মানসম্মত শিক্ষা
কতদূর
প্রকাশ : ০৩ জুন ২০১৪, ২১:৫০
শিক্ষাব্যবস্থার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে, যিনি পাঠদান করেন অর্থাত্ শিক্ষক। অথচ আমাদের দেশে শিক্ষকের নিদারুণ সংকট থাকা সত্ত্বেও বিদ্যমান শিক্ষকদের আমরা ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারছি না। একটি দেশে শিক্ষক নিয়োগের যোগ্যতা, শিক্ষকদের বেতনভাতা, শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা সেই দেশের শিক্ষার মান সম্পর্কে এক ধরনের ধারণা তৈরি করে। শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতা ন্যূনতম হওয়া সত্ত্বেও এখনো বাংলাদেশে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি চলছে। তাছাড়া বিদ্যমান ব্যবস্থায় যোগ্য শিক্ষার্থীদের শিক্ষকতায় নিয়ে আসা প্রায় অসাধ্য। এখানে শিক্ষকদের বেতনভাতা, সামাজিক সুবিধা-মর্যাদা এত কম যে কেউই শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে আগ্রহ পান না। যাঁরা আছেন তাঁরা খুবই হতাশ। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলছিলেন, “পিতার অগাধ সম্পত্তি না থাকলে ভালো শিক্ষার্থীদের শিক্ষকতা পেশায় আসা বোকামি।” ঊনচল্লিশটি দেশে গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষকদের ১৫% বেতন বৃদ্ধির কারণে শিক্ষার্থীদের শিখন দক্ষতা ৬%-৮% বৃদ্ধি পেয়েছে (সবার জন্য শিক্ষা, ২০১৪)। ভাবতে কষ্ট হয়, বাংলাদেশে একজন শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি এবং একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের বেতন প্রায় সমান। একজন শিক্ষক অপর্যাপ্ত বেতনভাতা দিয়ে আত্মমর্যাদা নিয়ে সমাজে চলতে পারেন না। এ কারণে যাঁরা শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন, তাঁরা চাকরি পালটাতে সদা তত্পর, শিক্ষকতার পাশাপাশি অর্থ উপার্জনের নানান কাজের সঙ্গে জড়িত। এসব কিছুর চূড়ান্ত ভুক্তভোগী আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষকদের দুর্বল বিষয় দক্ষতা এবং প্রশিক্ষণের অভাব মানসম্মত শিক্ষার পথে অন্যতম অন্তরায়। বাংলাদেশে ৭৩% সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ৭০% রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ নেই। শিক্ষক প্রশিক্ষণের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অত্যন্ত দুর্বল এবং এর শিক্ষাক্রম বহুলাংশে তাত্ত্বিক। তাছাড়া শিক্ষক স্বল্পতার কারণে কোনো ধরনের পূর্বজ্ঞান বা প্রশিক্ষণ না থাকা সত্ত্বেও তাদের একের অধিক বিষয়ে পাঠদান করতে হয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে একজন শিক্ষক একাধিক ক্লাসে পাঠদান করছেন একই সময়ে। ফলে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান-দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন স্তর-বয়স ভেদে পাঠদান পদ্ধতি সম্পর্কে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ওপর ক্লাসের চাপ বেশি পড়ছে এবং যার কোনো আর্থিক সুবিধা তাঁরা পান না।
আমাদের শিক্ষাক্রমের দুর্বলতার কারণে শিক্ষকরা কার্যকর প্রশিক্ষণ গ্রহণে আগ্রহী হন না। শিক্ষকগণ ভালো করে অবগত নন শিক্ষাক্রমে কী বলা আছে, শিক্ষককে কী জানতে হবে, শিক্ষার্থীরা কী জানবে এবং কীভাবে জানবে। বিভিন্ন স্তরের শিক্ষাক্রম এখনো বহুলাংশে মুখস্ত বিদ্যার ওপর নির্ভরশীল। শিক্ষাক্রমে জীবন ঘনিষ্ঠ উপাদানের অভাব এখনো রয়েছে। যদিও সৃজনশীল পদ্ধতি একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় চালু করা হয়েছে। কিন্তু শিক্ষকের তুলনায় অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, সৃজনশীল প্রশ্নপত্র রচনায় পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, বাজারের সৃজনশীল গাইডের ওপর নির্ভরশীলতা— এসব কারণে সৃজনশীল পদ্ধতিকে নতুন করে সাজানোর বিষয়টি নিয়ে অনেকে ভাবছেন। এর বাইরে শিক্ষকদের বছরব্যাপী সরকারি বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যস্ততা, জাতীয়-আন্তর্জাতিক ছুটিসমগ্র এবং দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে বিদ্যালয়ে পাঠদানের বার্ষিক সময় কমে যাচ্ছে যা মানসম্মত শিক্ষার স্বীকৃত পাঠদানকালের চেয়ে বেশ কম।
শিক্ষাখাতে বাজেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি দেশের জিএনপি-র অন্তত ৬% শিক্ষার জন্য ব্যয় করা উচিত। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিক্ষাখাতে জাতীয় বাজেটের কমপক্ষে ২০% বরাদ্দ প্রদান করা দরকার। সারাবিশ্বের নিম্ন বা নিম্নমধ্য আয়ের দেশগুলো যেখানে শিক্ষাখাতে বাজেট বরাদ্দ ক্রমাগতহারে বৃদ্ধি করছে, বাংলাদেশে সেখানে ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ মাত্র ১২%। শিক্ষাখাতে অধিক বরাদ্দ দিতে প্রয়োজনে অনুত্পাদনশীল খাত থেকে কর্তন করে শিক্ষার জন্য বাজেট বৃদ্ধি করতে হবে। শিক্ষাখাতের বরাদ্দ ঠিকমতো মনিটরিং করা দরকার। অভিযোগ আছে— যে কাজে বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে, সে কাজে তা ব্যয় করা হচ্ছে না। দাতাগোষ্ঠীগুলো অন্যদিকে তাদের বহুমাত্রিক সহায়তার দ্বার সামপ্রতিক সময়ে সংকুচিত করে আনছে। ২০০২ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে দাতাগোষ্ঠীগুলো আর্থিক সহায়তা বাড়াতে থাকলেও ২০১০-২০১১ অর্থবছরে আর্থিক সহায়তার হার প্রায় ৭% কমেছে। এখুনি যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে হয়তো সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষার অধিকার বাস্তবায়নের প্রতিযোগিতায় আমরা পিছিয়ে পড়বো।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়