পঞ্চাশত্তমী দিবস

সকলের জীবনেই হোক আত্মিক শক্তির উদ্বোধন

আজ পঞ্চাশত্তমী পর্বদিন, খৃষ্ট ধর্মাবলম্বীদের জন্য আধ্যাত্মিক চেতনায় ঋদ্ধ এদিন। পুরাতন নিয়মের কালে ইস্রায়েল জাতির দু’টি ঐতিহাসিক ঘটনা ও উত্সবের সূত্রে গাঁথা মহত্ ঘটনার এক স্মরণোত্সব আজ। যিরূশালেমে প্রার্থনারত খৃষ্টের প্রথম শিষ্যদের উপরে ঐদিন ঈশ্বরের আত্মা অর্থাত্ পবিত্র আত্মার অবতরণ হয় এবং মহা এক অলৌকিক ঘটনা ঘটে। পুরাতন নিয়মে পঞ্চাশত্তমী পর্ব ছিল ইস্রায়েল জাতির একটি কৃষিভিত্তিক পর্ব। বাইবেলের পুরাতন নিয়ম অনুসারে অতীতকালে যিহুদীরা এদিনে মোশির মাধ্যমে তারা যে ঈশ্বরের বিধান পেয়েছিল তা স্মরণ করত, ক্ষেত-খামারের নতুন ফল-ফসল ও শস্য উত্সর্গ করত ও ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাত। এ বিশেষ দিনে তাদের ঐ নবান্ন উত্সবের ঘটনাবলী চূড়ান্ত হতো। ঐ সময়ে লোকেরা ঈশ্বরের কাছে উত্সর্গ করার মাধ্যমে গাছের চারা রোপণও করত। কিন্তু খৃষ্টের প্রথম শিষ্যরা ঐসব অনুষ্ঠান পালনের দিনে লাভ করলেন সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক একটা অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা, পবিত্র আত্মায় তারা হলেন অবগাহিত, লাভ করলেন ঐশ্বরিক এক শক্তি ও সত্সাহস। ফলে তারা মানুষের কাছে প্রচার করেন যীশুখৃষ্টের সুসমাচার, সাধন করেন অনেক অলৌকিক কাজ। পঞ্চাশত্তমীর সে দিনের অলৌকিক ঘটনার বর্ণনা আছে নতুন নিয়মে প্রেরিতদের কার্যবিবরণ পুস্তকের দ্বিতীয় অধ্যায়ে। বিস্তারিত আলোচনা না করে ক্ষুদ্র এ লেখায় আমাদের বাস্তব জীবনে এদিনের গুরুত্ব নিয়ে কিছু কথা বলছি। পুরনো শস্য উত্সব পর্বে শিষ্যদের জীবনে নতুন আত্মিক ও নৈতিক শক্তি ঈশ্বর দিয়েছিলেন যেন তাদের জীবন ও চিন্তা-চেতনার পরিবর্তন হয় এবং সে পরিবর্তন যেন ছড়িয়ে যায় অন্যের জীবনেও। জরাজীর্ণতার ঊর্ধ্বে সেদিন শিষ্যগণ উঠেছিলেন, নতুন জীবনের আহ্বান তারা নিজেরা যেমন পেয়েছিলেন, অন্যকেও তা দিতে পেরেছিলেন। তারা শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক রোগগ্রস্ত মানুষকে সুস্থতাদানের কাজসহ অন্যান্য অনেক আশ্চর্য কাজ করেছিলেন। আজ জগতে অনাত্মিকতা ও অনৈতিকতার ফলে গোটা মানব সমাজ আক্রান্ত। মানব সমাজের যত সমস্যা তার মূলে আছে এ মানসিকতা ও অনাত্মিকতা। তাই তার সমাধানকে হতে হবে আত্মিক ও নৈতিকতার শক্তিতে ও পথে। পুরাতন নিয়মে যে উত্সব ছিল শস্য-উত্সর্গের সমাপ্তি-পর্ব, খৃষ্টের অনুসারীদের জন্য তা হয়েছিল প্রেম ও ভ্রাতৃত্বের নতুন মানবতার মহোত্সবের সূচনা। আজ আমাদের কাছে তার আবেদন ঈশ্বরের আত্মিক শক্তিতে মন-প্রাণ নতুন করে অন্যকে ভালবাসা ও শ্রদ্ধা করার। যিনি একমাত্র শাশ্বত ও অবিকৃত সত্যময় সত্তা সেই ঈশ্বরের প্রেরণা ও স্পর্শ ছাড়া আমরা কোনো সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারি না, পারি না জরাজীর্ণতা, সংকীর্ণতা ও মানসিকতার ঊর্ধ্বে। দিকে দিকে হিংসা ও প্রতিহিংসার হলাহল। ক্ষমতামদমত্ত লোভে দিগ্বিদিক জ্ঞানহীন কিছু মানবরূপী দানবের আজ দুর্বল মানুষের জীবনের যেন কোনো মূল্যই নেই। সমাজদেহে দিন দিন যে অন্যায়, হিংসা ও জীঘাংসার ক্ষত তৈরি হয়ে চলেছে তা সারানোর একমাত্র উপায় মানুষের হূদয়ে প্রকৃত মনুষ্যত্বের উন্মোচন ও উদ্বোধন। তাতেই মানুষ সকল সংকীর্ণতা, হিংসা ও পাপের পংকিলতার ঊর্ধ্বে উঠে নিজের মত অন্যকে সম্মান করতে পারে, পারে ভালবাসতে। তবে পরিতাপের বিষয় যে, আমরা শান্তি ও ন্যায্যতার কথা জোরে প্রচার করি। কিন্তু তা প্রতিষ্ঠার জন্য যে ত্যাগ, সততা ও পবিত্রতা চিন্তার প্রয়োজন তা আমাদের জীবনে দেখা যায় না। বিশ্বের সামগ্রিক অবস্থা চিন্তা করে মহাত্মা গান্ধী মানব সভ্যতার ৭টি বিপদের কথা উল্লেখ করেছিলেন। ইরেজিতে সেগুলো এই, “Wealth without work, Pleasure without conscience, Knowledge without character, Business without ethics, Science without humanity, Religion without sacrifice, and Politics without principle.” তার কথাগুলোর সাথে তার নাতি অরুণ গান্ধী উপযুক্ত একটা বিষয় সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। আর তা হচ্ছে, “Rights without responsibilities”. আমরা যারা আজকের এ উত্সব পালন করি বা না করি সকলের অবশ্যই মনে রাখা প্রয়োজন কেবল পঞ্চাশত্তমী পর্বই নয়, যে কোনো ধর্মীয় পর্ব কেবল আনন্দের উত্সবই নয়, তা উন্নত জীবনের জন্য আত্মোত্সর্গের দিনও। সকলের জীবনেই হোক আত্মিক শক্তির উদ্বোধন! লেখক:রেভারেন্ড মার্টিন অধিকারী খৃষ্টীয় ঈশতত্ত মহাবিদ্যালয় বাংলাদেশ’র অধ্যক্ষ ও সমাজ সেবক