বেশি কর আদায় বাড়ছে অনুন্নয়ন ব্যয়ের লক্ষ্য
আলাউদ্দিন চৌধুরী ও রিয়াদ হোসেন
প্রকাশ : ০৪ জুন ২০১৪, ২২:৪৪
প্রত্যক্ষ কর আদায় বাড়ানোর কিছু পদক্ষেপসহ ব্যাপকভিত্তিক মূল্যসংযোজন কর বা ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব নিয়ে আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে পেশ হতে যাচ্ছে আগামী অর্থ বছরের বাজেট। ২০১৪-১৫ অর্থ বছরের এই বাজেট দুপুরে মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর বিকাল তিনটায় জাতীয় সংসদে উত্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
অর্থমন্ত্রী হিসাবে ৮ম বারের মতো আড়াই লাখ কোটি টাকার বাজেট দিতে গিয়ে তিনি আয় এবং ব্যয়ে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য স্থির করেছেন। তবে ব্যয়ের সিংহভাগই অনুন্নয়ন খাতে, যা প্রথাগতভাবেই বেড়ে যাচ্ছে। বিশাল ব্যয়ভার সামাল দিতে কর আদায়ের দিকেই বেশি জোর দিয়েছেন বলে জানা গেছে। ভ্যাটের ক্ষেত্রে প্যাকেজ সুবিধাদির অনেকগুলোই বাদ দিয়ে ব্যাপক হারে ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব থাকছে, যা জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াতে পারে বলেও জানা গেছে।
আয়কর খাতে বড় সংস্কারের প্রস্তাবও থাকছে। যেমন অধিক আয়ের উপর বাড়তি হারে কর, পরিবেশ দূষণকারী শিল্পের উপর ‘গ্রিন ট্যাক্স’ নামে নতুন কর, জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি সৃষ্টিকারী তামাক কোম্পানির উপর নতুন কর, বাড়িভাড়া চেকের মাধ্যমে পরিশোধ, ক্ষুদ্রঋণ আয়করের আওতায় আনা, সম্পদের সারচার্জের (করের উপর কর বা মাশুল) হার বাড়ানো, বেশকিছু খাতে অগ্রিম আয়কর হার বাড়ানোর (চূড়ান্ত করদায় হিসেবে) মাধ্যমে বড় সংস্কার আসছে আয়কর খাতে। বহুল আলোচিত কালো টাকা আবাসন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ অব্যাহত থাকছে আসছে বছরও।
কিন্তু মূল্য সংযোজন করের (ভ্যাট) ক্ষেত্রে বেশকিছু খাতে সঙ্কুচিত ভিত্তিমূল্য তুলে দিয়ে ১৫ শতাংশ হারে আদায়ের প্রস্তাব থাকছে। স্বভাবতই এই খাত পড়বে স্বল্প আয়ের মানুষ এমনকি একজন রিক্সাওয়ালার উপরও। এছাড়া মোবাইল সেটের আমদানিতে শুল্কহার বাড়ানো আর মোবাইলের সিম পরিবর্তনে ১০০ টাকা চার্জ আরোপ হতে পারে।
বিশাল সংখ্যক পণ্যে সম্পূরক শুল্ক কমিয়ে দিতে হচ্ছে। এ জন্য আয়কর আর ভ্যাটের উপর বাড়তি চাপ রেখে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭২০ কোটি টাকার রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা দিতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। এর মধ্যে আয়কর খাতে ৫৭ হাজার ৫শ, ভ্যাট খাতে ৫৬ হাজার ৫শ এবং শুল্ক খাতে গতবারের অঙ্কে খুব একটা হেরফের না রেখে ৩৫ হাজার ৭২০ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, এবারের বাজেটে উচ্চ বিত্তের উপর করের ভারটা বেশি দিতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। এর বাইরে রাজস্বে বড় প্রভাব পড়বে না এমন কয়েকটি খাত বিশেষত সঞ্চয়পত্রে স্বল্প বিনিয়োগকারীদের কর ছাড়, প্রণোদনা আরকর অবকাশের মতো বিষয়ও থাকছে। অর্থমন্ত্রীর ঘোষণায় ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা বিদ্যমান ২ লাখ ২০ হাজার টাকাই থাকছে। অবশ্য মহিলা ও বয়স্ক করদাতা, প্রতিবন্ধীদের করমুক্ত আয়সীমা বাড়তে যাচ্ছে। অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৪ লাখ করার প্রস্তাব থাকছে। আর আয় গণনায় কৃষিখাতে করমুক্ত আয়সীমা বিদ্যমান ৫০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে দ্বিগুণ হতে পারে। এছাড়া করের ৩০ শতাংশের একটি ধাপ বাড়ছে। অর্থাত্ বিত্তশালীদের উপর বেশি হারে কর আদায়ের দিকে হাঁটছেন তিনি।
বহুল আলোচিত কালো টাকা আবাসন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ অব্যাহত থাকছে আগামী অর্থ বছরেও। এছাড়া প্রযোজ্য হারে কর এবং জরিমানা দিয়ে যে কোন খাতে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগও বহাল থাকছে। যদিও অতীতে এ সুযোগে অর্থনীতির মূল স্রোতে কালো টাকা খুব একটা না আসায় এবার এ সুযোগ থাকবে না বলে জানিয়ে দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। বিগত দুই বছর আগে চালু করা সম্পদের সারচার্জের (করের উপর কর বা মাশুল) হারও বাড়াতে যাচ্ছেন তিনি।
বহুল আলোচিত কোম্পানির কর্পোরেট করহারে সামান্যই পরিবর্তন আসছে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির কর বিদ্যমান সাড়ে ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করার প্রস্তাব আসতে পারে। রাজস্বে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে এমন আশঙ্কায় ব্যবসায়ীদের দাবি সত্ত্বেও কর্পোরেট করে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে না।
বাজেটে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের জন্য আসছে অর্থ বছরেও কিছু সুখবর রাখছেন অর্থমন্ত্রী। ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন (মালিকানা থেকে ব্যবস্থাপনা পৃথককরণ) কোম্পানির মুনাফা আগামী ৫ বছরের জন্য করমুক্ত রাখার ঘোষণা আসতে পারে। এর বাইরে লভ্যাংশ আয়ের করমুক্ত আয় বিদ্যমান ১০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব থাকতে পারে।
পরিবেশ সুরক্ষায় চালু হচ্ছে ‘গ্রীন ট্যাক্স’ নামে বিশেষ কর। পরিবেশ দূষণকারী শিল্প কারখানার উপর এ কর আরোপ হবে। অন্যদিকে রাজধানীর বাইরে দূরবর্তী এলাকায় শিল্প স্থাপনে কর অবকাশসহ বিশেষ কর সুবিধা দেয়া হচ্ছে। জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বিবেচনায় তামাকজাত কোম্পানির উপর এক ধরনের সারচার্জ আরোপ হচ্ছে। সেই সঙ্গে স্বল্প মূল্যের বিড়ি ও সিগারেটের উপর বাড়তি কর বসছে। ক্ষুদ্র ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের আয়ের উপর কর বসানোর সিদ্ধান্ত রয়েছে এনবিআরের। ২৫ হাজার টাকার বেশি ভাড়া বাবদ আয় হয় এমন বাড়ির বাড়িভাড়া চেকের মাধ্যমে পরিশোধের বাধ্যবাধকতা আসছে। রাজধানীর অভিজাত এলাকার জমি নিবন্ধন ফি দুই থেকে পাঁচগুণ বাড়াতে পারে। এর বাইরে সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভা এলাকায়ও নিবন্ধন ফি বাড়তে পারে।
রপ্তানিকারকদের জন্যও থাকছে কিছু সুখবর। বেশকিছু খাতে উেস কর্তিত অগ্রিম আয়করের হার বাড়ছে। এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় করতে চায় এনবিআর। ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকৃত মুনাফায় বিদ্যমান ৫ শতাংশ উেস কর প্রত্যাহার করা হচ্ছে।
ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ১৫০০ সিসি পর্যন্ত গাড়ির মালিকদের করহার বাড়ছে না। এর চেয়ে বেশি সিসি ক্ষমতাসম্পন্ন গাড়ির ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর বাড়ানোর প্রস্তাব থাকতে পারে। বোতলজাত পানির উপর নির্ধারিত শুল্ক-করের বাইরে বাড়তি ২ শতাংশ হারে অগ্রিম কর আরোপের প্রস্তাব থাকছে। বর্তমানে বোতলজাত পানির উপর ২০ শতাংশ শুল্ক-কর আরোপ রয়েছে।
ভ্যাট : নতুন বাজেটে প্রত্যক্ষ করের চাপ না থাকলেও কৌশলে ভ্যাটের হার বাড়ানো হচ্ছে বেশ কিছু পণ্যে। ফলে স্বভাবতই সবশ্রেণীর ভোক্তার উপর এই চাপ পড়বে। বর্তমানে সেবা ও পণ্যের ২৬টি খাত আছে, যেখানে সাড়ে ৪ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায় করা হয়। নতুন বাজেটে এই হার বাড়ানোর প্রস্তাব থাকছে। এ ছাড়া কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের ভ্যাট কমানোর প্রস্তাব থাকছে। ভোজ্যতেলের আমদানিতে বিদ্যমান ১০ শতাংশ ভ্যাট হার আগামী বাজেটেও বহালের প্রস্তাব থাকছে। আন্তঃজেলা সড়ক ও নদীপথে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যান চলাচলে ভ্যাটের হার বাড়ছে।
শুল্ক : শুল্ক ব্যবস্থার অটোমেশনে বজেটে একটি রোডম্যাপ থাকবে। আগামী বছরের জুলাই থেকে ১৬২টি পণ্য বাদে ১২ শতাধিক পণ্যের উপর সম্পূরক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রথা বাতিল করতে হবে। এ বিষয়টি মাথায় রেখে ফাঁকি ঠেকাতে ও বন্দরের কার্যক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সব শুল্ক স্টেশনকে অটোমেশনে আনা তথা বিল অব এন্ট্রি স্বংয়ক্রিয় করতে একটি পরিকল্পনার কথা উল্লেখ থাকবে। গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান সিসিস্তরে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। নতুন হাইব্রিড গাড়ির উপর সম্পূরক শুল্ক বসছে।
বাজেটের ডকুমেন্ট পেতে হলে : অর্থমন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এবারও ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থাত্ পাওয়ার পয়েন্টের মাধ্যমে বাজেট উপস্থাপন করা হবে। আজ বাজেট বক্তৃতা; বাজেটের সংক্ষিপ্তসার; বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি; সম্পূরক আর্থিক বিবৃতি; মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতি; ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে অগ্রযাত্রা : হালচিত্র, ২০১৪; বিদ্যুত্ ও জ্বালানি খাত উন্নয়ন : সাফল্যের অগ্রযাত্রা; রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা : উন্নয়নের পথে অভিযাত্রা; বাংলাদেশে দারিদ্র্য ও অসমতা : উত্তরণের পথে যাত্রা; পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশ; জেলাভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ, ২০১৪-১৫ (সিলেট, খুলনা, চট্টগ্রাম, টাঙ্গাইল, বরিশাল, রাজশাহী ও রংপুর জেলা); জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদন; সংযুক্ত তহবিল প্রাপ্তি; অর্থনৈতিক সমীক্ষা; মঞ্জুরি ও বরাদ্দের দাবিসমূহ (অনুন্নয়ন ও উন্নয়ন), মঞ্জুরি ও বরাদ্দের দাবিসমূহ (উন্নয়ন); এবং মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো ওয়েবসাইটে প্রকাশসহ জাতীয় সংসদ হতে সরবরাহ করা হবে। একই সঙ্গে পরিকল্পনা কমিশন প্রণীত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি : ২০১৪-১৫-এর একটি দলিল এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ প্রণীত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্যাবলী : ২০১৩-১৪ জাতীয় সংসদে পেশ করা হবে।
অর্থ বিভাগের ওয়েবসাইট www.mof.gov.bd থেকে বাজেটের সকল তথ্যাদি ও গুরুত্বপূর্ণ দলিল যে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পাঠ ও ডাউনলোড করতে পারবেন এবং দেশ বা বিদেশ থেকে ওই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ফিডব্যাক ফরম পূরণ করে বাজেট সম্পর্কে মতামত ও সুপারিশ প্রেরণ করা যাবে। ব্যাপকভিত্তিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারি ওয়েবসাইট লিংক www.bangladesh.gov.bd, www.nbr-bd.org, www.plancomm.gov.bd, www.imed.gov.bd, www.bdpressinform.org, www.pmo.gov.bd ঠিকানায় বাজেট সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যাবে। বাজেট উপস্থাপনের পরদিন অর্থাত্ ৬ জুন শুক্রবার বিকাল ৪টায় ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বাজেটোত্তর সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত থাকবেন অর্থমন্ত্রী।