ফরমালিনের
সাতকাহন
প্রকাশ : ০৭ জুন ২০১৪, ২১:৩১
ছোটবেলায় স্কুলের ল্যাবরেটরি রুমের সামনে থেকে ঘুর ঘুর করতাম ভেতরের কাঁচের বড় বড় জার গুলো দেখার জন্য। স্বচ্ছ তরলের মধ্যে বিভিন্ন প্রাণীর মৃতদেহগুলো দিনের পর দিন ডুবানো রয়েছে দেখতে বেশ ভালই লাগত। তবে ভালো লাগার চেয়ে কৌতূহলটা বেশি ছিল। মৃত দেহগুলো কীভাবে এমন অক্ষত রাখা সম্ভব! পরে আমাদের সিনিয়রদের নিকট থেকে জানলাম, ওগুলো ফরমালিনের মধ্যে ডুবানো আছে বলেই কখনো পচবে না। মাঝে-মধ্যে অবশ্য তরলটার নাম ভুলে যেতাম। কারণ তখন ফরমালিনের এত ব্যবহার ছিল না। বিজ্ঞানের ছাত্র ছাড়া অনেকে ফরমালিন শব্দটা খুব একটা জানতো না। এখন আমাদের দেশে ফরমালিনের নাম জানতে বিজ্ঞান বিষয়ে পড়তে হয় না এমনকি স্কুল-কলেজে যেতে হয় না; মাছের বাজার বা ফলের বাজারে গেলেই চলে। বর্তমানে ফরমালিন এক আতঙ্কের নাম।
ফরমালিনের রাসায়নিক নাম ফরমালডিহাইড। রাসায়নিক সংকেত হল (HCHO)। ১৮৬৭ সালে জার্মান কেমিস্ট আগস্ট উইলিয়াম ভন হুফম্যান ফরমালডিহাইড আবিষ্কার করেন। জীববিজ্ঞানসহ বিভিন্ন প্যাথলজিক্যাল গবেষণায় ফরমালডিহাইড-এর ব্যবহারের বিকল্প নেই। বলা যায়, বিজ্ঞানের অন্যান্য আশীর্বাদের মধ্যে ফরমালডিহাইড একটি। ইদানীং বাংলাদেশে এর বহুবিদ ব্যবহারের কারণে ফরমালিন একটি অভিশপ্ত রাসায়নিক পদার্থ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এ জন্য আবিষ্কারক বা ফরমালিন নিজে দায়ী নয়, দায়ী আমাদের দেশের অসাধু প্রয়োগকারী। যারা বৈষয়িক কারণে নিজের জীবন ও অস্তিত্বের চেয়ে ব্যবসায়িক পণ্যের অস্তিত্বের গুরুত্ব অধিকতর বেশি মনে করেন।
হালে অসাধু ব্যবসায়ীদের থেকে ফরমালিন রাজনীতিতে প্রবেশ করেছে। এতে ফরমালিনের ব্যবহার আরো ব্যাপকতা পেয়েছে। এর ফলে সর্বমহলে আতঙ্ক অনেকটা বেড়েছে। তবে ফরমালিন রাজনীতিতে মিশে যতটা না আতঙ্ক তৈরি করেছে তার চেয়ে বেশি আতঙ্কিত করেছে শিক্ষাব্যবস্থাপনায় মিশে গিয়ে। খাদ্যে ফরমালিন মিশে গেলে তার প্রতিকার সম্ভব কিন্তু মগজে, মেধায়, চিন্তায়, মননে ফরমালিন মিশে গেলে তার প্রতিকার কোন ক্রমেই সম্ভব নয়। শিক্ষায় ফরমালিনের প্রথম ব্যবহার শুরু হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি ও সর্বশেষ শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায়। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন সচেতন মহল। সকল নীরবতা ভেঙ্গে বিজ্ঞানী ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল স্যার সরব হয়েছেন। তিনি বোধ হয় বুঝতে পেরেছেন ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে কোন কুচক্রী মহল বিলীন করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। অর্জিত স্বাধীনতাকে বিপন্ন করার জন্য হয়তোবা মেধাহীন একটি জাতি তৈরি করার জন্য একটি নীলনকশা এঁকেছে। তারা জানে, ফরমালিন সংস্কৃতির শিক্ষায় শিক্ষিত একটি জাতি কী করে জানবে প্রকৃত ফরমালিনের কুফল সম্পর্কে? নানা হিংসা, বিদ্বেষ, আত্মকলহ, দুর্নীতিপরায়ণতা, স্বার্থ-পরতা ইত্যাদি নিয়ে নিজেরা নিজেদের অনিবার্য ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাবে। পরাধীনতার শৃঙ্খল নিজেরাই নিজেদের পায়ে পরিয়ে নিবে।
সুতরাং করজোড়ে মিনতি করি, দোহাই আর যাই হোক শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি না করি। শিক্ষাব্যবস্থাকে ফরমালিন মুক্ত রাখি।শিক্ষাব্যবস্থায় ফরমালিনযুক্ত হলে আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা একেবারেই অসম্ভব। দয়া করে আত্মবিনাশী খেলা বন্ধ করুন।
লেখক :অধ্যক্ষ, ন্যাশনাল কলেজ, বাড্ডা, ঢাকা-১২১২
e-mail: niru_nc@yahoo.com