আরও একটি মৃত্যু, আরও একটি নক্ষত্রের পতন
প্রকাশ : ০৭ জুন ২০১৪, ২১:৩১
মাহবুবুল আলম আর নেই। ৬ জুন শুক্রবার তিনি ঢাকার বারডেম হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন (ইন্নালিল্লাহে ... রাজেউন)। তার শেষ পরিচয় তিনি ঢাকার ইংরেজি দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্টের সম্পাদক ছিলেন। মাত্র কিছুদিন আগে এই সম্পাদনার দায়িত্ব থেকে অবসর নেন। তিনি একটি ইংরেজি কাগজের সম্পাদক ছিলেন এই একটি পরিচয় দেয়া হলে তার প্রতি অন্যায় করা হবে। এই বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মানুষটিকে একটি পরিচয়ে চিহ্নিত করা যাবে না। সাংবাদিক, কূটনীতিক, রাজনীতিক, প্রশাসক কোন্ পরিচয়ে তাকে আখ্যাত করবো তা আমি ভেবে পাই না।
আমার সবচাইতে বড় গর্ব আমি তার বন্ধুত্ব অর্জনে সক্ষম হয়েছিলাম। দু’জনেরই শেষ বয়সে এই বন্ধুত্ব আরো দৃঢ় হয়েছিল। এই কিছুদিন আগে ডেইলি ইন্ডিপেন্ডেন্টের সম্পাদনার দায়িত্ব থেকে অবসর নেয়ার পর তিনি যখন আমেরিকায় যাচ্ছিলেন, তখন আমার লন্ডনের বাসায় তার এক মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে এসে হাজির হয়েছিলেন। অনেকক্ষণ ধরে তার সঙ্গে দেশের রাজনীতি, সাংবাদিকতা, বাংলাদেশে ইংরেজি সাংবাদিকতার ভবিষ্যত্ ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করেছি। সেই আমাদের শেষ দেখা। তখন ভাবতে পারিনি আমার চাইতে দু’বছরের ছোট (তার বয়স হয়েছিল ৭৮, আমার ৮০) এবং দেখতে শুনতে অনেক সুস্থ ও সুদর্শন মানুষটি আমার আগেই চলে যাবেন।
৬ জুন তারিখেই ঢাকা থেকে খবরটা যখন পেয়েছি, তখন বুকের মধ্যে শোকের একটা আর্তস্বর শুনেছি—“একে একে নিভিছে দেউটি”। এক এক করে আমার সাংবাদিক বন্ধু এবং পরিচিতজন অধিকাংশই চলে গেছেন। আমি এখনো বেঁচে আছি। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘দীর্ঘ আয়ু দীর্ঘ অভিশাপ’। সেই অভিশাপ নিজেও বহন করে প্রয়াত বন্ধুদের একের পর এক ‘অবিচুয়ারি’ লিখে যাচ্ছি। নিজের ‘অবিচুয়ারিটাও’ লিখে রাখবো কিনা তাই ভাবছি।
মাহবুবুল আলমের সঙ্গে আমার পরিচয় পঞ্চাশের দশকের মধ্যভাগে। সাংবাদিক হিসেবেই তার সঙ্গে আমার পরিচয়। যদিও শুধু সাংবাদিকতা নয়, নানা পেশার উচ্চ শাখায় তিনি অবাধে বিচরণ করেছেন এবং দক্ষতার ছাপ রেখেছেন। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা ছিল পাকিস্তান আমলে এপিপি বা এসোসিয়েটেড প্রেস অব পাকিস্তান। তার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। আবার স্বাধীনতার পর বাসস’র চীফ এডিটর এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টর হয়েছিলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রকের এক্সটার্নাল পাবলিসিটি ডিপার্টমেন্টের ডাইরেক্টর জেনারেল হয়েছিলেন। ইংরেজি দৈনিক নিউনেশন ও সাপ্তাহিক ডায়ালগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সংবাদপত্র মালিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।
লন্ডনে ও ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রেস মিনিস্টারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ভুটানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু তার চাকরি জীবনের সবচাইতে বড় গর্ব ছিল, তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রীত্বের দায়িত্ব গ্রহণের সময়ে কিছুকালের জন্য বঙ্গবন্ধুর প্রেস সেক্রেটারির পদটিতে কাজ করেছেন।
আমি আগেই লিখেছি, তার সঙ্গে আমার পরিচয় পঞ্চাশের দশকের মধ্যভাগে সাংবাদিক হিসেবে। আমরা দু’জনেই তখন সাংবাদিক, আমি দৈনিক ইত্তেফাকে কাজ করি। তিনি তখন অধুনালুপ্ত দৈনিক ইত্তেহাদের চিফ রিপোর্টার। ইত্তেহাদের সম্পাদক ছিলেন কাজী মোহাম্মদ ইদরিস এবং বার্তা সম্পাদক ছিলেন আমার চাচা বাহাউদ্দীন চৌধুরী, দৈনিক ইত্তেহাদ দেশভাগের আগে কলকাতা থেকে মুসলিম লীগের সোহরাওয়ার্দী গ্রুপের মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হতো। সম্পাদক ছিলেন আবুল মনসুর আহমদ। দেশভাগের কিছুকাল পর কাগজটি বন্ধ হয়ে যায়। পাকিস্তান আমলে পঞ্চাশের দশকের মধ্যভাগে (’৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের জয়লাভের পর) আওয়ামী লীগে সোহরাওয়ার্দীপন্থি ও ভাসানীপন্থিদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয় এবং ভাসানীপন্থিরা ইত্তেহাদ নামটি গ্রহণ করে নতুন দৈনিক প্রকাশ করেন।
তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং নিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে আওয়ামী লীগের সোহরাওয়ার্দীপন্থি ও ভাসানীপন্থিদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। ইত্তেহাদে প্রচণ্ড সমালোচনা করা হতো সোহরাওয়ার্দীপন্থিদের এবং ইত্তেফাক পত্রিকাকে। ইত্তেফাকে মানিক মিয়ার রাজনৈতিক মঞ্চ কলামের জবাব দেয়ার জন্য ইত্তেহাদে একটি কলাম প্রকাশ করা শুরু হয়। এটি ছদ্মনামে লিখতেন প্রয়াত সাংবাদিক ও সাহিত্যিক আবু জাফর শামসুদ্দীন।
এই সময়ের একটি ঘটনা। শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঢাকার সলিমুল্লাহ হলে এক ছাত্রসভায় বক্তৃতা দেন। সেখানে তিনি নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করেন এবং তার সরকারের পররাষ্ট্রনীতির যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। এই সভার রিপোর্ট ইত্তেফাক এবং ইত্তেহাদ দুই-ই কাগজেই প্রকাশিত হয়েছিল। তবে তুলনামূলকভাবে ইত্তেহাদের রিপোর্টটি ভালো হয়েছিল। ইত্তেহাদের রিপোর্টটি লিখেছিলেন মাহবুবুল আলম।
এই রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পরদিন মানিক মিয়া ঢাকায় প্রেসক্লাবের লাউঞ্জে বসে আছেন। মাহবুবুল আলমকে দেখে ডাক দিলেন। বললেন, আপনাদের কাগজে সাধারণত শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের খবর ভালোভাবে লেখা হয় না। কিন্তু এবার খুবই ভালোভাবে লেখা হয়েছে। খবরটি কে লিখেছে। মাহবুবুল আলম মাথা নিচু করে বললেন, আমি লিখেছি। মানিক মিয়া বিস্মিত হয়ে বলেছেন, ইত্তেহাদে এতো নিরপেক্ষ রিপোর্টিং কি করে করলেন? মাহবুবুল আলম তেমনি মাথা নিচু করে জবাব দিয়েছেন। মানিক ভাই, আমি সাংবাদিকতা করি, রাজনীতি করি না।” নিজের সম্পর্কে এই দাবিটি মাহবুবুল আলম অনেক সময় সত্য প্রমাণ করার চেষ্টা করে বিতর্কিত হয়েছেন। আবার এই বিতর্ক থেকে তিনি ঊর্ধ্বে উঠে এসেছেন।
দৈনিক ইত্তেহাদ কাগজটি বেশিদিন টেকেনি। এই দৈনিকের সম্পাদক কাজি মোহাম্মদ ইদরিস ছিলেন একজন উদার মনোভাবের সম্পাদক। কিন্তু একটু ভোলা মনের অধিকারীও ছিলেন। কোনো কথা ভুলে গিয়ে অকারণে ক্ষেপে উঠতেন, আবার সহজেই শান্ত হয়ে যেতেন। একদিন অফিসে এসে তিনি মহা হৈচৈ জুড়ে দিলেন। ‘দৈনিক আজাদে’ প্রকাশিত একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে। সেটি দৈনিক ইত্তেহাদে নেই। তিনি নিউজ এডিটর বাহাউদ্দীন চৌধুরীকে ডেকে এনে তার প্রতি উষ্মা প্রকাশ করলেন। বার্তা সম্পাদকতো লা জবাব। এই সময় চীফ রিপোর্টার মাহবুবুল আলম এসে হাজির। ইদরিস ভাই তাকে দেখেও কৈফিয়ত চাইলেন। মাহবুবুল আলম আজাদ পত্রিকায় চোখ বুলিয়েই বললেন, ইদরিস ভাই, এ খবর তো আমাদের কাগজে দু’দিন আগে ছাপা হয়ে গেছে। আপনি দেখেননি? ইদরিস ভাই এবার মন্ত্রশান্ত ভুজঙ্গ। তার সম্পর্কে এ ধরনের বহু গল্প মাহবুবুল আলমের মুখে শুনেছি।
মাহবুবুল আলম যখন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বল্পকালীন প্রেস সেক্রেটারি ছিলেন, তখনকার একটি ঘটনা। বঙ্গবন্ধু একদিন মাহবুবুল আলমকে ডেকে পাঠালেন। কাছে বসতে বললেন, জিজ্ঞাসা করলেন, আচ্ছা মাহবুব, তুমি কী মুক্তিযুদ্ধের সময় অধিকৃত ঢাকা বেতারে কোনো অনুষ্ঠান করেছো? মাহবুবুল আলম বললেন, জ্বি করেছি। বঙ্গবন্ধু বললেন, তোমার সম্পর্কে ছাত্রলীগের নেতারা (ছাত্রলীগ তখনো ভাগ হয়নি) অভিযোগ করছে। আমার কাছে দাবি জানিয়েছে, তোমাকে প্রেস সেক্রেটারি পদ থেকে সরিয়ে দিতে। মাহবুবুল আলম বললেন, তারা দাবি জানাতেই পারে, আমি মুজিবনগরে নানা কারণে চলে যেতে পারিনি। তারপর হানাদার বাহিনীর কথায় রাজি না হলে গুলি খেতে হতো। আমাকে একজন কাওয়ার্ড বলতে পারেন।
বঙ্গবন্ধু তার কথা শুনে স্মিত মুখে বলেছেন, না, কাওয়ার্ড বলবো না। হানাদারদের কথা না শুনলে তুমিও শহীদ হতে। ১৪ ডিসেম্বর যাদের হত্যা করা হয়েছে, তাদের নামের তালিকায় তোমার নাম যোগ হতো। মাহবুবুল আলম বলেছেন, তাদের অনেকেরও মুজিবনগরে চলে যাওয়ার সুযোগ ছিল। মুজিবনগর সরকার তাদের ডেকেছিলেনও। তারা যাননি। তাদের মধ্যে একজনতো হানাদার বাহিনীর নির্দেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ও ইংরেজি দুটো বিভাগের দায়িত্ব নিয়ে বিভাগ দুটো চালু রেখেছেন। তাদের সঙ্গে সহযোগিতা করেছেন।
বঙ্গবন্ধু বলেছেন, আমি জানি। তুমিও মরলে শহীদ হতে, এখন অভিযুক্ত হচ্ছো। তোমাকে আমি দোষ দেই না। তোমার সততা ও দেশপ্রেমেও অবিশ্বাস করি না। তবে ছাত্রনেতাদের ঠাণ্ডা রাখার জন্য আমার প্রেস সেক্রেটারি পদ থেকে তোমাকে সরিয়ে দেব। তুমি ভয় পেয়ো না। অন্য চাকরিতে যাও। আমার দোয়া রইলো। মাহবুবুল আলম বঙ্গবন্ধুর পা ছুঁয়ে সালাম করে বিদায় নিয়েছিলেন।
আমি লন্ডনে চলে আসার পর দীর্ঘকাল তার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত্ হয়নি। তবে টেলিফোনে মাঝে সাঝে কথা-বার্তা হতো। তিনি ঢাকা থেকে প্রকাশিত ডেইলি ইন্ডিপেন্ডেন্টের সম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়েছেন, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তথ্য উপদেষ্টা পদে যোগ দিয়েছিলেন, তাও জানতাম। এরপর তার প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে এলাম ডেইলি ইন্ডিপেন্ডেন্ট নব পর্যায়ে নব আঙ্গিকে বের হওয়ার পর।
একদিন টেলিফোনে আলাপ হওয়ার পর তিনি আমাকে ইংরেজিতে কলাম লেখা শুরু করার অনুরোধ জানালেন। বললেন, ইন্ডিপেন্ডেন্টে তিনি আমার কলাম নিয়মিত ছাপবেন। তাকে সবিনয়ে জানালাম, আমার ইংরেজি বিদ্যে ভালো নয়। দীর্ঘ চার দশক ইংল্যান্ডে আছি বটে, কিন্তু ইংরেজি চর্চা করিনি। বিদেশে বসেও বাংলা ভাষার চর্চা এবং বাংলায় সাংবাদিকতা করছি। মাহবুবুল আলম বললেন, আপনি লিখতে শুরু করুন। দেখবেন ইংরেজিতে লেখার হাত ঠিক হয়ে যাবে। আর আমরাতো আছি। লেখা দেখে-শুনে ছাপবো।
এই অনুরোধ জানানোর পরই তিনি ইন্ডিপেন্ডেন্ট-এর প্রথম পাতায় আমার লেখা ছাপানোর ঘোষণা দিলেন। আমি বাধ্য হয়ে লিখতে শুরু করলাম। তিনি তারপর ইন্ডিপেন্ডেন্ট-এর সম্পাদকের পদ থেকে অবসর নিয়েছেন। কিন্তু আমি এখনো লিখে চলেছি। হয়তো আমৃত্যু লিখবো।
‘ইন্ডিপেন্ডেন্টে’ লেখা শুরু করার পর একবার ঢাকায় গেছি। উঠেছি বনানীর ইস্টার্ন রেসিডেন্স হোটেলে। খবর পেয়ে তিনি এসে হাজির। কথা-বার্তার পর আমার হাতে একটা চেক গুঁজে দিলেন। চেয়ে দেখি এক লাখ টাকার চেক। বললেন, এটা আমাদের সম্মানী। এরপর মাসে মাসে টাকাতো পাবেনই। আমার সঙ্গে তার অত্যন্ত বিনয়ী ব্যবহারে বিস্মিত হয়েছি। তার অহঙ্কারী হওয়ার বহু কারণ ছিলো। কিন্তু কখনো তাকে অহঙ্কারী হতে দেখিনি। ঢাকায় যতোবার গেছি, তার আমন্ত্রণে ইন্ডিপেন্ডেন্ট অফিসে আমাকে যেতেই হতো। সকল স্টাফকে নিয়ে খাওয়া-দাওয়া। তারপর আড্ডা চলতো মধ্যরাত পর্যন্ত। যতোবার ঢাকায় গেছি, ততোবারই তার অফিসে তার সঙ্গে মিলিত হয়েছি, আড্ডা দিয়েছি।
এই মানুষটিও আজ চলে গেলেন। বুকের মধ্যে একটা শূন্যতা অনুভব করছি। এই কিছুদিন আগে আমেরিকায় যাওয়ার আগে শেষ সাক্ষাতের সময় বলেছিলেন, ঢাকায় এলে এবার বাসায় আসবেন, বাসায় বসে আড্ডা দেয়া যাবে। ঢাকায় আবার যাব, তার দেখা আর পাব না। তার পরিবার-পরিজনকে কী সান্ত্বনা জানাব, নিজেই সান্ত্বনা পাচ্ছি না। তবু বিদেশে বসে তাদের সমবেদনা জানাই। আমাদের সাংবাদিকতার আকাশ থেকে নক্ষত্রের পর নক্ষত্র ঝরে পড়ছে। তাদের শূন্যস্থান পূরণ হবে কবে এবং কোনোদিন হবে কি?
\ লন্ডন, ৭ জুন শনিবার, ২০১৪ \