সিসির বিজয় মিসর রাজনীতির পুরাণ বৃত্তের পুনরাবৃত্তি
প্রকাশ : ০৮ জুন ২০১৪, ২১:১৫
মিসরের নির্বাচন কমিশন ৩ জুন ২০১৪ সরকারিভাবে আল-সিসিকে বিজয়ী বলে ঘোষণা করে, ফল এটিই হওয়ার কথা, হয়েছেও তাই। ফলাফল ঘোষণার পরপরই সিসির সমর্থকরা সারা দেশজুড়ে রাস্তায় নেমে বিজয় উত্সব শুরু করে। তাদের সাথে যোগ দেন কিছু গণমাধ্যমকর্মী এবং সরকারি কর্মকর্তারাও। তবে এই বিজয়ের উল্টোপাশে রয়েছে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, দারিদ্র্য দূরীকরণ ও রাজনৈতিক সংকটের মতো চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলা করা। তাঁর বিজয়ের মাধ্যমে যে, হোসনি মোবারকের মতো আর এক জেনারেলের যুগ শুরু হলো, গণতন্ত্রকে নির্বাসন দেয়া হলো তা কি এইসব উল্লসিত জনতা বুঝতে পারছে? পারছে না, কারণ মানুষ অধিকাংশ সময়ই আবেগের দ্বারা পরিচালিত হয় । সিসি ২০১১ সালের অভ্যুত্থানের শ্লোগান দিয়ে বলেন, তিনি সমাজে স্বাধীনতা ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চান। একজন জেনারেল যিনি নির্বাচিত সরকারকে উত্খাত করে প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে মিসরের ক্ষমতা দখল করলেন তাঁর মুখে স্বাধীনতা ও সামাজিক ন্যায় বিচারের কথা মানায় না। তারপরেও তাকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত। সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহ আল সিসিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং ফলাফল ঘোষণার দিনটিকে ঐতিহাসিক দিন বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে মিসরে বিশৃংখল পরিস্থিতির অবসান হয়েছে।তিনি অর্থনৈতিক সঙ্কট কাটিয়ে ওঠায় সহায়তা করার জন্য দাতাদের একটি সম্মেলন অনুষ্ঠানের আয়োজন করার উদ্যোগ নেবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। মুসলিম ব্রাদারহুড এই নির্বাচনকে রক্ত-রঞ্জিত নির্বাচন আখ্যা দিয়ে বর্জন করে। এ ছাড়া মিসরের উদারপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ আন্দোলনকারীরাও নাগরিক অধিকার হরণ করার অভিযোগ তুলে এই নির্বাচন বর্জন করে।
গোটা পৃথিবী প্রত্যক্ষ করেছে, জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে আল-সিসির নেতৃত্বে ২০১৩ সালে কিভাবে উত্খাত করে বর্তমান এই পাতানো পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে অত্যন্ত সুকৌশলে এবং ধাপে ধাপে। মুরসির সমর্থকদের বিরুদ্ধে কঠোর দমন অভিযান চালানো হয়। অন্তত ১৪০০ লোক নিহত হয়, ১৬ হাজার নেতা-কর্মী এখনও কারাগারে আটক । এতে ব্রাদারহুডের কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ে। ভোটার উপস্থিতি ৩৭ শতাংশ বলা হয়। ২৬ ও ২৭ মে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে সিসির প্রতি ছিলেন মাত্র একজন। সিসির পক্ষে ৯৩.২ শতাংশ ভোট পড়েছে বলেছে সরকারি সূত্র জানিয়েছে সাবেক ফিল্ডমার্শাল ৫৯ বছর বয়স্ক সিসি ২০১৩ সালের জুলাই মাসে প্রতরক্ষামন্ত্রী হিসেবে পরিচালিত এক অভ্যুত্থানে মিসরের সর্বশেষ নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান মোহাম্মদ মুরসিকে উত্খাত করেন। তারপর থেকে ব্রাদারহুডের উপর নেমে আসে তীব্র দমননীতি। সিসির সমর্থকদের মধ্যে শুধু যে সেনাবাহিনী ও ৭০ লাখ সদস্যের শক্তিশালী সিভিল সার্ভিস আছে তাই নয়, উপরন্তু ধনী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীও আছে, যাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মিডিয়ার সিংহভাগ। তাছাড়া ব্রাদারহুডের ইসলামী প্রতিদ্বন্দ্বীরাও সিসিকে সমর্থন যুগিয়েছে। এদের মধ্যে আছে বিশুদ্ধবাদী সালাফি সংগঠন নূর পার্টি।
নির্বাচনে সিসির প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বামপন্থী হামদীন সাবাহি। বিভিন্ন সামাজিক ইস্যু নিয়ে তিনি লড়েছিলেন এবং নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন এই বলে যে, সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরে যেতে হবে । তাঁর এই বক্তব্য তরুণ সমাজের ব্যাপক সমর্থন জুগিয়েছে। তবে রাষ্ট্রের অধিকতর হস্তক্ষেপ, কঠোর জাতীয়তাবাদ এবং ব্রাদারহুডের বিরোধিতার মতো বিষয়গুলোতে লোকে তাঁর ও সিসির ভূমিকার মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য দেখতে পায়নি। সাবাহি পেয়েছেন ৩ শতাংশ ভোট, ৩.৭ শতাংশ ভোট বাতিল হয়েছে। তবে প্রত্যাশার তুলনায় ভোটারের উপস্থিতি এত কম ছিল যে, সিসির প্রতি ব্যাপক জনসর্মথনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দেশের ব্যবসায়ী ও এলিট শ্রেণি ছাড়াও সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতেরও সমর্থন রয়েছে সিসির প্রতি। তারা মনে করেন সিসির মতো একজন শক্তিমান ও সাহসী লোকের দরকার দ্রুত কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারে। সামরিক বাহিনী থেকে আসা লোকদের এ গুণটি থাকে। উপসাগরীয় দেশগুলো মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো আভ্যন্তরীণ শক্তি ও ইরাণের মতো বহিঃশক্তির বিরোধিতা থেকে শত শত কোটি ডলারের সাহায্য ঢেলেছে মিসরে। তারপরেও তাদের সন্দেহ থেকে যাচ্ছে যে, তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সিসি দক্ষতা দেখাতে পারবেন কিনা কারণ তিনি যথেষ্ট জনসমর্থন পাননি। মাত্র ৪৬ শতাংশ ভোট পেয়েছেন তাতে যে কোন বড় সিদ্ধান্ত নিতে জনগণের বিপক্ষে যেতে হবে যার পরিণতি খুব একটা ভাল নাও হতে পারে।
সিসি বার বার মিডিয়ার সামনে আসার পরেও জনগণ বলছেন, দেশের বিদ্যমান সমস্যাবলী সমাধানের ক্ষেত্রে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি; আর তাই তাদের মনেও সন্দেহ জেগেছে মিসরের ভবিষ্যত্ নিয়ে। মিসরে দুর্নীতি, মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্ব লাগামছাড়া। বাজেট ঘাটতি বেড়েই চলেছে এবং তা জিডিপির ১৪ শতাংশের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। সিসি নিজেই বলেছেন যে, মিসরের জাতীয় ঋণ ২৪ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে। সরকারকে বাজেটের এক-চতুর্থাংশ জ্বালানি ও খাদ্য ভর্তুকির পিছনে ব্যয় করতে হচ্ছে যার পরিমাণ আগামি বছরেও ১৯০০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। মিসরের সাড়ে আট কোটি মানুষের মধ্যে এক কোটি বিশ লাখই বেকার। বিশ্লেষকগণ আরও আশংকা করছেন যে, সিসি সেনাবাহিনীর স্বার্থ বেশী দেখবেন, যার ফলে গণতন্ত্র, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পদদলিত হতে পারে এবং অর্থনীতির বারোটা বেজে যেতে পারে। এ নিয়ে মিসরের সেনাবাহিনীও বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে আছে।
মিসরের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল ইসলামপন্থী মুসলিম ব্রাদারহুড ছাড়াও বিভিন্ন উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ দলও এই নির্বাচন বর্জন করে। সিসিকে জেতানোর জন্যই বারবার ভোটগ্রহণের সময়সীমা বাড়ানো হচ্ছে বলে নির্বাচনী প্রক্রিয়া লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছেন সিসির একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী হামদিন সাবাহি। এ ছাড়া নির্বাচনে মাত্র ১৫ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। আমেরিকাভিত্তিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল’ নির্বাচনের সময়সীমা বাড়ানোর নিন্দা করে বলেছে, এই পদক্ষেপ মিসরের নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং সরকারের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখানো হয়েছে। মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক শাখা ফ্রিডম জাস্টিস পার্টি ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে না যাওয়াকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, এই ভোট বর্জনের মাধ্যমে মিসরের মহান নাগরিকগণ সামরিক অভ্যুত্থানের মৃত্যুসনদ লিখে দিয়েছে। তবে ভোটারদের ভোট বর্জনের কথা অস্বীকার করে দেশটির ক্ষমতাসীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গরম আবহাওয়াকে দায়ী করেছেন। কিন্তু বিশ্লেষকগণ বলছেন, সিসির বিপরীতে কোন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকা এবং সেনাসমর্থিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে সিসির জয় অবশ্যম্ভাবী মনে করে অনেক ভোটার ভোট দিতে আসেননি বা ওই ভোটকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি। এতে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, জনগণ ভালোভাবেই বুঝেছিলেন যে, এটি পাতানো নির্বাচন। সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করে মার্শাল সিসি ক্ষমতা করায়ত্ত করার যে প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন, তা এখন তাকে তথাকথিত নির্বাচনে বিজয়ী করল। আসলে মিসরে কোন নির্বাচন হয়নি, হয়েছে ভোটকেন্দ্র দখল আর সিলমারা সংস্কৃতি যা সিসিকে বিজয়ী করেছে। এতে তাঁর সমর্থকদের উল্লাস করার কি আছে?
মিসরের এ রাজনীতির সঙ্গে বিশ্ববাসী পরিচিত। হোসনি মোবারক এভাবেই বছরের পর পর ক্ষমতায় থেকেছেন। এভাবেই নির্বাচন দিতেন এবং বিজয়ী হতেন। ওইসব নির্বাচনের সঙ্গে জনগণের কোন সম্পর্ক ছিল না। আমরা আমাদের দেশে জেনারেল এরশাদের সময় একই ঘটনা দেখেছি। জনগণ ভোট না দিলেও তিনিই বিজয়ী হতেন। এটি আরব বিশ্বের আলাদা এক ধরনের গণতন্ত্র(!)। তার পূর্বসূরী আনোয়ার সাদাতও এ্কই ঘটনা ঘটিয়েছেন। তাহলে বলা যায় যে, হোসনি মুবারকের পর সিসির জামানা শুরু হলো মিসরে, এই যা পরিবর্তন । তবে এটিও যে দীর্ঘস্থায়ী হবে তাতো বুঝাই যাচ্ছে। পুরো আরব বিশ্বে ২০১১ সালের যে আন্দোলনের মাধ্যমে সেখানকার স্বৈরাচারী সরকারকে উত্খাত করা হয়েছিল , সেই আন্দোলনে তারা লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারেনি। সাময়িক সুবিধা পাওয়া গেছে সত্য, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হিসেবে আবারও এক ধরনের স্বৈরতন্ত্র চালু হলো দেশটিতে। সিসির উত্থান । মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে যে, আরব বসন্ত কি তাহলে ব্যর্থ হলো? মিসরে গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্ কি ?
এই তথাকথিত নির্বাচন করে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের পদাঙ্কই অনুসরণ করতে যাচ্ছেন জেনারেল সিসি। সেনাবাহিনীর শীর্ষ সামরিক পরিষদ অনেক আগেই তার এ মনোনয়নকে সমর্থন করেছিল। এর মধ্য দিয়ে মিসরে সিসি যুগ শুরু হচ্ছে এ বছরের জুন থেকেই । অন্যদিকে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মুরসির বিচার হচ্ছে যেহেতু তার পার্টিকে পঙ্গু করে দেয়া হয়েছে। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পথ সিসি অনেক পূর্বেই পরিষ্কার করে রেখেছিলেন। ক্ষমতা থেকে ছিটকে যাওয়া মুসলিম ব্রাদারহুড ছিল তার একমাত্র শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। তারা যাতে কোনভাবেই মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে সে ব্যবস্থা তিনি এবং সেনাসহকারীরা পাকাপোক্ত করে রেখেছিলেন। তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বামপন্থী হামদিন সাবাহিকে দাঁড় করানো হয়েছিল শুধু বিরোধীপক্ষ দেখানোর জন্য। আমরা জানি মধ্যপ্রাচ্যে বামপন্থী দল বা নেতার এমনিতেই কোন গুরুত্ব নেই। তার ওপর তাঁর জোরালো কোন রাজনৈতিক পটভূমি নেই। তার বিপরীতে সিসির প্রচারের ঢাকঢোল আর ক্ষমতার প্রভাব এমনিতেই সিসির জন্য জয়ের পথ সুপ্রশস্ত করে রেখেছিল।
লন্ডনভিত্তিক এই এইচ এসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আন্না বয়েডের মতে, সিসি বিপুল ভোটে জিতলেও ভোট তো পড়েছে অনেক কম । এটা সিসির নেতৃত্বাধীন প্রশাসনকে দুর্বল করে তুলবে। কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়া ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে দুর্বলতা সিসির বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে। গুরুত্বপূর্ণ কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের বেলায় একচেটিয়া প্রভাব খাটানো তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে না। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ তাঁকে মোকাবিলা করতে হবে, সেটি হচ্ছে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা। যুক্তরাষ্ট্র মিসরের সমারিকখাতে বড় ধরনের অস্ত্রসাহায্য দিয়ে থাকে । সিসির গায়ে সেনাশাসকের গন্ধ যেহেতু আছে, এমন শাসককে যুক্তরাষ্ট্র তথা পশ্চিমা বিশ্ব কতটা সহায়তা দিবে তা নিয়ে সন্দেহ আছে। তবে মিসরের রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিশাস কাশেম অবশ্য দাবি করেছেন, সিসির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ভাল হবে। আর ভালো যদি নাই হয়, সে ক্ষেত্রে চীন আর রাশিয়ার সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলার বিকল্প পছন্দ তো আছেই। সময়ই বলে দেবে মিসরের জনগণের জন্য আসলে কি অপেক্ষা করছে।
লেখক:আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক