বিশ্বকাপ ফুটবল : ভবিষ্যদ্বাণীর ভালো মন্দ
প্রকাশ : ০৭ জুন ২০১৪, ২১:৩১
আগামীতে কী ঘটিবে তাহা আগেভাগে জানিবার মধ্যে প্রবল উত্তেজনা আছে বৈকি। জ্যোতিষবিদ্যা তথা অ্যাস্ট্রলজি এই কারণে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় সেই প্রাচীন কাল হইতেই। এই বিশ্বের সর্বাধিক জনপ্রিয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতার নাম বিশ্বকাপ ফুটবল। সুতরাং ইহাকে লইয়াও ভবিষ্যদ্বাণী করিবার উন্মাদনা থাকিবে, তাহাতে আশ্চর্যের কিছু নাই। সেই উন্মাদনা গননচুম্বী হইতে পারে যদি সত্যিই কাহারও ভবিষ্যদ্বাণীর সিংহভাগই মিলিয়া যায়। গত বিশ্বকাপে পল নামের একটি অক্টোপাস এই কারণেই সুপার হিরো হইয়া উঠিয়াছিল। এইবারও যে এইরূপ ‘পল’দের ভবিষ্যতবাণী লইয়া অদম্য কৌতুহল থাকিবে এবং পয়লাতেই তাহারা সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করিলে যে বাজিকরদের কাছে হীরার টুকরা হইয়া উঠিবে, তাহাতে সন্দেহ নাই।
প্রশ্ন উঠিতেই পারে, একটি অক্টোপাস বা হাতি বা পান্ডা বা টিয়া কী করিয়া বুঝিবে খেলার জয়-পরাজয়ের বিষয়টি? যেই তুলনামূলক সাধারণ নিয়মে তাহাদের দ্বারা জয়-পরাজয়টা বুঝিয়া লইবার চেষ্টা থাকে, তাহার কোনো অর্থ কি ওই প্রাণীরা বুঝিতে পারে? ধরা যাক, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার কোনো প্রবল উত্তেজনার ম্যাচের ভবিষ্যদ্বাণী করিবার জন্য একটি কথিত জ্যোতিষ প্রাণীকে বাছিয়া লওয়া হইল। ওই দুই দেশের পতাকা রাখা ঘরে তাহার জন্য একই ধরনের খাবার রাখা হইল। প্রাণীটি যেই দেশের পতাকা-রাখা ঘর হইতে খাবার গ্রহণ করিবে সেই দেশটিই আসন্ন ফুটবল ম্যাচে জয়লাভ করিবে। প্রথম কথা হইল, প্রাণীটি যদি ব্রাজিলের পতাকার রঙ বা কারুকাজ আর্জেন্টিনা অপেক্ষা অধিক পছন্দ করে, তবে সেইদিকে ঝুঁকিতে পারে বৈকি। ২০০৮-এর ইউরো কাপ ও ২০১০ সালের বিশ্বকাপে অক্টোপাস পল সব মিলাইয়া এগারো বার জার্মানির পতাকার ঘরটি হইতে তাহার খাবার পছন্দ করিয়াছিল। হয়তো জার্মানির পতাকার রঙ পলের ভালো লাগিয়াছিল। কিন্তু সেই এগারো বারের দুইবার জার্মানি জয়ী হইতে পারে নাই। পল কেন ওই দুই ক্ষেত্রে সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করিতে পারে নাই, সেই প্রশ্নের বিপরীতে, যাহারা এই জাতীয় ভবিষ্যদ্বাণীর অনুরাগী, তাহারা মনে করেন—নয়টাই যে করিতে পারিয়াছে, তাহা কম কীসে? সমালোচকরা অবশ্য ইহাও বলিয়া থাকেন, ওই পতাকার অর্থ কী? ফুটবল কি বোঝে ওইসব অবলা প্রাণী? তাহাদের কাছে মনুষ্যসৃষ্ট যত প্রকার আকার ও নিরাকার কাণ্ড-কারখানা রহিয়াছে, তাহার সবকিছুই অবোধ্য, ফুটবলও তাহার বাহিরে নহে। ২০১০ সালেই পলের পাশাপাশি সিঙ্গাপুরের একটি টিয়া পাখি ভবিষ্যদ্বাণী করিয়া খ্যাতি পাইয়াছিল। পাখিটি ওই বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের চারটি ম্যাচেরই সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিল। তাহা দেখিয়া কোনো জুয়াড়ি যদি সেমিফাইনাল ও ফাইনালে ওই টিয়ার ভবিষ্যদ্বাণী অনুসরণ করিয়া বড় বাজি ধরে, তবে তাহার নিশ্চিত ভরাডুবি ঘটিয়াছে। কেননা, পরবর্তী তিনটি ম্যাচের দুইটিই সে ভুল ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিল। এইবারও পলের উত্তরসূরি হিসাবে জ্যোতিষগিরির মঞ্চে আবির্ভূত হইতেছে জার্মানের হাতি নেলি, চীনে পান্ডার দল, ব্রাজিলে কচ্ছপ, পোল্যান্ডে ‘ফ্রেড’ নামের একটি বেজী, কানাডায় ‘ম্যাগি’ নামের বানর এবং ‘লাজডেইকা’ নামের একটি কাঁকড়া। ব্রাজিলের কচ্ছপ প্রথম ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ লইয়া। ‘তামার’ নামের কচ্ছপটি যে জলের ট্যাঙ্কে থাকে, সেইখানে ব্রাজুকা (বিশ্বকাপের বল) রাখিয়া ক্রোয়েশিয়া আর ব্রাজিলের পতাকা রাখা হইয়াছিল। তামার ব্রাজিলের পতাকার দিকে বেশ খানিকটা অগ্রসর হইয়াও শেষ অবধি পতাকাটি স্পর্শ করে নাই। কচ্ছপটির ভবিষ্যদ্বাণী সঠিক প্রমাণ হইলে ব্রাজিল বনাম ক্রোয়েশিয়ার ম্যাচটি ড্র হইবে। আরও স্পষ্ট হইবে যদি ব্রাজিল প্রথম দিকে গোলে আগাইয়া যাইবার পরও ম্যাচটি ড্র হয়।
এই ভবিষ্যদ্বাণী হইল ফিফটি-ফিফটি। তাহা দশবারে আটবারই মিলিয়া যাইতে পারে। এবং বিরল কয়েকটি ক্ষেত্রে দশবারও মিলিতে পারে। গণিত-বিজ্ঞান ইহাতে বিস্ময়ের কিছু দেখে না। মানুষ চিরকালই বিস্ময়ের পূজারি। যেইখানে বিস্ময় ও অজানা আগেভাগে জানিবার সামান্য গন্ধও পায় মানুষ, সেইখানেই যুক্তি শিকায় তুলিয়া ছুটিয়া যায়। ইহাও সত্য যে, এইরূপ প্রাণী-জ্যোতিষীরা বিশ্বকাপের বিনোদনের মাত্রাকে আরও বাড়াইয়া দেয়। নিপাট আনন্দ বিনোদনের নিরিখে তাহা দোষণীয় কিছু নহে।