অর্থমন্ত্রীর লাখ কথার এক কথা
প্রকাশ : ০৮ জুন ২০১৪, ২১:১৮
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ২০১৪-২০১৫ অর্থবত্সরের প্রস্তাবিত বাজেট প্রসঙ্গে যথার্থই বলিয়াছেন যে, এই বাজেট উচ্চাভিলাষী। উচ্চাভিলাষের মধ্যে কোন অন্যায় থাকিতে পারে না নিশ্চয়ই, যদি কিনা উহা চরিতার্থ করিতে কোনপ্রকার বাঁকা পথের আশ্রয় নেয়া হয়। বিজ্ঞ অর্থমন্ত্রী এই লইয়া সংসদে একবার দুইবার নহে বেশ কয়েকবার বাজেট পেশ করিলেন। বরাবরই তিনি উচ্চাভিলাষী বাজেটই প্রণয়ন করিয়া আসিয়াছেন এবং ইহার সপক্ষে যুক্তি দেখাইতে গিয়া এইবার তিনি যাহা বলিয়াছেন, উহাও প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলিয়াছেন, উচ্চাভিলাষী বাজেটের কারণেই গত পাঁচ বত্সরে দেশে বাজেটের আকার দ্বিগুণ হইয়াছে। আর দেশে বড় বাজেট ব্যয়ের সামর্থ্যও তৈরি হইয়াছে। যাহাই হউক, অর্থমন্ত্রীর এই প্রস্তাবিত উচ্চাভিলাষী বাজেট লইয়া অর্থনীতিবিদগণ তো বটেই, রাজনীতিক ও অন্যরাও পক্ষে-বিপক্ষে সমালোচনা করিয়াছেন এবং এখনও করিয়া যাইতেছেন। উচ্চাভিলাষের মধ্যে দোষাবহ কিছু থাকিতে পারে না ইহা যেমন সত্যি, তেমনি আবার যাহারা এই বাজেটকে স্বপ্নবিলাসী বা লক্ষ্যবিলাসী বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন তাহাদেরও বোঝা দরকার যে, স্বপ্নবিলাস বা লক্ষ্যবিলাস না থাকিলে মানব সমাজে উন্নতির চাকা ঘূর্ণায়মান থাকিবে কি করিয়া? রাইট ব্রাদার্সের স্বপ্ন বা লক্ষ্যবিলাস একদিন বাস্তবের রূপ পরিগ্রহ করিয়া মানুষকে আকাশচারী হইতে শিখাইয়াছে বলিয়াই না বিশ্বে মানুষের সমাজে এত গতি সঞ্চারিত হইয়াছে। এমনিভাবে আলভা এডিসন, ম্যাক্সেল, ল্যাভয়েশিঁয়ে প্রমুখের স্বপ্ন ছিল, লক্ষ্য ছিল বলিয়াই মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রা সম্ভব হইতেছে। আমাদের অর্থমন্ত্রীর উচ্চাভিলাষী কিংবা সমালোচকদের মতানুযায়ী স্বপ্ন বা লক্ষ্যবিলাসী বাজেট সেই অর্থে যে, বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে উত্তরোত্তর ঘূর্ণায়মান রাখিবার প্রতিশ্রুতিতে ভরপুর ইহাতে সন্দেহ কী! তবে এই বাজেটকে উচ্চাভিলাষী আখ্যা প্রদানের পর ইহা বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে জ্ঞান-বৃদ্ধ অর্থমন্ত্রী যে কথা বা শর্তের কথা বলিয়াছেন তাহা কিন্তু এ ক্ষেত্রে আদতেই অতীব গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলিয়াছেন, এই বাজেট বাস্তবায়নে চাই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সহিংসতা পরিহার।
আমাদের করিত্কর্মা ও ডাকসাইটে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল মুহিত এ ক্ষেত্রে লাখ কথার এক কথা বলিয়াছেন। উচ্চপদস্থ আমলা এবং রাজনীতিক-উভয় পরিচয়েই তাহার বিজ্ঞজনোচিত ভূমিকার কথা সর্বজনবিদিত। যাহা হউক, একথা মানিতেই হইবে যে, উচ্চাভিলাষী বাজেটটি বাস্তবায়নের ব্যাপারে যে দুইটি প্রতিবন্ধকতার কথা তিনি উল্লেখ করিয়াছেন উহার কোনটিই তাহার নিয়ন্ত্রণে নাই। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং সহিংসতা বা সন্ত্রাসী তাণ্ডব অর্থনীতির কি মারাত্মক ক্ষতিসাধন করিতে পারে উহাতো আমরা নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে দারুণ হতাশার সহিত অবলোকন করিয়াছি। সুতরাং বাজেটটি দেশ ও জনগণের জন্য কেবল তখনই কল্যাণ বহিয়া আনিবে যখন কিনা ইহা বাস্তবায়নের সার্বিক অনুকূল পরিবেশ বিরাজ করিবে। অবিশ্যি, একথা অস্বীকার করা যাইবে না যে, বিশ্ব মন্দা পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক সহিংসতা সত্ত্বেও অর্থনীতির চাকাটি সক্রিয় ছিল এবং সে কারণেই অনেক ক্ষেত্রে আমাদের সাফল্যের কথা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলের কণ্ঠে উচ্চারিত হইতে শোনা যায় ও যাইতেছে।
সকলেই জানে যে, অর্থনীতির নিজস্ব কিছু নিয়মনীতি ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আছে। অনেক সময় এই সকল কারণেই অর্থনীতি ক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যাশা এবং বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ভুল বলিয়া প্রতিপন্ন হয়। বাজেটে যেসব দ্রব্যের উপর নতুন কর বা বাড়তি কর আরোপ করা হইয়াছে এবং যেগুলির উপর করারোপ হয় নাই বা আরোপিত কর হ্রাস করা হইয়াছে উভয় ক্ষেত্রেই দেখা যাইবে যে উহাদের মূল্য বাজেটের পর ঠিকই বৃদ্ধি পাইয়াছে। ইহা অর্থশাস্ত্রের এক বিচিত্র দিকই বটে। ইহা সুশাসনের অভাব বা কোন সত্ উদ্দেশ্যের অভাবজনিত কারণে ঘটে তাহা কিন্তু নহে, প্রকৃত প্রস্তাবে ইহা ঘটিয়া থাকে অর্থশাস্ত্রের ঐ বিচিত্র চলনের দরুন। এমতাবস্থায় একটি বিষয় আমাদের কি সরকারি কি বিরোধী দলসমূহ এই উভয়পক্ষকে তো বটেই, এমনকি সংশ্লিষ্ট সকলকেই গভীরভাবে ভাবিয়া দেখিতে হইবে। আর উহা এই যে, কিরূপে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা ও সহিংসতা পরিহার করিয়া অর্থনীতির চাকাটিতে প্রবল গতি সঞ্চার করা যায়। সামাজিক শৃংখলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার উপর মনোনিবেশ এবং তদনুযায়ী কাজ করার উপরই এই সকল পক্ষের অস্তিত্ব এবং ভবিষ্যত্ নির্ভর করিতেছে, এই কথাটি যেন আমরা কেহই ভুলিয়া না যাই।