ভেজাল প্রতিরোধে যা করা দরকার

আজ ভেজাল খেয়ে আমাদের এ কি অবস্থা! হাসপাতালগুলোতে কত ধরনের রোগবালাই নিয়েই না ছুটছে মানুষ। মানুষ যত না বাড়ছে তুলনামূলক হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ছে। যে উপজেলায় আমার জন্ম সেখানে ১০ বছর আগে ২ লাখ লোকের জন্য ছিলো সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ২টি হাসপাতাল। এখন তিন লাখ লোকের জন্য হাসপাতাল গড়ে উঠেছে ১১টি। এ কথা সত্য যে ভেজাল খেয়ে মানুষ শুধু অসুস্থই হচ্ছে না, প্রতিদিন মরছে অসংখ্য মানুষ। ভেজাল রোধ না হলে, খাদ্যে ভেজালের গতি এমনটাই যদি থাকে তাহলে যে হারে মানুষ মরবে তা শুধু দেশবাসিকেই নয়, যারা সারা বিশ্বে স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছেন তাদেরও মাথা ব্যথার কারণ হবে। প্রশ্ন হলো কিভাবে ভেজাল রোধ করা যায়? মাত্র ৬ মাসের কর্ম পরিকল্পনায়ই ৮০ ভাগ ভেজাল মুক্ত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব বলে মনে করি। কিন্তু কিভাবে? এ ব্যাপারে ৬টি বিষয়ের উপর গুরুত্বরোপ করা যেতে পারে। যেমন- (১). অন্য কোন ইস্যুতে যেহেতু সম্ভব নয়, অন্তত দেশের ১৬ কোটি মানুষের স্বাস্থ্য এবং জীবনের কথা ভাবনায় এনে আমাদের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের দু’নেত্রী ভেজালের ব্যাপারে প্রথমে ঐক্যমত হতে হবেন। মাত্র ৬ মাস তারা এ বিষয়ে অন্তত সভা সেমিনার বৈঠক এবং পরিকল্পনা গ্রহণ করবেন। তা বাস্তবায়নের ব্যবস্থা নেবে সরকার। অন্যান্য দলীয় রাজনৈতিকদেরও তাতে সম্পৃক্ত করতে হবে। সকল দলই দলীয় অন্যান্য কর্মসূচির পাশাপাশি ভেজালের বিরুদ্ধে অন্তত ৬ মাস মাঠে সরব থাকবেন। (২). খাদ্যে ভেজালে জড়িতদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান করতে হবে। সে সঙ্গে অপরাধীদের ধরে সাজা নিশ্চিত করতে হবে। (৩). প্রকাশ্যে সাজার ব্যবস্থা করতে হবে। সাজা হবে শারীরিক এবং আর্থিক। (৪). র্যাবকে কেবল ভেজালের বিরুদ্ধে অতিরিক্তি দায়িত্ব দিয়ে ৬ মাস মাঠে রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভেজালের বিরুদ্ধে র্যাবকে মূল ভূমিকায় রাখা যেতে পারে। (৫). ৬ মাস প্রতিটি উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালত কার্যকর থাকতে হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালতে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের পাশাপাশি র্যাব ভূমিকা রাখবে। এতে কেবল ভেজালই রোধ হবে না, ভেজাল রোধ হলে দেশবাসীর বাহবা মিলবে। (৬). দেশে ভেজাল বিরোধী জাতীয় কমিটি গঠন করতে হবে। এ কমিটিতে সত্ এবং যোগ্য চলতি দায়িত্বে থাকা এবং অবসরপ্রাপ্ত আমলাগণ থাকবেন। অবসরপ্রাপ্ত সত্ ব্যক্তিদেরও এ কমিটির আওতাভুক্ত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে এক সময়ে রাজধানী ঢাকার ভেজালের বিরুদ্ধে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ম্যাজিস্ট্রেট রোকন-উ-দৌলাকে বেশি কাজে লাগানো যেতে পারে। তিনি অল্প সময়ে ভেজালকারীদের হূদপিন্ডে কম্পন ধরাতে সক্ষম হন। তিনি যেহেতু এ বিষয়ে সফল এবং অভিজ্ঞ তাকে সারা দেশের ভ্রাম্যমাণ টিম পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। শাকসবজি থেকে শুরু করে ফলমূলসহ নিত্যদিনের খাবারেই রয়েছে ভেজাল ও বিষাক্ত রাসায়নিকের ঝুঁকি। পকেটের টাকা খরচ করে যা কেনা হচ্ছে, তার বেশির ভাগই প্রকৃতপক্ষে বিষ। আর বিষাক্ত এ খাবার গ্রহণের ফলে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে আছে দেশবাসী। বিশেষ করে শিশুরাই এর প্রধান শিকার। চিকিত্সকরা শিশুদের নানা রোগের জন্য ভেজাল ও রাসায়নিকযুক্ত খাবারকেই দায়ী করছেন। অধিক মুনাফার আশায় ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের হাতে বিষ তুলে দিচ্ছেন। হাতেনাতে ধরা পড়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা নিজ মুখেই বলছেন রাসায়নিক মেশানোর কথা। শুধু নিজের দায়টুকু স্বীকার করছেন না। পাইকারি ব্যবসায়ী দুষছেন খুচরা বিক্রেতাকে। আর খুচরা বিক্রেতা বলছেন, আড়ত থেকেই চলছে এসব। ভেজাল রোধে সরকারি-বেসরকারি নানা চেষ্টা সত্ত্বেও চলছেই এ কারবার। মাছে মিলছে বিষাক্ত ফরমালিন, ফলে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথেফেন, প্রোফাইল প্যারা টিটিনিয়াম (পিপিটি) পাউডার, বিস্কুটসহ বেকারিদ্রব্যে রয়েছে বিষ সমতুল্য রং আর মুড়িতে মেশানো হচ্ছে কৃষিকাজে ব্যবহূত ইউরিয়া সার। এর বাইরেও রয়েছে নানা রাসায়নিক সংমিশ্রণের কারসাজি। ল্যাবে পরীক্ষায় দেখা গেছে ফলের মধ্যে আঙ্গুর, আপেল ও নাশপাতিতে ফরমালিন মেশানো হচ্ছে। আসলে আমরা খাবার খাচ্ছি; না খাচ্ছি বিষ! চারদিকে ফরমালিনের জয়জয়কার। ভেজালের এ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। ভেজালের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আমজনতা, প্রশাসন, সংশি¬ষ্ট বিভাগের সবাই মিলে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করতে হবে। জনস্বাস্থ্য নিয়ে অবহেলা প্রদর্শনের কোনই সুযোগ নেই। এ অবস্থায় সর্বতোভাবে তত্পর হতে হবে দেশের আমজনতা, রাজনৈতিক, বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে। সর্বোপরি গণমাধ্যমসহ ব্যাপক জনসচেতনতাও প্রত্যাশিত। তবেই হয়তো ভেজাল থেকে রেহাই মিলবে। লেখক- সাংবাদিক e-mail-newsstore09@gmail.com)