রেলপথে জননিরাপত্তা
প্রকাশ : ১০ জুন ২০১৪, ২১:৪২
দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু এতোটাই নৈমিত্তিক বিষয় হইয়া দাঁড়াইয়াছে যে, চলন্ত ট্রেনে কাটা পড়িয়া মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনাও এখন আর কাউকে বিশেষভাবে বিচলিত করে না। সর্বশেষ গত রবিবারও রাজধানী ঢাকার মালিবাগ ও মগবাজার ক্রসিং-এ অনুরূপ দুইটি প্রাণহানির ঘটনা ঘটিয়াছে। ইহার আগে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে ষোলশহর-দোহাজারী রেলপথে অপর এক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাইয়াছেন আরও একজন। এমন মর্মস্পর্শী ঘটনা প্রায়শ ঘটিতেছে। পরিসংখ্যান হয়তো বলিবে যে, সড়কপথ ও নৌপথের তুলনায় এতো কিছুই নহে। কথাটি সত্য। তবে জন্মলগ্ন হইতেই রেলপথ তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বলিয়া বিবেচিত হইয়া আসিতেছে বিশ্বব্যাপী। আমাদের দেশে যেই কয়টি কারণে রেলপথে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হইতেছে, তন্মধ্যে বৈধ-অবৈধভাবে নির্মিত অরক্ষিত লেবেলক্রসিং, যত্রতত্র রেলপথের উপর দিয়া পথচারীদের ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলাচল এবং রেললাইনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ চুরি অন্যতম। বৈধ লেবেলক্রসিং-এর তুলনায় অবৈধ লেবেলক্রসিং-এর সংখ্যাই যে বেশি তাহা সুবিদিত। জনবল ও তদারকির অভাবে বৈধ লেবেলক্রসিংগুলির সুরক্ষাই যেইখানে সম্ভব হইতেছে না, সেইখানে অবৈধ লেবেলক্রসিং-এর নিরাপত্তা বিধানের তো প্রশ্নই আসে না। আর প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার রেলপথে যন্ত্রাংশ চুরি ঠেকানো তো একপ্রকার অসম্ভবই বলা চলে। সর্বোপরি, বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও দারিদ্র্যপীড়িত একটি দেশে ট্রেনে কাটা পড়িয়া মৃত্যুর মতো দুর্ঘটনা রোধ করা এমনিতেই কঠিন। জনগণের একাংশের মারাত্মক অসচেতনতা, দায়িত্বহীনতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে বেপরোয়া মনোবৃত্তি পরিস্থিতিকে যে আরও নাজুক করিয়া তুলিয়াছে তাহাতে সন্দেহ নাই।
বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান হিসাবে বাংলাদেশ রেলওয়ে গর্ব করিতে পারে। আবার গৌরবময় সেই ঐতিহ্যের আলোকে বর্তমানের দিকে তাকাইলে কিছুটা বিব্রতও বোধ করিতে হয় বৈকি। ভারত বিভাগের পর আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের অংশ হিসাবে উত্তরাধিকারসূত্রে আড়াই সহস্রাধিক কিলোমিটার রেলপথসহ যাহা আমরা পাইয়াছিলাম, সামগ্রিকভাবে গত ছয় দশকে তাহা যে খুব বেশি সমৃদ্ধ হইয়াছে—এমন দাবি করা যাইবে না। বিশেষ করিয়া জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমরা যে অনেক পিছাইয়া আছি—তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। শত শত কিলোমিটার রেলপথে পাহারা বসানো কিংবা নিরাপত্তা বেষ্টনি গড়িয়া তোলার অবাস্তব দাবি আমরা করিতেছি না। কিন্তু রাজধানীর ভিতরে রেলপথগুলিতে দশকের পর দশক ধরিয়া যেই বিশৃঙ্খলা চলিয়া আসিতেছে তাহা দেখিয়া আতঙ্কিত হইতে হয়। কর্তৃপক্ষের নাকের ডগায় রেললাইন ঘেঁষিয়া বস্তি-বাজার গড়িয়া তোলা হইয়াছে, বাচ্চারা রেললাইনের উপর ছুটাছুটি করিতেছে—এই দৃশ্য অবলোকন করিবার জন্য সারা দেশ উলটপালট করিবার প্রয়োজন নাই; বরং কমলাপুরস্থ দেশের ব্যস্ততম প্রধান রেলস্টেশনটির চতুষ্পার্শ্বের চিত্রে চক্ষু নিবদ্ধ করিলেই সারা দেশের ছবিটি স্পষ্ট হইয়া যাইবে। রেলক্রসিংগুলির ভয়াবহ বিশৃঙ্খলার কথা নাই-বা বলিলাম।
সর্বপ্রকার সতর্কতা সত্ত্বেও উন্নত দেশেও দুর্ঘটনা ঘটিয়া থাকে। ইহার উপর কাহারও হাত নাই। কিন্তু আমাদের অবস্থা এমন যে, দুর্ঘটনা না-ঘটাটাই বিস্ময়কর মনে হইতে পারে। একটু সতর্ক ও দায়িত্বশীল হইলেই যেই দুর্ঘটনা এড়ানো যায়—তাহাকে আর যাই বলা হউক দুর্ঘটনা বলা যায় না। আশার কথা হইল, ইতিমধ্যে টঙ্গী ও বনানী লেবেলক্রসিং-এ দুইটি ওভারপাস নির্মিত হইয়াছে। আরও কয়েকটি নির্মাণের প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে মগবাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে। পাশাপাশি, অনতিবিলম্বে রাজধানীসহ জনবহুল এলাকার রেলপথগুলিকে অবশ্যই ঝুঁকিমুক্ত করিতে হইবে। রেলপথের উভয়পার্শ্বে বিপজ্জনকভাবে গড়িয়া উঠা বস্তি-বাজার প্রভৃতি অপসারণের পাশাপাশি রেললাইনের উপর দিয়া হাঁটাচলা ও পারাপার বন্ধে গ্রহণ করিতে হইবে কার্যকর ব্যবস্থা। সেইসাথে জনগণকেও নিজেদের নিরাপত্তা বিষয়ে অবশ্যই সচেতন ও দায়িত্বশীল হইতে হইবে।