চিকিত্সাখাতের হালহকিকত
প্রকাশ : ০৭ জুন ২০১৪, ২১:৩০
যদিও বর্তমান অর্থ-বত্সরে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়ানো হইতেছে, পত্রিকান্তরে খবর প্রকাশিত হইয়াছে যে, রাজধানীসহ সমগ্র দেশে ছড়াইয়া থাকা কমপক্ষে ৮ হাজার প্রাইভেট হাসপাতাল-ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে স্বাস্থ্য অধিদফতরের তদারকি নাই, কিংবা নামেমাত্র আছে। বেসরকারি চিকিত্সা কাঠামো পরিচালনায় ৩২ বত্সর পূর্বে প্রণীত অধ্যাদেশ বহুকাল আগেই কার্যকারিতা হারাইয়াছে। ওই আইনের প্রয়োগ প্রক্রিয়ায়ও রহিয়াছে অনেক অসঙ্গতি। ফলত নূতন আইনের অভাবে যাচ্ছেতাইভাবে চলিতেছে বেসরকারি চিকিত্সা প্রতিষ্ঠানগুলি। তাহারা সেবামূল্যও নির্ধারণ করিতেছে নিজেদের খেয়ালখুশি অনুযায়ী। ফলে এইসব প্রতিষ্ঠানে চিকিত্সায় অত্যধিক ব্যয়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছেন সেবাপ্রার্থীরা। অনেক ক্ষেত্রে টাকা ব্যয় করিয়াও মিলিতেছে না উন্নতমানের সেবা। বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে ১০ শতাংশ শয্যা গরিবদের জন্য বিনামূল্যে বরাদ্দ রাখিবার বিধান থাকিলেও তাহা কেহ মানিতেছে না, আর দরিদ্র রুগীরা হয়তো এই খবর জানেই না। চিকিত্সকের কনসালটেন্সি ফি, প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার ফি, অপারেশন চার্জ, বেড ও কেবিনের দৈনিক ভাড়া, পথ্য ও খাবারের চার্জ সরকারি বিধি দ্বারা নির্ধারণ করিবারও বন্দোবস্ত হইতেছে না। এই অবস্থায় বেশ কয়েক বত্সর পূর্বে ‘বেসরকারি চিকিত্সাসেবা আইন’ শিরোনামে নূতন একটি আইন করিবার উদ্যোগ নিয়াছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ওই আইনের খসড়াটিও মন্ত্রণালয়ে পড়িয়া আছে বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া।
ইহা তো গেল স্বাস্থ্যখাতের একদিকের চিত্র। বেসরকারি খাতে সেবার তুলনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে যেকোনো প্রকারে বেপরোয়া ব্যবসার এই চিত্রের পাশাপাশি সরকারি খাতের দিকে তাকাইলেও আশান্বিত হইবার কারণ ঘটিবে না, সেইখানে কেবল শূন্যতা আর হাহাকার। জেলা, উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ের হাসপাতালগুলিতে নজর দিলে দেখা যাইবে পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও আধুনিক যন্ত্রপাতি নাই, আর তাহা থাকিলেও চালাইবার মতো টেকনিশিয়ান ও ডাক্তার নাই, কিংবা তাহারা কর্মস্থলে দিনের পর দিন অনুপস্থিত থাকিতেছেন। প্রয়োজনীয় ঔষধপত্রের সরবরাহও নাই। সব মিলাইয়া, চিকিত্সা লইতে গিয়া অনেক রুগীই ভোগান্তির একশেষ হইবার স্মৃতি বুকে নিয়া ফিরিয়া আসেন। আবার মেডিক্যাল কলেজগুলিতেও বিশৃঙ্খলা আজকাল চরমে উঠিয়াছে। ধর্মঘট, অবরোধ ও অবহেলা সেখানে নিত্যদিনের ঘটনা হইয়া উঠিয়াছে। এই অবস্থায় রুগীদেরকে নিরুপায় হইয়াই বেশি অর্থ খরচ করিয়া বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক-রোগ নির্ণয় কেন্দ্রের দ্বারস্থ হইতে হয়। যদিও আমরা জানি স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া একটি রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার; অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রেই চিকিত্সার মান বাড়িয়াছে, মানুষের জীবনমানও বাড়িয়াছে। কিন্তু, চিকিত্সা খাতের অরাজক অবস্থা কাটিতেছে না, ফলে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানিও কমিতেছে না।
বেসরকারি খাতের চিকিত্সা সেবার মাননির্ধারণ করিতে এবং সেবাপ্রার্থীদের বঞ্চনা ঘুচাইতে হইলে সরকারের পক্ষ হইতে কার্যকর তদারকির ব্যবস্থা করিতে হইবে। আর তাহার জন্য উপযুক্ত সংশোধনীসহ আইন প্রণয়ন ও তাহা প্রয়োগের বন্দোবস্ত করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে প্রয়োজন সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা। এইক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতাল, ফাউন্ডেশন, ক্লিনিক ও মেডিক্যাল কলেজগুলিকেই সকলের আগে আগাইয়া আসিতে হইবে। প্রত্যন্ত ইউনিয়ন পর্যায় হইতে বিভাগীয় শহরগুলির সরকারি চিকিত্সাসেবা প্রতিষ্ঠানগুলিতে যদি সেইগুলির সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ সেবার নিশ্চয়তা তৈরি করা যায় তাহা হইলে বেসরকারি খাতের অরাজকতা ও দৌরাত্ম্য আপনাআপনিই অনেকখানি কমিয়া আসিবে।