নৌপথে যাত্রী নিরাপত্তা
প্রকাশ : ০৯ জুন ২০১৪, ২১:৩৩
সামনে বর্ষার ভরা মৌসুম। এই সময়ে নদ-নদীগুলি আবারও প্রমত্ত রাক্ষুসে হইয়া উঠিবে। কিন্তু সেইসব নদীপথে নিত্যদিন যাহাদের যাতায়াত ও দিনগুজরান, তাহাদের জীবনের নিরাপত্তা লইয়া কী ভাবিয়াছি আমরা! চলতি বত্সরে এখনও ভরা মৌসুম শুরু হয় নাই। কিন্তু ইতিমধ্যেই গত ২ মে পটুয়াখালীতে নিমজ্জিত হইয়াছে ‘এমএল শাতিল’ এবং এই দুর্ঘটনায় ১৭ জনের লাশ উদ্ধার করা হইয়াছে, নিখোঁজ রহিয়াছে এখনও ৩ জন। এই একই লঞ্চ গত জানুয়ারিতেও দুর্ঘটনা ঘটাইয়া তিনজনের প্রাণ কাড়িয়া লইয়াছিল। অথচ, তাহার ফিটনেস আমরা দেখি নাই, আবারও নদীবক্ষে নামিয়া প্রাণ কাড়িয়া লইবার সুযোগ করিয়া দিয়াছি। বিশ্ব ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহনের ওপর দক্ষিণাঞ্চলের ৩০ লক্ষ মানুষ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল, যদিও বেসরকারি পরিসংখ্যানে এই সংখ্যা কোটি ছাড়াইবে। এক হিসাব হইতে জানা যায়, ১৯৭৭ থেকে ২০১৪ সালের ১৫ মে পর্যন্ত দেশে ৪১৬টি নৌ দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে এবং তাহাতে পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হইয়াছে। প্রতিদিনই লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ হাতে নিয়া জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে নদীপথে গন্তব্যে ছুটিতেছেন। সাম্প্রতিক বত্সরগুলির হিসাব লইলেও দেখা যাইবে প্রতি মৌসুমে নৌ-দুর্ঘটনায় শতাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটে, কখনো সংখ্যাটি দুই-তিন শতও ছাড়াইয়া যায়। তবুও আমরা কি নৌ-দুর্ঘটনায় নিহতদের লাশ ও পরিজনদের আহাজারির সরেজমিন প্রতিবেদন মিডিয়ায় দেখিবার অপেক্ষা করিতেছি, নাকি দুর্ঘটনা এড়াইবার প্রস্তুতি লইতেছি!
নৌ-পরিবহন সেক্টরে দীর্ঘদিনের নৈরাজ্যের কারণে দুর্ভোগ পোহাইতে হইতেছে লক্ষ লক্ষ যাত্রীকে। নিয়মানুযায়ী, যাত্রীবাহী লঞ্চগুলিতে লাইফবয়া ও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রসহ সকল ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম থাকিবার কথা, অথচ অধিকাংশ লঞ্চেই তাহা নাই। তবুও ধারণক্ষমতা চার-পাঁচশত হইলেও কখনোই এই সকল লঞ্চ সহস্রাধিক যাত্রীর নীচে গন্তব্যে যাত্রা করে না। বিশেষত সরকারি ছুটি, হরতাল অথবা সাপ্তাহিক ছুটির সময় ঢাকা-বরিশাল উভয়প্রান্ত হইতে ছাড়িয়া যাওয়া লঞ্চগুলিতে তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। দফায় দফায় ভাড়া বৃদ্ধি হইলেও যাত্রীসেবার মান তথৈবচ। দুর্ঘটনাকবলিত হইলে আর বাঁচিবার উপায় নাই। নিয়ম অনুযায়ী ৪ জন যাত্রীর জন্য একটি করিয়া লাইফবয়া থাকিবার কথা। কাগজ-কলমের হিসাবে সবকিছু ঠিকঠাক থাকিলেও বাস্তবের চিত্র ভিন্ন। বিলাসবহুল লঞ্চগুলির যখন এই অবস্থা তখন সাধারণ লঞ্চগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা বলাই বাহুল্য। নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করিয়াই ঢাকা-বরিশাল রুটের লঞ্চগুলির মতো ‘এমএল টাইপে’র একতলা লঞ্চ চলাচল করিতেছে বড় বড় নদীতে। ভাবিলে অবাক লাগিবে, দেশে বিভিন্ন নৌপথে মোট ৩৫ হাজার অভ্যন্তরীণ নৌযান থাকিলেও রেজিস্ট্রেশন রহিয়াছে মাত্র ১৩ হাজারের। যাহার মধ্যে যাত্রীবাহী নৌযান মাত্র ২ হাজার ২২৫টি। আর বার্ষিক ফিটনেস পরীক্ষা করা হয় মাত্র ৮৫০-৯০০টির। অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী শতাধিক বিলাসবহুল লঞ্চের মধ্যে ৩৬টিতেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মাস্টার-ড্রাইভার নাই। লঞ্চ চালাইতেছে খালাসি ও হেল্পার, যদিও ফিটনেস লইবার সময় অভিজ্ঞ চালক ও মাষ্টারদের সনদ দেখাইয়াছিল। ফলে অনিবার্যভাবে ঘটে একের পর এক দুর্ঘটনা। সমপ্রতি এক গবেষণায় দেখা গিয়াছে, নৌযান নির্মাণে নকশায় ত্রুটি, অতিরিক্ত যাত্রী, চালকের অদক্ষতা ও কার্যকর তদারকির কারণে আকছার নৌ দুর্ঘটনা ঘটিতেছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, চালক ও অন্যান্য কর্মীর যোগ্যতা যাচাই করা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি। সেইসঙ্গে তাহাদের সচেতনতাও বাড়াইতে হইবে। কিন্তু নৌ-পরিবহন দপ্তরের তথ্য দুর্ঘটনার জন্য বাস্তব কাঠামোগত কারণগুলিকেই নির্দেশ করিতেছে। তাহারা জানাইতেছে, নৌ-দুর্ঘটনার শতকরা ৩৭ ভাগ ঘটে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাইয়ের কারণে। শতকরা ২২-৭২ ভাগের জন্য দায়ী নৌপথে প্রতিযোগিতা ও সংঘর্ষ। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে শতকরা ৯ ভাগ। যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য ৫ ভাগ এবং অন্যান্য কারণে ৮ ভাগ নৌ-দুর্ঘটনা ঘটে। অর্থাত্ দেখা যাইতেছে সদিচ্ছা, সততা আর নিষ্ঠা থাকিলেই আমরা সিংহভাগ নৌ-দুর্ঘটনা এড়াইতে পারিব। বর্ষা দুয়ারে কড়া নাড়িতেছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি সেই সদিচ্ছাটুকু দেখাইবেন!