথে উঠে এসেছে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সম্ভাবনার প্রসঙ্গটিও— আপনার প্রথম বিশ্বকাপ ছিল স্পেনে, ১৯৮২ সালে। অনুভূতি কেমন ছিল? পিটার শিলটন: হ্যাঁ বিশ্বকাপটা আমাদের জন্য ভাল ছিল। পাঁচ ম্যাচে আমরা মাত্র একটি গোল হজম করেছিলাম। মজার ব্যাপার হলো, কোন ম্যাচ না হেরেই আমাদের বিদায় নিতে হয়েছিল। ১৯৮৬ সালে বাধা হয়ে আসে হ্যান্ড অব গড, ৯০-এ পেনাল্টি শুট আউটে ভাগ্য আমাদের পক্ষে ছিল না। সব মিলিয়ে আমার মতে আমার বিশ্বকাপ রেকর্ডটা খারাপ না। বিশ্বকাপে ম্যাচ খেলা ও গোল হজম করার হিসাবে সবচেয়ে এগিয়ে আছে ফ্যাবিয়ান বার্থেজ। ম্যারাডোনা না থাকলে হয়তো সেই রেকর্ডটা আমার হতো। তবে, সবচেয়ে বড় হতাশার স্মৃতি হলো ১৯৭৪ বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব পার করতে না পারা। বিশ্বকাপ খেলার জন্য এরপর আমাকে আরও আট বছর অপেক্ষা করতে হয়। আবার সেই ১৯৮৬ সালের আর্জেন্টিনা ম্যাচ ও হ্যান্ড অব গড প্রসঙ্গে ফিরে যাই। কিভাবে সেই কলঙ্কিত সময়টা এখনও ফুটবল ইতিহাসে বেঁচে থাকে? পিটার শিলটন: একটা সাফল্যমণ্ডিত ক্যারিয়ার কাটানোর পর আমাকে সবাই বাজে একটা কারণে মনে রাখে। আমাকে পৃথিবীর অনেক জায়গায় এই একই ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে হয়। মানুষ এখনও সেই বিষয়টা মনে রেখেছে। সেখানে তো আমার কোন দোষ ছিলো না। তাই সব সময়ই সেই প্রসঙ্গ চলে আসাটা আমার জন্য হতাশার। আপনি কি এখনও সেই গোলটা চোখের সামনে দেখতে পান? টিভিতে বার বার একই দৃশ্য দেখে আপনার স্মৃতিকে একটুও ধূসর হয়ে যায়নি? পিটার শিলটন: না, একদম না। আমার মনে হয় ম্যারাডোনা একটা সুযোগ নিয়েছিলো। ও জানতো, বলটা ওর হাতে লাগলে রেফারি সর্বোচ্চ একটা ফ্রি-কিক দিবেন। আর্জেন্টিনার হারাবার কিছুই ছিলো না। ফ্রি-কিক দিয়ে দিলে ০-০ অবস্থাতেই খেলা চলতো। সেটা হয়নি। গোলটা ছিলো ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এরপর ম্যাচটা আরও কঠিন হয়ে যায়। তাহলে আপনার মনে কোন খটকা নেই? পিটার শিলটন: না, নেই। আমি বলটা নক করতে গিয়েছিলাম। তবে, বলটা ঠিক আয়ত্তে ছিলো না। ম্যারাডোনাই এগিয়ে ছিলো। আমি তাই শূন্যে উঠে গিয়েছিলাম। আর এর পরের ঘটনা হলো, সে মাথায় জায়গায় হাত ব্যবহার করলো। ও ভেবেছিল বলটা আমার হাতেই চলে আসবে ও কেবল একটা সুযোগ নিয়েছিলো, যেমন অন্য সব স্ট্রাইকাররা নেয়। গোটা ইংল্যান্ড সেই মুহূর্তে প্রতারিত হয়। সে সময় থেকে কি আপনার ও ম্যারাডোনার মধ্যে সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে? পিটার শিলটন: আমার মতে সময়টা এক ধরনের খারাপ লাগার অনুভূতি রেখে যায়। এ রকম কিছু হলে আপনি আশা করতেই পারেন যে ম্যাচ শেষে সে আমাকে এসে বলবে, ‘দুঃখিত, আমি ভাবিনি এমনটা হবে। রেফারি ও লাইনম্যানদের ঘটনাটা দেখা উচিত ছিলো।’ কিন্তু, ম্যারাডোনা সেটা করেনি। সম্প্রতি সে আসল ঘটনা স্বীকার করার আগপর্যন্ত কোনদিন এটা নিয়ে আমার সাথে কোন রকম কথা বলেনি। তবে, বড় কথা হলো এ রকম হতেই পারে। ব্যাপারটা রেফারি ও লাইন্সম্যানদের চোখ ফাঁকি দিয়েছিল। আমি ম্যারাডোনাকে দোষ দিতে পারি না। এবার দ্বিতীয় গোলের প্রসঙ্গে আসি। ম্যারাডোনা যখন নিজের হাফে বল পেলেন তখন কি একটু দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন আপনারা? পিটার শিলটন: সে সময় মানসিক ভাবে আমরা কিছুটা ভেঙে পড়েছিলাম। আমরা প্রতারিত হয়েছিলাম। ১-০ গোলে পিছিয়ে ছিলাম, যেটা ছিল আমাদের জন্য অবিচার করা। প্রথমে আমার মনে হয়নি যে, ও এতোজন খেলোয়াড়কে বোকা বানাতে পারবে। কিন্তু সে যখন সফল ভাবে মিশনটা শেষ করলো, বিশ্বমানের একজন খেলোয়াড়ের পক্ষেই কেবল এটা করা সম্ভব। চার বছর পরের বিশ্বকাপেও কি সেই স্মৃতি আপনাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে. পিটার শিলটন: হ্যাঁ, অবশ্যই। সেটা ছিলো বিশ্বকাপে আমার শেষ সুযোগ। সবারই বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন থাকে। মিশরের বিপক্ষে একটা ম্যাচ ছিলো। আমরা সেখানে বেশ কয়েকটি গোল হজম করতে পারতাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত গোল শূন্য ড্র হয়। ক্যামেরুনের বিপক্ষেও ভাগ্য আমাদের পক্ষে ছিলো। কিন্তু সব আশা শেষ হয়ে গেল জার্মানীর বিপক্ষে ম্যাচে। আপনি কি এবার বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে নিয়ে আশাবাদী? পিটার শিলটন: হ্যাঁ, অবশ্যই। তবে, প্রথমবারের মত আমি দলটি থেকে কেমন ফল আসতে যাচ্ছে সেটা নিয়ে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত নই। রয় হজসন দলটিকে নিয়ে অনেক রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। দলটা অনেক তরুণ। এদের মধ্যে কয়েকজনের আগে বিশ্বকাপ খেলার অভিজ্ঞতা নেই। আর দক্ষিণ আমেরিকার কন্ডিশনেও আমরা অভ্যস্ত নই। এবারের গ্রুপটা কি একটু কঠিন হয়ে গেল না? ইতালি, উরুগুয়ে আর সাথে লাতিন আমেরিকরা কোস্টারিকাও আছে... পিটার শিলটন: একটা ব্যাপার ভাল যে, কঠিন গ্রুপ হওয়ায় আমরা প্রথম থেকেই সচেতন হয়ে যাবো। মানাউসে যেকোন দলের বিপক্ষে খেলাটাই কঠিন। আর দলটার নাম যখন ইতালি আমাদের জন্য বিপদটা আরও বেশি।