ফরমালিনকে রুখিতে হইবে
প্রকাশ : ১০ জুন ২০১৪, ২১:৪২
নানাবিধ কারণে ফরমালিন এক্ষণে দেশের অন্যতম আলোচিত নাম। এই বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্যটি ১৮৫৯ সালে আবিষ্কারের সময় রাশিয়ান রসায়নবিদ আলেকজান্ডার বাটলারভ নিশ্চয়ই ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করেন নাই যে, রাসায়নিকটি অসাধু ব্যবসায়ীদের হাতে পড়িয়া কী ভয়াবহরূপ ধারণ করিতে পারে! আলফ্রেড নোবেলও কল্পনা করেন নাই তাহার আবিষ্কৃত ডিনামাইট নির্মাণকার্যে সহায়তার পাশাপাশি যুদ্ধে ধ্বংসের কাজেই অধিক ব্যবহূত হইবে। ফরমালিনের নিশ্চয়ই ভালো দিক রহিয়াছে, কিন্তু কয়েক বত্সর ধরিয়া বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি পচনশীল ফল-মূল মাছ মাংসে যেইভাবে ফরমালিনের সাহায্যে পচন রহিত করিয়া তাজা রাখিবার ব্যবস্থা লওয়া হইতেছে, তাহাতে ব্যবসায়ীদের সাময়িক সময়ের জন্য মুখে হাসি ফুটিলেও সময় ঘনাইলে টাইম বোমার মতো ইহা ফাটিয়া পড়িবে সকলের ওপরেই।
কথিত আছে, ‘অমঙ্গলকে ফুত্কারে উড়াইয়া দিয়ো না, তাহা মঙ্গলসমেত উড়িয়া যাইবে।’ পচনের জন্য দায়ী অণুজীব নামক ‘অমঙ্গল’কে উড়াইয়া দিতে যেই রাসায়নিক ব্যবহার করা হইতেছে, তাহাতে অণুজীবসমূহ অবিকশিত থাকিবার পাশাপাশি ওই খাদ্যদ্রব্যটির অন্তস্থ খাদ্যগুণ তথা ‘মঙ্গল’ও উবে যায়। এই ফরমালিন যে নীরব ‘গণহত্যা’ চালাইবার কাজে অতি পারঙ্গম একটি রাসায়নিক, তাহা জানিয়া-শুনিয়া-বুঝিয়া ঢিমেতালে নামকাওয়াস্তে ব্যবস্থা নিয়া এবং আরও কার্যব্যবস্থা ‘লইব-নিতেছি’ করিয়া সরকার বহু জল গড়াইবার সুযোগ দিয়াছে বুড়িগঙ্গা দিয়া। অবশেষে ফরমালিনযুক্ত পণ্য ঠেকাইতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ রাজধানীর আটটি স্থানে তল্লাশি চৌকি স্থাপনের ব্যবস্থা লইবার কথা জানাইয়াছে গত রবিবার। আজ বুধবার হইতে ডিএমপি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও বিএসটিআই’র ফরমালিনমুক্ত অভিযান শুরু করিবার কথাও জানা গিয়াছে। উত্তম পরিকল্পনা বটে! ঢাকাকে খাদ্যবিষে ঢাকিয়া যাইবার দুরবস্থা হইতে উদ্ধারের যেকোনো উদ্যোগকেই স্বাগত জানাইতে হয়। তবে তাহার সহিত ইহাও স্মরণে রাখা উচিত, ঢাকার মানুষই পুরো বাংলাদেশ নহে, সমগ্র দেশের দশভাগের একভাগ মাত্র। সুতরাং মাত্র ক্ষুদ্রাংশের জন্য ব্যবস্থা লইয়া এবং বাদবাকি প্রায় পুরা দেশকে ঝুঁকিতে রাখিয়া এই ‘গণহত্যা’কে নিরস্ত করা যাইবে না।
ফরমালিন কতোটা ভয়াবহ, তাহার যত্সামান্য তথ্যের দিকে নজর দিলেও উপলব্ধি করা সম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির শরীরে প্রতিদিন গড়ে ০.০৩ হইতে ০.১৫ পিপিএম মাত্রা পর্যন্ত ফরমালিন সহ্য করিতে পারে। গত কয়েক মাসে ঢাকা মহানগর পুলিশ বিভিন্ন স্থানে যেই সকল ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করিয়াছে, তাহাতে ৩.৫ পিপিএম-এর অধিক পরিমাণ ফরমালিনের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়াছে। ইহা সর্বোচ্চ সহনশীল মাত্রা হইতেও ২৩ গুণ বেশি! গবেষণায় জানা গিয়াছে, যেই সকল এনাটমিস্ট এবং অ্যাম্বালমার মৃতদেহ সংরক্ষণে ফরমালিন নিয়া কাজ করেন, তাহারা সাধারণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় লিউকেমিয়া এবং ব্রেন ক্যান্সারে অধিক হারে আক্রান্ত হন। ফুসফুস ক্যান্সার, কিডনি রোগ, চর্ম এলার্জি, শ্বসন সংবেদক এবং অ্যাজমা জাতীয় লক্ষণের জন্যও দায়ী এই ফরমালিন। তাহাছাড়া ফরমালিন মিশ্রিত খাদ্যগ্রহণের কারণে পরিপাক প্রক্রিয়ার নানাবিধ জটিলতা খুব সহজেই দেখা দেয়। এমনকী বিভিন্ন গবেষণায় ফরম্যালডিহাইডকে ‘জিন মিউটেশন’ অর্থাত্ বংশচরিত্র বাহকের পরিবর্তনের কারণ হিসাবেও চিহ্নিত করা হইয়াছে। বিষয়টি অতি ভয়াবহ।
এই বিশ্বায়নের যুগে খাদ্যদ্রব্যে প্রিজারভেটিভের ব্যবহার উত্তরোত্তর বাড়িতেছে। ইহা ব্যতীত খাদ্য সংরক্ষণ ও বিশ্ব খাদ্য ব্যবস্থাপনা যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করাও সম্ভব নহে। কিন্তু খাদ্যের প্রিজারভেটিভ হিসাবে যেই সকল রসায়ন কঠোরভাবে লাল তালিকাভুক্ত, যাহা বিষ বৈ অন্য কিছু নহে, তাহা দিয়া খাদ্য সংরক্ষণের অর্থ হইল পুরো খাদ্যদ্রব্যটিকেই বিষাক্ত করিয়া তোলা। ফরমালিনের যেই সকল নিরাপদ ব্যবহার রহিয়াছে, তাহার মধ্যে মাত্র এক শতাংশ হইল মৃতদেহকে সংরক্ষণ করা। আমরা বোধকরি মরিবার পূর্বেই নিজেদের মৃতদেহ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করিতেছি। ফরমালিন যেন আমাদের জিন্দা লাশে পরিণত করিতেছে।