নগরদারিদ্র্য ও স্বল্পব্যয় আবাসন

বস্তি স্থাপনাসমূহ বাংলাদেশে নগর দারিদ্র্যের দৃশ্যমান চেহারা। নগরের দরিদ্রদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি খাত থেকে সুবিধাজনক ও নিরাপদ আবাসন সরবরাহের উদ্যোগের অভাবের কারণে বস্তিতে বসবাস একটি অনিবার্য বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে, সাথে-সাথেও বস্তি উচ্ছেদের হুমকিও। হাজার হাজার বস্তিবাসী তাদের বাড়ি থেকে উচ্ছেদে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং লাখ লাখ লোক এই হুমকির সাথে জীবন-যাপন করে। ১৯৯৬ থেকে ২০০৪ এরমধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং দিনাজপুরে ১১৫টি জোরপূর্বক উচ্ছেদ সংগঠিত হয়েছে যা ৩ লাখ মানুষকে গৃহহীন করেছে। যেখানে ২০০৩-২০০৪ সালেই ৫৮টি উচ্ছেদ সংগঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের তীব্র আবাসনস্বল্পতা (অনুমান করা হয় যে, ২০০৪ সালে চাহিদা, যোগানকে ৬০ লাখ বাড়ি দ্বারা অতিক্রম করেছে) এবং নগর অঞ্চলে গৃহমালিকানা হ্রাসের প্রবণতা সত্ত্বেও বস্তিগুলো এর অধিবাসীদের জন্য বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা ছাড়াই ধ্বংস করা হচ্ছে। বাস্তবতা হল এই যে পুনর্বাসন ছাড়াই জোরপূর্বক উচ্ছেদ দরিদ্র মানুষদের কেবলই এক বস্তি থেকে আরেক বস্তিতে নিয়ে যায় অথবা অন্যান্য নতুন বস্তি গড়ে তোলার দিকে ধাবিত করে, মূল্যবান গৃহ সম্পদ ও ভূমি ধ্বংস করে। এটি বিশেষ করে ঢাকায় বেশি দেখা যায় যে, অনেক বস্তি উচ্ছেদ সত্ত্বেও বস্তির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-৭ এর প্রধান দুটি লক্ষ্য হচ্ছে উন্নততর জীবন, উন্নত পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা। অথচ উচ্ছেদের ভয় উন্নয়ন সংস্থা ও দাতাদের বস্তি উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে নিরুত্সাহিত করে, এটি বস্তিবাসীদের তাদের নিজস্ব গৃহ, সেবা ও অবকাঠামোর উন্নয়নে বিনিয়োগ করায়ও নিরুত্সাহিত করে। শারীরিক ও সামাজিক পুঁজি হারানোর মাধ্যমে উচ্ছেদ করা বস্তি পরিবারগুলো আরও দরিদ্র হয়ে যায়। এসব বিষয়গুলো দারিদ্র্যের একটি নিষ্ঠুর চক্র সৃষ্টি করে। বস্তিবাসীদের অধিকার রক্ষা করে এমন কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রস্তাবে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছে। এরকম একটি প্রস্তাব “গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজি ফর সেন্টার টু দ্যা ইয়ার ২০০০”-এ বলা হয়েছে প্রত্যেকটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হল বাড়ি ও মহল্লা ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস না করে বরং রক্ষা এবং উন্নয়ন করা। আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ছাড়াও বাংলাদেশ সরকার বস্তিবাসীদের অধিকার রক্ষার্থে জাতীয় আইন দ্বারাও বাধ্য। ‘জাতীয় গৃহায়ণ নীতি ১৯৯৩’ সবার জন্য আবাসন ও গৃহায়নের অধিকারের কথা দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করে এবং যতদূর সম্ভব বস্তিবাসীদের জোরপূর্বক স্থানান্তর ও উচ্ছেদ এড়ানোর পদক্ষেপ নিতে সরকারকে বাধ্য করে। সংবিধান সবার জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে এবং সকল নাগরিকের জীবন এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার রক্ষা করতে সরকারকে বাধ্য করে। উচ্চ আদালত কর্তৃক গৃহীত স্থগিতাদেশ দ্বারা অনেক বস্তিস্থাপনা উচ্ছেদ থেকে সুরক্ষা পেয়ে থাকে। সবার জন্য গৃহায়ণ অধিকার রক্ষা করে এমন একটি সমন্বিত আইনি কাঠামোর অস্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও বাস্তবতা হচ্ছে এই যে জোরপূর্বক উচ্ছেদ ঘটেই চলছে এবং পুনর্বাসন ক্ষতিপূরণ খুব কম ক্ষেত্রেই দেয়া হয়। নগর দারিদ্র্য ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট বস্তির বৃদ্ধি হ্রাস করতে সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি সংস্থা এবং সুশীল সমাজ কর্তৃক অনেক উদ্যোগ গ্রহণ ও হস্তক্ষেপ করেছে। এসব হস্তক্ষেপের মধ্যে রয়েছে (ক) বস্তি পুনর্বাসন প্রকল্প (খ) বস্তির উন্নতি ও উন্নয়ন কর্মসূচি (মেয়াদ নিরাপত্তা ব্যতিত) (গ) বস্তিবাসীদের তাদের গ্রামে ফিরে যেতে সরকারি পরিকল্পনা (ঘ) বস্তি উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আইনি হস্তক্ষেপ ও প্রতিবাদ (ঙ) দারিদ্র্যবান্ধব নগরনীতি ও উচ্ছেদ রোধে আইন প্রণোয়নের জন্য সুশীল সমাজের সমর্থন। দুঃখজনকভাবে, এসব হস্তক্ষেপের কোনটিই একটি যথাযথ সমাধান দিতে পারেনি, বস্তি উচ্ছেদের সংখ্যাও কমাতে পারেনি। ১৯৯০ এর দশকের শেষের দিকে, ঋণ ও মৌলিক বাসস্থানের মত প্রণোদনাসহ বস্তিবাসীদের তাদের গ্রামে ফিরে যেতে উত্সাহিত করার সরকারি পরিকল্পনা কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাবে ব্যর্থ হয়েছে। উচ্ছেদ হওয়া বস্তিবাসীরা ক্রমান্বয়ে নগর এলাকায় ফিরে এসেছে এবং বস্তির সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বর্তমানে নগরের দরিদ্রদের সামর্থ্য অনুযায়ী আবাসন এবং বস্তি স্থাপনা উন্নতির জন্য কোন সরকারি নীতি, কর্মসূচি বা বাজেট নেই।এ প্রসঙ্গে সাবের হোসেন চৌধুরী উপস্থাপিত “বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ রোধ এবং সরকারি জমির অবৈধ দখল বিল ২০০৯” অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নগর দরিদ্রদের জন্য স্বল্পব্যয়ে আবাসনের দীর্ঘমেয়াদী কৌশল ও নীতি উদ্ভাবনে সরকারের কিছু সময় লাগতে পারে কিন্তু মধ্যবর্তী সময়ে বিদ্যমান বস্তিগুলো রক্ষা করা এবং বস্তিবাসীদের জমি অধিকার মেয়াদেও নিরাপত্তা দেয়া আবশ্যক। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় দেখা গিয়েছে যে, মেয়াদী নিরাপত্তা সরবরাহ করলে আশ্রয় ও বস্তি উন্নতিতে বিনিয়োগ করতে বস্তিবাসী ও উন্নয়ন সংস্থাগুলো উত্সাহিত হয় যা সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অগ্রগতিকে তরান্বিত করে। “বস্তিবাসী উচ্ছেদ রোধ ও সরকারি জমির অবৈধ দখলবিল ২০০৯” সংসদে বেসরকারি বিল হিসেবে উপস্থাপিত হয় কিন্তু এখন পর্যন্ত এটি সংসদীয় বেসরকারি বিল উপ-কমিটি দ্বারা নিরীক্ষিত হয়নি। এটা এখনও পরিষ্কার নয় যে একটি বেসরকারি বিল কী সবচেয়ে কার্যকরী পদ্ধতি কিনা; অন্যথায় এই ইস্যুতে একটি সরকারি বিল তৈরি করতে কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের মন্ত্রীদের সাথে যোগাযোগ করা উচিত। এ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইস্যুতে বেসরকারি বিলসমূহ বিতর্ক উত্থাপন করেছে কিন্তু বেশি দূর এগুতে পারেনি। অভিজ্ঞতায় দেখা গিয়েছে যে, শুধু বস্তি উচ্ছেদ বিরোধী আইন যথেষ্ট নাও হতে পারে যদি না (১) সরকারি ও বেসরকারি খাত স্বল্পব্যয়ের আবাসন কর্মসূচিতে বিনিয়োগ করে (২) নগরের দরিদ্রদের আশ্রয়ের ক্রমবর্ধমান চাহিদার আলোকে নগর ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতি ও প্রয়োগ উন্নত করা হয় এবং (৩) নগর মহাপরিকল্পনায় নগরের দরিদ্রদের আবাসনের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করা হয়। বিদ্যমান সাংবিধানিক ও নীতিগত ব্যবস্থাকে দৃঢ়তর করা ছাড়াও একটি উচ্ছেদ বিরোধী বিলের আইনে পরিণত হওয়া জমি অধিকার মেয়াদ নিরাপত্তাকে একটি দৃঢ় আইনি ভিত্তি দিবে এবং অবৈধ উচ্ছেদ প্রতিরোধ করবে। বিলটি সংসদে পাঠানোর পূর্বে এটি কি শুধু উচ্ছেদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হবে নাকি এটি উচ্ছেদের পর ক্ষতিপূরণ, উচ্ছেদের পূর্বে অংশগ্রহণমূলক পুনর্বাসন পরিকল্পনা এবং অতি দরিদ্র ও নগর দরিদ্রদের জন্য স্বল্পব্যয়ের আবাসনের জন্য জাতীয় বাজেটের বরাদ্দের মত ইস্যুগুলোতে দৃষ্টি নিবন্ধ করা উচিত কিনা তা নিরূপণ করতে গণবিতর্কের প্রয়োজন। এ স্তরে সবচেয়ে সংকটপূর্ণ পদক্ষেপ হচ্ছে ভূমি অধিকার মেয়াদ এবং নগরের দরিদ্রদের জন্য স্বল্পব্যয়ে আবাসন সম্পর্কে যথাযথ নীতিব্যবস্থা সংক্রান্ত একটি বিশদ পরামর্শ ও জনআলোচনা। সব মিলিয়ে এসব ব্যবস্থা বস্তিতে জীবন ও জীবিকার উন্নতি সাধনে বিনিয়োগ উত্সাহিত করবে এবং সরকারকে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়তা করবে। লেখকদ্বয়: আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য দূরীকরণ বিশেষজ্ঞ, নগর অংশীদারিত্বের মাধ্যমে দারিদ্র্য হ্রাসকরণ প্রকল্প (আরবান পার্টনারশিপ ফর পভার্টি রিডাকশন প্রজেক্ট- ইউপিপিআর), ইউএনডিপি, বাংলাদেশ ও প্রাক্তন কনসালটেন্ট, ইউপিপিআর, ইউএনডিপি, বাংলাদেশ।