সরকারি কলেজের শিক্ষকদের রাজধানী-প্রীতি
প্রকাশ : ০৬ জুন ২০১৪, ২১:১০
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রারম্ভিককালে দেশে সরকারি স্কুল ও কলেজের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। রাজধানীর বাহিরে বিভাগীয় ও জেলা সদর ছাড়া থানা পর্যায়ে সরকারি বিদ্যালয়-মহাবিদ্যালয় ছিল না বলিলেই চলে। পাকিস্তান আমলে হাইস্কুল ও কলেজ তো দূরের কথা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের চাকুরীও সরকারি ছিল না। সময়ের ব্যবধানে দেশে স্কুল ও কলেজের সংখ্যা যেমন বাড়িয়াছে, তেমনই বহুগুণে বাড়িয়াছে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুপাত। প্রতিটি জেলা সদরে এক বা একাধিক গভঃ স্কুল ও কলেজ তো আছেই, উপজেলা পর্যায়েও এখন সরকারি বিদ্যালয় হইয়াছে। সম্প্রসারিত হইয়াছে এই সব কলেজের শিক্ষা কার্যক্রমও। ডিগ্রী কোর্স ছাড়াও একাধিক বিষয়ে অনার্স চালু রহিয়াছে অনেক কলেজে। কিন্তু, সমস্যা দেখা দিয়াছে শিক্ষক শূন্যতার। রাজধানী ঢাকা এবং বাইরের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কলেজসমূহের মধ্যে শিক্ষক সংখ্যার ক্ষেত্রে ব্যবধান আসমান-জমিন। ঢাকার প্রায় প্রতিটি কলেজে শিক্ষকের আধিক্য; উপচাইয়া পড়িবার অবস্থা। পক্ষান্তরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কলেজসমূহে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নাই। পদ শূন্য পড়িয়া আছে। সম্প্রতি দৈনিক ইত্তেফাকে এই বিষয়ে প্রকাশিত হইয়াছে তথ্যসমৃদ্ধ সিরিজ রিপোর্ট। আলোচ্য প্রতিবেদনে অসঙ্গতির যে চিত্র তুলিয়া ধরা হইয়াছে তাহাতে বিচলিতবোধ না করিয়া পারা যায় না। গ্রাম-মফস্বলে এমন অনেক সরকারি কলেজ আছে যেখানে অনার্স কোর্স চালু থাকিলেও কোনো শিক্ষক নাই। শিক্ষক দেওয়া হইয়াছিল কিন্তু অচিরাত্ বদলি করিয়া ঢাকায় কিংবা বিভাগীয় শহরের কোনো কলেজে সংযুক্ত করিয়া দেওয়া হইয়াছে। অনেক শিক্ষককে মফস্বলের কলেজ হইতে তুলিয়া আনিয়া বসাইয়া দেওয়া হইয়াছে শিক্ষা বিভাগের কোনো না কোনো প্রকল্পে। ফলে কলেজে শিক্ষকশূন্যতা অনিবার্য হইয়া পড়িয়াছে। এই পরিস্থিতিকে আমরা কি বলিব—বৈষম্য; বিশৃঙ্খলা নাকি স্বেচ্ছাচারিতা?
মফস্বল কলেজের শিক্ষকগণের মধ্যে যাহারা বদলি হইয়া আসেন এবং যাহারা বদলির আদেশ দেন তাহাদের ছলের অভাব নাই। কলেজ শিক্ষকদের পোস্টিং, বদলি ইত্যাদি প্রশাসনিক দায়িত্ব মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা দপ্তরের। কিন্তু এই দপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলিয়াছেন, সংযুক্তকরণ (অর্থাত্ পদ না থাকা সত্ত্বেও কোনো কলেজে যুক্ত করা। ইহাকে বোধহয় ডেপুটেশনও বলা হইয়া থাকে।) হইয়া থাকে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে। এই বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ বাহুল্যমাত্র। মফস্বল কলেজ হইতে দৌড়-ঝাঁপ করিয়া ‘তিলোত্তমা’ ঢাকার কোনো না কোনো কলেজে—অতিরিক্ত হিসাবে যাহারা সংযুক্ত হন বা হইয়াছেন, তাহারা যে বাতাসে ভাসিয়া আসেন নাই, সে কথা বলিবার অপেক্ষা রাখে না। গৈ-গেরাম হইতে সপ্রতিভ সুশিক্ষিত মানুষ গড়িবার কারিগরদের উদ্ধার করিয়া ‘সব পাওয়ার’ রাজধানীতে যাহারা ডাম্প করেন, বিলক্ষণ তাহারাও জানেন কোন্ মন্ত্রবলে এইরূপ ‘মহতি’ কর্ম সম্পাদিত হইয়া যাইতেছে।
আমরা দিনের পর দিন অভিযোগ করিয়া চলিয়াছি যে, চিকিত্সকগণ মফস্বলে যাইতে চাহেন না, থাকিতে চাহেন না। তাহারা বড় বেশি বিবেকহীন। কিন্তু যে শিক্ষকরা উপজেলা বা জেলা পর্যায়ের কলেজে থাকিতে চাহেন না, তাহাদের আমরা কী বলিব? এক শ্রেণির শিক্ষক যেমন মফস্বলে থাকিতে চাহেন না, তেমনি করিয়া সরকারের অন্য সকল বিভাগের কর্মকর্তাগণ যদি থাকিতে না চাহেন—তাহা হইলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াইতে পারে তাহা সহজেই অনুমেয়। এই অবস্থাটি কোনোমতে, কোনো যুক্তিতেই মানিয়া নেওয়া যায় না। সরকারি কলেজের শিক্ষকগণের চাকুরী বদলিযোগ্য। কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনে দেশের যে কোনো জায়গায় তাহাদের পোস্টিং দিতে পারেন। এই শর্ত মানিয়াই তাহারা চাকুরীতে যোগদান করেন। সেই শর্ত তাহারা ভঙ্গ করিতে পারেন না। শহর ও গ্রামের মধ্যকার বৈষম্য কমাইয়া আনিবার জন্য কাগজে-কলমে প্রয়াস-প্রচেষ্টার অন্ত নাই। কিন্তু এক শ্রেণির শিক্ষিত লোকের মনের মধ্যে বৈষম্যের বোধ যেন বা সদাসক্রিয় নির্ঘুম দৈত্যের মত। এই দৈত্যটাকে জব্দ ও নিষ্ক্রিয় করিতে হইবে। দেশের প্রতিটি সরকারি মহাবিদ্যালয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক থাকিবে—ইহা নিশ্চিত করিবার দায়িত্ব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। প্রয়োজনের তুলনায় মোট শিক্ষকের সংখ্যা কম। এই বাস্তবতা মানিয়া লইয়াও আমরা বলিব, বর্তমানে শিক্ষক যত আছেন, তাহাদেরই বিভিন্ন কলেজে প্রয়োজন অনুযায়ী এবং আনুপাতিক হারে পোস্টিং দিতে হইবে। অতঃপর গ্রাম হইতে তাহাদের আবার ঢাকায় নিয়া আসিবার ফাঁক-ফোকরগুলিও বন্ধ করিতে হইবে।